অন্তরালের গল্প

ফেব্রুয়ারি ২৪ ২০১৭, ০৫:৪০

এ মাসেই ছিল জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন। এই কবির জীবন ও সৃষ্টিকর্ম পাঠককে যেমন আপ্লুত করে, তেমনি তা এক অনন্ত প্রহেলিকাও। একজন কমলালেবু বইতে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান এবার উন্মোচন করেছেন সেই প্রহেলিকার রহস্য। এই বইমেলায় বইটি বেরিয়েছে প্রথমা প্রকাশন থেকে

জীবনানন্দ দাশ (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯—২২ অক্টোবর ১৯৫৪), শিল্পী: শেখ আফজালজীবনানন্দ দাশ (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯—২২ অক্টোবর ১৯৫৪), শিল্পী: শেখ আফজালল্যান্সডাউন রোডের ফুটপাতের দোকানমালিককে জিজ্ঞাসা করি, ‘এটা কি ১৮৩ নম্বর বাড়ি?’ বলেন, ‘হ্যাঁ। কাউকে খুঁজছেন?’ আমি বলি, ‘না ঠিক কাউকে খুঁজছি না। এমনি বাড়িটা দেখতে এসেছি।’ দোকানমালিক মুহূর্তে যেন রহস্য বুঝে যান। ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে বলেন, ‘ও বুঝতে পেরেছি দাদা। অনেকেই দেখতে আসেন। এখানে কবি জীবনানন্দ দাশ থাকতেন একসময়। অনেক বড় কবি ছিলেন। শুনেছি নোবেল প্রাইজ পাবার কথা ছিল, ষড়যন্ত্র করে দেওয়া হয়নি।’ তিনি তাঁর ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব আরও খানিকটা বিশদ করার পর জীবনানন্দ এ বাড়ির নিচতলার যে অংশে থাকতেন, সেটা দেখালেন। সরু নির্জন গলি দিয়ে সেখানে গিয়ে সবুজ রঙের কাঠের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াই। দরজার মরচে পড়া লোহার কড়াটি স্পর্শ করি। অনেক রাতে কলকাতার ফুটপাত থেকে ফুটপাতে হেঁটে, আদিম সাপের মতো ছড়িয়ে থাকা ট্রামলাইন মাড়িয়ে জীবনানন্দ ফিরতেন এই বাড়িতে। এসে হাত রাখতেন এই কড়ায়। কাকে ডাকতেন তিনি? সম্ভবত স্ত্রী লাবণ্যকে নয়, হয়তো নিচু গলায় ডাকতেন মেয়ে মঞ্জুকে। ল্যান্সডাউন রোড থেকে যাই কাছের শম্ভুনাথ হাসপাতালে। সেখানকার ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে গিয়ে উঁকি দিই। ভেতরে একজন রক্তাক্ত রোগী গোঙাচ্ছে। তাকে ঘিরে কয়েকজন ডাক্তার, নার্স। এক নার্স এসে আমাকে বলেন, ‘রোগী কি আপনার?’ বলি, ‘না।’ সরে আসি সেখান থেকে। হাসপাতালের করিডরে হাঁটি। ভাবি, নার্সকে বলতে পারতাম, আমার এমন রক্তাক্ত রোগী একজন ছিলেন এখানে, ওই ইমার্জেন্সি বেডেই ৬০ বছর আগে। ট্রামের ধাক্কায় আহত হবার পর জীবনানন্দ দাশকে এই হাসপাতালেই ভর্তি করা হয়েছিল, এখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। আমি হাসপাতালের করিডরে হাঁটি আর যেন দেখতে পাই সেখানে ছোটাছিট করেছেন জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপি উদ্ধারকারী ভুমেন্দ্র গুহ, ফলের ঝুড়ি নিয়ে বেঞ্চে নিঝুম বসে আছেন তাঁর বোন সুচরিতা।

জীবনানন্দ দাশের জীবনকে ভিত্তি করে একজন কমলালেবু নামের বইটি লেখার একপর্যায়ে গিয়েছিলাম কলকাতায় তাঁর স্পর্শ লাগা জায়গাগুলো দেখতে, গিয়েছিলাম বরিশালেও—যেখানে কেটেছে তাঁর জীবনের সিংহভাগ। জীবনানন্দ দাশ আমার ওপর ভর করেছেন কৈশোরেই। আমি তখন আধা সামরিক বিদ্যালয় মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। খাকি পরে প্যারেড করি, পিটি করি। কিন্তু মন ভেসে বেড়ায় কঠোর নিয়মঘেরা খাকি চত্বরের বাইরে। মায়াকোভস্কির কথা ধার করে নিজেকে তখন মনে হয় খাকি পরা মেঘ। পড়ার জন্য নির্ধারিত প্রেপ টাইমে কেমিস্ট্রি বইয়ের নিচে লুকিয়ে পড়ি কবিতার বই। আমাদের সেই খাকি চত্বরে এক নতুন বাংলা শিক্ষক ক্লাসে এসে আমাদের সিলেবাসে না থাকা সত্ত্বেও একদিন আবৃত্তি করে শোনালেন জীবনানন্দের ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতা। কবিতাটির অর্থ সেই সময় বোধগম্য না হলেও আমাদের সেই শিক্ষক রফিক কায়সারের আবৃত্তি শুনে একধরনের ঘোর লাগে। পরদিন মার্চপাস্ট করি আর আমার মাথার ভেতর ঘোরে সেই পঙ্‌ক্তি, ‘চমৎকার! ধরা যাক দু-একটি ইঁদুর এবার।’

এরপর জীবনানন্দের ঐন্দ্রজালিক কবিতাগুলো আমার সঙ্গী হয়ে ওঠে এবং আমাকে ছেলেধরার মতো বস্তাবন্দী করে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যায় ওই আধা সামরিক চত্বরের বাইরে। কবিতা না লিখলেও কবিতার পাঠক আমি বরাবর; এবং জীবনানন্দ আমাকে দখল করে রেখেছেন আকৈশোর। যখন গল্প লিখতে শুরু করি, লক্ষ করি জীবনানন্দের আবহ, ভাষা ব্যবহার চোরাগোপ্তাভাবে আমার গদ্যকেও প্রভাবিত করছে। আমার কয়েকটি বিহবল গল্পÍবইয়ের কিছু গল্প কবিতা হিসেবেও আবৃত্তি করা হয়েছে মঞ্চে। জীবনানন্দ আমাকে বিশেষভাবে আক্রান্ত করেন, যখন আমি তাঁর কথাসাহিত্যিক পরিচয়টি পাই। জীবনানন্দের জীবৎকালে অপ্রকাশিত গল্প, উপন্যাস ও ডায়েরির সঙ্গে পরিচিত হয়ে মনে হয় যেন তুতেন খামেনের গুপ্তধনের মুখোমুখি হয়েছি। তাঁর গদ্যও আমাকে দখল করে ভীষণভাবে। ‘মারাত্মক নিরূপম আনন্দ’ নামে আমার একটি গল্প আছে, পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ নামে আছে একটি গল্পগ্রন্থ—এ দুটো জীবনানন্দের গদ্যেরই লাইন। আমার আরেকটি গল্পগ্রন্থ অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প জীবনানন্দের একটি গল্পকে কেন্দ্র করেই। আমি ক্রমশ টের পাই জীবনানন্দ আমার ওপর যেন খানিকটা সিন্দবাদের মতো ভর করেছেন। আমি একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিই, জীবনানন্দের এই ভারমুক্ত হবার

জন্য তাঁকে নিয়েই পূর্ণাঙ্গ একটি বই লিখব। তারপর তাঁর যাবতীয় লেখাপত্রের ভেতর ডুব দিই। জীবনানন্দ যা লিখেছেন তার সামান্য মাত্র প্রকাশ করেছেন; বাকিটুকু তালাবদ্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন কালো ট্রাঙ্কে। মৃত্যুর পর সেই গোপন ট্রাঙ্ক থেকে বেরিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কবিতা, গোটা বিশেক উপন্যাস, শ দেড়েক গল্প, চার হাজার পৃষ্ঠার ডায়েরি, অসংখ্য চিঠিপত্র। এ ছাড়া রয়েছে তাঁর অগণিত প্রবন্ধ। এক এক করে খুঁটিয়ে পড়ি সেসব। পড়ি তাঁকে নিয়ে লেখা বহু মানুষের স্মৃতিচারণা, আলোচনা, বিশ্লেষণ। ঘুরে আসি তাঁর যাপিত জীবনের জায়গাগুলো। তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করি। আবিষ্কার করি তিনি শুধু অনন্যসাধারণ শব্দশিল্পী নন, এক এনসাইক্লেপেডিক ভাবুক, গভীর অ্যাথনোগ্রাফিক পর্যবেক্ষক। তিনি কাকের বাসা থেকে শ্যাওলার ওপর খসে পড়া ডিম যেমন লক্ষ করেন, তেমনি গভীর জ্ঞান রাখেন নিলস বোরের কোয়ান্টাম থিওরিরও। দেখি, তিনি বিশ শতকের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে অতি দূর ইতিহাস আর অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে টের পেয়ে গেছেন আধুনিকতা আর বিশ্বায়নের ঘোর পরিণতির ঘ্রাণ। জীবন, জীবিকা, দাম্পত্য, স্বপ্ন, বাস্তবতার ঘূর্ণিঝড়ে ডানা ঝাপটিয়েছেন আহত পাখির মতো। সাহিত্যের হাঙরভরা সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে প্রবল আত্মবিশ্বাসে জাদুকরের মতো দেখিয়ে গেছেন ভাষা আর ভাবনার মায়াবী খেলা।

লক্ষ করি, জীবনের নানা বাঁকে নতুন নতুন ভাবনা মোমের মতো জ্বলে উঠেছে জীবনানন্দের মনে। সেই ভাবনা তিনি সমান্তরালে নাড়াচাড়া করেছেন তাঁর কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, ডায়েরিতে, চিঠিতে, প্রবন্ধে। একজন কলমালেবু বইটিতে আমি এই প্রহেলিকাময় মানুষ জীবনানন্দের ব্যক্তিগত জীবনের সমান্তরালে তাঁর নানা ধারার এই লেখাগুলোকে কোলাজের মতো স্থাপন করে অনুসন্ধান করেছি তাঁর হৃদয়ের সেই পথচলাকে। জীবনানন্দকে ঘিরে আমার এই ব্যক্তিগত অভিযাত্রা শুরু করেছি এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে যে, ট্রামের আঘাতে তাঁর এই মৃত্যু কি কোনো দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি একটা হত্যাকাণ্ড?

একজন কমলালেবু
শাহাদুজ্জামান
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা
দাম: ৪৫০ টাকা

কমলালেবুর সঙ্গে জীবনানন্দের সম্পর্ক জীবনানন্দের গভীর পাঠক আঁচ করতে পারবেন। জীবনানন্দকে নেহাতই কাব্যিক, নির্জন, প্রাকৃতিক ইত্যাদি অভিধায় বোঝার চেষ্টা আমাদের এক অভ্যাস। অথচ আমি টের পেয়েছি জীবনানন্দ জটিল, বহুমাত্রিক মানুষ। তাঁর ভেতর আছে ডার্ক হিউমারও। তাঁকে নিয়ে বইয়ের নাম দিতে গিয়ে কিংবা বইয়ের কাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে তাই খড়ির গণ্ডির বাইরে আসতে হয়েছে আমাকে। একজন কমলালেবু বইটি জীবনীগ্রন্থ না উপন্যাস—এটি আমার কাছে খুব জরুরি প্রশ্ন নয়। এটি আমার কাছে একটি সাহিত্যকর্ম, যা ফিকশন ও নন-ফিকশনের মাঝামাঝি এক ধূসর এলাকায় দাঁড়ানো। আমার কাছে জরুরি আজকের সাহিত্য বাস্তবতায়, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জীবনানন্দকে নিংড়ে বুঝে উঠবার আমার এই আকুতি। জীবনানন্দ বিষয়ে ইতিপূর্বে আরও বিস্তর লেখা হয়েছে; তাঁদের প্রতি ঋণ স্বীকার করেই একজন কমলালেবুতে আমি আমার নিজস্ব বয়ানে জীবনানন্দকে সার্বিকতায় উপস্থাপন করেছি। আমার আগের বিবিধ লেখাতেও গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, প্রবন্ধ, কবিতার উপাদান মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা আছে। সেসব লেখাকে কখনো অভিহিত করা হয়েছে ডকু ফিকশন, মেটাফিকশন বা ক্রিয়েটিভ নন-ফিকশন অভিধায়। বিশ্ব প্রেক্ষাপটেও সাহিত্যের সংজ্ঞাকে ক্রমশ বিস্তৃত হতে দেখছি। নোবেলজয়ী বেলারুশের লেখিকা স্‌ভেৎ​লিনা আলেক্সিয়েভিচের সাংবাদিকতার রিপোর্টগুলো যখন উপন্যাস হয়ে ওঠে, বব ডিলানের গানগুলো যখন বিবেচিত হয় কবিতা হিসেবে, মিলান কুন্ডেরা যখন উপন্যাসকে নিৎসের দর্শন আলোচনার পাটাতন করেন, জুলিয়ান বার্নেস যখন ফ্লবেয়ার-বিষয়ক তাঁর নিবিড় সাহিত্য সমালোচনাকে উপন্যাস হিসেবে উপস্থিত করেন, তখন আমি রস ও জ্ঞানকাণ্ডের দেয়ালগুলো ভেঙে যেতে দেখি, অনুপ্রাণিত হই।

তবে কথা এই যে একটি বই প্রকাশিত হয়ে গেলে সেটি আর লেখকের অধিকারে থাকে না। পাঠক/পাঠিকা হয় তাঁর সঙ্গে সংযোগ বোধ করেন, নয়তো করেন না। লেখকের তখন আর কোনো ঢাল নেই। লেখক হিসেবে আমার অর্জন শুধু এই যে—এই বই লিখতে গিয়ে জীবনানন্দের মতো এক আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে অভূতপূর্ব একটা সময় কেটেছে আমার। টের পেয়েছি, আজকের পৃথিবীতে কী দুর্দান্তভাবে প্রাসঙ্গিক তিনি, জেনেছি লেখক হিসেবে নতজানু হয়ে কত কিছু শেখার আছে তাঁর কাছে। ফরাসি লেখক গুস্তাফ ফ্লবেয়ার তাঁর বন্ধু আর্নেস্ত ফেদিউকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি কখনো আমাকে নিয়ে কোনো বই লেখো তাহলে এমনভাবে লিখবে, যেন তুমি আমার হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছ।’ প্রতিশোধ? কার বিরুদ্ধে? জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখতে গিয়ে যেন একটু একটু করে বুঝেতে পেরেছি ফ্লবেয়ার আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>