অলৌকিক জলযান আমাদের বরিশালের

এপ্রিল ২৯ ২০১৭, ০৮:২৯

শওকত মিল্টনঃ ধলপহর কেটে গেছে অনেকক্ষণ, ভোরের ডিমের কুসুমে ততোক্ষনে আনাড়ী শিশুর নাকে মুখে লাগার মতো আকাশে ছড়িয়ে যাবার কথা। তবে মাঘের সময় বলেই কুয়াশায় ধোঁয়াশা চারদিক। বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে খেয়া পার হয়ে মাছ কিনতে যাচ্ছিলাম চন্দ্রমোহন। সাথে আমার নানা হেলাল কমিশনারের মোটর বাইক। কুয়াশা কিছুটা ফিকে হতে শুরু করেছে, জলের উপরে ধোঁয়া। কীর্তনখোলার বুকে হঠাৎই এক যাদুকরী, পরাবাস্তব ছবি। ধোঁয়াশা থেকে আস্তে আস্তে হলুদ রাজহাঁসের মাথা!! সাথে পুরুষালী জলদ গম্ভীর স্বর। আমি অবাক বালক হয়ে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকি। প্যাডেল হুইল স্টিমার অস্ট্রিচ বরিশাল ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। ধীর তবে ঋজু তার গতি। পুরো স্টিমারটা একবারে নজরে আসছে না। একটু একটু করে কুয়াশার ধোঁয়া থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে। কুয়াশার খোলস থেকে আস্তে আস্তে বের হতে থাকা স্টিমারের এই ছবি আমার চোখে এখনও লেগে আছে। পড়ে ঠিক সেই অনূভুতিটা অনূভব করা যাবে না। তবে যদি চোখ বুঝে লেখাটা দৃশ্যপটে সাজানো যায়, কিছুটা অনূভুত হতে পারে। আর একদিন খুলনা স্টিমারঘাটে। রাত তিন পহর। আশ্বিন মাসের কোজাগরী। ঘাটে দাড়িয়ে আছি। পূর্ণিমার আলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে ভৈরব-ই তালে। আকাশে না নদীর শেষ মাথায় কে যেন চাঁদটাকে বহু কষ্টে ঝুলিয়ে রেখেছে-তার পেট থেকে মিষ্টি আলোর অলংকার পড়ে গ্রীবা উঁচু করে আসছে, মাহসুদ জাহাজ আসছে। আলোর বন্যায় ভেসে আসছে। নতুন প্রেমে পড়া কিশোরীর মতো বিনম্র, লাজুক। এই দেখাটা খুব বেশীদিন আগের না, কত হবে ৭/৮ বছর। স্টীমার নিয়ে এই আদিখ্যেতা দখিনের মানুষের হতেই পারে। এখনও বরিশালের যা কিছু ভাল তার পেছনে স্টিমার সম্পর্কিত একটা ব্যাপার আছে। এই শহরের সবচেয়ে নতুন যে পার্ক-হিরন জমানায় হয়েছে, সেটাও স্টিমার কোম্পানীর জায়গা। বরিশালে প্রথম বিদ্যুত এসেছিলো স্টিমার কোম্পানীতে। স্টিমার ঘাট এবং কোম্পানীর অফিস-বাংলোতে। তখনও রায় কোম্পানী বরিশালে বিদ্যুত বিক্রি শুরু করেনি। সেই বৈদ্যুতিক বাতির অপরূপ রূপ দেখতে বরিশালের বাসিন্দারা ভীড় করতো বৈকি। বরিশালের সবচেয়ে সুন্দর বাংলো বাড়ীগুলো স্টিমার কোম্পানীর। আহা কি দারুন ছিলো, টিনশেড- সেমি পাকা এসব বাড়ীর চারদিকে ছিলো বৃক্ষরাজি। কি দারুন সব নাম হিম নীড়, শিলা নীড়। বাড়ীগুলো কালের গর্ভে হারায়নি, হারিয়েছে অযত্নে-অবহেলায়। রাজা রায় বাহাদুর সড়কের সবুজ শ্যামলিমায় এসব বাড়ী ছিলো স্বপ্নের মতো। নাই নাই করেও টিকে আছে চান বাংলো। বিশাল এই বাংলোতে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। বৃষ্টির দিনে দারুন অভিজ্ঞতা। সে আরেক গল্প। বরিশালের একমাত্র পদ্ম পুকুর সেও স্টিমার কোম্পানীর।বরিশালে এক সময় যারা স্টিমার কেম্পানীতে চাকরী করতেন তাদেরকে সমীহের চোখে দেখা হতো। এই যে বরিশালের বিখ্যাত ব্রেকফাস্ট ক্যাফে বলাকা। এখন উত্তম দাস চালান, তাঁর বাবা স্বর্গীয় কালু দাস এর হাত ধরে গোড়া পত্তন। কালু দাসের হাতের যাদুটা এসেছে

স্টিমার কোম্পানী থেকে। তিনি জাহাজের বাটলারের সহযোগীর কাজ করতেন। বরিশালবাসীর আভিজাত্য-বিলাসিতার পেছনেও স্টিমার কোম্পানী। অর্থনৈতিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন স্টিমারে সবাই প্রথম শ্রেনীতেই যেতে চায়। স্টিমারের প্রথম শ্রেনীর কেবিন পেতে বরিশালের মানুষ কি পরিমান তদবীর এবং ক্ষমতা ব্যবহার করেন তা জানেন যারা স্টিমার কোম্পানীতে চাকরী করেন আর যারা স্টিমারে যাতায়াত করেন। বিমানের টিকেট পাওয়াও সহজ স্টিমারের ঢাকা-বরিশাল বা বরিশাল – ঢাকার একটি কেবিন পাওয়ার চেয়ে। তবে স্টিমারে প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেনীর পাশাপাশি আরো একটা শ্রেনী ছিলো, যাকে বলা হতো ইন্টার ক্লাস। প্রথম শ্রেনীতে ঢোকার পথে বাম দিকে ঘেরা দেয়া একটা জায়গা থাকতো। ওই কক্ষের মাঝখানটা খালি আর চারদিকে দেয়াল ঘেঁষা কাঠের বেঞ্চ। উপরে বৈদ্যুতিক পাখা। সাধারনত দক্ষিনের গ্রামের গেরস্থ বাড়ীর মানুষজন এই ক্লাসে যাতায়াত করতো। আমি তখন কিশোর, আমার নানীর ন্যাওটা। পটুয়াখালী থেকে কাঠের ভটভটি লঞ্চে বরিশাল। সেখান থেকে গাজী স্টিমারের ইন্টার ক্লাসে। আমার মেজমামাও সাথে ছিলেন। গন্তব্য খুলনা। ইন্টারক্লাসে প্রথম শ্রেনীর ঝকমকে ভাব বা দ্বিতীয় শ্রেনীর আদর-আপ্যায়ন কিছুই ছিলো না। ঘোলাটে হলদে আলো একটা ভুতুড়ে আলো দিচ্ছিল। আর আমরা ঝিমুচ্ছিলাম। কেননা সেখানে শোবার জায়গা ছিলো না। ইন্টার ক্লাসে হয়তো মধ্য মধ্যবিত্তের মান রক্ষা হতো তবে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন হতো তার চেয়ে বেশী। স্টিমারের ডেকে আম জনতার সাথে পুরুষ- মহিলা ভেদহীন জায়গায় শুয়ে বসে যাওয়া এই শ্রেনীর আঁতে ঘ লাগার মতো। স্টিমারের ডেকে আমার শেষ কৈশোর বা উঠতি যৌবনে বহুবার। দলবেধে ডেকে যাবারতো তুলনাই হয় না। শীতে স্টিমারের কাঠের ডেকে বেশ একটা ওমে যাওয়া যেতো যা লঞ্চের লোহার পাতের ডেকে পাওয়া যায় না। ডেকে দলবেধে যাবার বড় সুবিধা হচ্ছে নিরন্তর আড্ডা-চাপাবাজী-রাগ-ক্ষোভ। ঘন্টায় ঘন্টায় চা। ডেকে ঝগড়া-হাতাহাতির ঘটনা ঘটেনি এমন যাত্রা কোন স্টিমারের কপালে ঘটেছে বলে মনে হয় না। স্টিমারের ডেকে সবসময় দাপট ছিলো দুই এলাকার চাঁদপুর আর বরিশালের। ঢাকা থেকে স্টিমার ছাড়ার পর চাঁদপুর ছাাড়ার আগ পর্যন্ত চাঁদপুরের লোকজনের হম্বিতম্বি, বরিশাল চুপ তবে যদি দেখা যেতো বান্দা চাঁদপুরের না তাহলে তার যে কি ভোগ হতো! বরিশালের নীরিহ বালকটিও বেদম সাহসী তখন। অনেকেই ফাঁক-ফোকর গলে যদি স্টিমারের খোলা প্রান্তরে যেতে পারতো তবে সহসা বের হতো না। আবার একটা কেবিন নিয়ে সাত-আটজন বন্ধু-বান্ধব একসাথে। সারারাত আড্ডা দিয়ে গন্তব্যে। এই যে সারারাত বসে যাওয়া সেও শান্তি! কাছের লোকজনকে বলে বেড়াতো স্টিমারের ফাস্ট ক্লাসে আইছে!! এই যে স্টিমারে যাতায়াত-এটাই একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো। স্টিমারকে সবসময় বরিশালবাসী তাদের সম্পদ মনে করতো-এখনও করে। স্টিমার তাই আমাদের কাছে এক অলৌকিক জলযান, যার লৌকিকতা ভরে আছে আমার বা আমাদের শৈশব- কৈশোর আর যৌবনের দিনগুলো।

বি:দ্র:লেখাটি সাংবাদিক শওকত মিল্টনের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>