‘অর্থ পাচার হচ্ছে, জানি’

মে ১৪ ২০১৭, ১২:২৩

দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থ পাচার হচ্ছে, জানি। পাচারের বিভিন্ন কারণ। একটা কারণ হচ্ছে জমি নিবন্ধনের প্রকৃত খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও দেখানো হয় কম। ফলে কালোটাকা হয়। এ টাকা তাঁরা কী করবেন? দেশে তো খরচ করতে পারেন না, তাই পাচার করে দেন।’
সচিবালয়ে গতকাল শনিবার অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিবছরই বাজেট ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইআরএফের এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে প্রচলিত মৌজাওয়ারি জমি নিবন্ধনের সর্বনিম্ন হার বাতিল করে জমির প্রকৃত মূল্যের ওপর নিবন্ধন হার পদ্ধতি চালুর চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
অর্থ পাচারের অন্য কারণ হিসেবে বিনিয়োগ না হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিনিয়োগটা হয় স্থবির, না হয় অর্থ যাচ্ছে বিদেশে। তবে এটা (পাচার) কমবে। কারণ, দেশীয় বাজার বড় হচ্ছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশও এখন ভালো।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৫ ও ২০১৬ সাল আমরা হরতালবিহীন পেয়েছি। শ্রমিকেরা প্রমাণ করেছে যে তারা হরতালের বিপক্ষে। কাজ হচ্ছে তাদের অধিকার। ভবিষ্যতে তারা আর হরতাল দেখবে বলেও মনে হয় না।’
চলতি মাসে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালেই পাচার হয়েছে ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
ইআরএফের সভাপতি সাইফ ইসলাম দিলাল, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমানসহ সংগঠনের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)

চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান প্রমুখ।
দেশে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) পাঠাতে কোনো খরচ লাগবে না বলে জানান অর্থমন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ১০০ টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে ১ টাকা খরচ হয়। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী বাজেটে আমরা কিছু করব যাতে খরচটা না লাগে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে এটা সত্য। কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে আগে সব অর্থ প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়ে দিতেন, এখন কিছু কিছু নিজেদের জন্যও রেখে দেন।’
ইআরএফের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন ও গবেষণায় নজর দেওয়া, রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা, দুর্নীতি রোধে সরকারি কর্মচারীদের বুকে নামফলক রাখার ব্যবস্থা করা, কর ফাঁকিবাজদের তালিকা প্রকাশ করা এবং অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিছু প্রস্তাব নিয়ে মন্তব্য করলেও কিছু বিষয় এড়িয়েও যান অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এত দিন চেষ্টা করেছি শিক্ষার সম্প্রসারণে। অর্থাৎ প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী বৃদ্ধিতে জোর দিয়ে সফল হয়েছি। মানটা যে বাড়েনি ছাত্র-অভিভাবকদের কাছ থেকেও অভিযোগ এসেছে।’ আগামী বাজেটে গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে জানান মুহিত।
পুঁজিবাজার আগে ফাটকা বাজার ছিল—এমন মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাজারে আইনকানুন তেমন ছিল না আর এখনকার বাজারও ফাটকা বাজার না। বহুজাতিক কোম্পানি ও সরকারি লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে জোর দেওয়ার সময় এসেছে।’
বাজেট এলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে বলে প্রান্তিক মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়—ইআরএফের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শহীদুজ্জামানের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই এটা হচ্ছে না। আপনি খামোখা কথা বলছেন।’

Facebook Comments