অশরীরী ভালোবাসা

আপডেট : February, 24, 2017, 6:10 am

এক.

ঘড়ির কাঁটা রাত ৯টা ছুঁই ছুঁই। কাজের চাপে ত্রাহি অবস্থা। অফিসের জরুরি ফাইল নিয়ে ব্যস্ত আছি বাসায়। রাতের মধ্যে দেখে শেষ করতে হবে। বসের নির্দেশনা এমনি। ইদানিং টুকটাক বিষয়ের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগটুকুও পাই না। নিজের শরীরের প্রতিও নয়। এ ছন্নছাড়া জীবনে কী-বা হবে! যে দেখতো সেতো হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। দূরে বহুদূরে।

ফাইলে মন বসাতে পারছি না। বার বার চোখ আটকে যাচ্ছে দেয়াল ঘড়ির দিকে। এখনি ধ্যানে মগ্ন হতে হবে। আধা ঘণ্টার ধ্যান। ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা। বসে বসে লিলিকে ভাবতে হবে। এ সময়টা একান্ত আমার আর লিলির। সারাদিনের পর রাতের এ সময়টুকু আমরা একে অপরকে দিই। একই সময়ে দুজন-দুজনকে ভাবতে বসি। দূরত্বের দিক থেকে যে যেখানে যতদূর থাকি, মনের দিক থেকে এ সময়টুকু আমরা কাছাকাছি থাকি।

দু’মাস হলো লিলির খোঁজ নেই। তবুও এ সময়টুকু লিলি আমার কাছেই থাকে। অশরীরীভাবে। ওর অস্তিত্ব আমি বুঝতে পারি। রাগ অভিমানও। ঘরজুড়ে ওর হাসি শুনতে পাই। হাঁটার শব্দ শুনতে পাই। শ্বাস-প্রশ্বাস উঠা-নামার মৃদু শব্দ শুনতে পাই। আরো কত কী। চোখের আড়াল হলে কী মনের আড়াল হয়!

আচ্ছা, লিলি এখন কোথায়? ও কী আমাকে নিয়ে ভাবছে? ছিহ! আমি এসব কী ভাবছি? আমাদের মধ্যে তো এমনই কথা ছিল! এসব ভাবনা চিন্তা নিয়ে ওর কখনো ভুল হয়নি। লিলি ভুল করার মেয়ে নয়। এ বিচিত্র আইডিয়াটা ওই তো আমাকে প্রথম দিয়েছিল। এটা এক আশ্চর্য ভালোলাগা ফিলিংস! ভালোবাসা এমনি!! খুব দূরে থেকেও কাছে থাকা যায়, কাছে আসা যায়।

দুই.

আজ শনিবার। অফিস নেই। কাজে থাকতে পারলে ভালো। যদিও একসময় উল্টো মনে হতো। লিলিকে হারানোর পর থেকে রাতের ওই সময়টুকু ছাড়া ভাবনা-চিন্তায় অনেক পরিবর্তন এসেছে।

ফার্মগেট পার্কে আজ প্রতিদিনের তুলনায় লোকজন

অনেকটা কম। দুই-চারজন। এদের কেউ লিলি না। প্রতিদিন এখানে অফিস থেকে আসার পথে একটু খোঁজ-খবর নিই। আজ একটু আগে-ভাগে চলে আসি। আশা যদি লিলিকে পেয়ে যাই। লিলিকে প্রথম এখানে দেখেছিলাম। প্রথম দেখাতেই তাকে আমার ভালো লেগে যায়। টানা টানা হরিণীর চোখ, দীঘল কালো খোলা চুল আর হলুদ শাড়িতে তাকে অপুর্ব লাগছিল। সাদামাটা হালকা সাজেই লিলিকে অপুর্ব লাগে। বাঁকা চাহনি আর খিলখিল হাসি হৃদয় হরণ করার মতো।

সহজ-সরল টাইপের মেয়ে ও। ইন্দিরা রোডে ওদের বাসা। লিলিরা এখানে সাতক্ষীরা থেকে এসেছে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। বদলির চাকরি। গত দু-মাসে ছয় ছয়বার ওদের বাসার কড়া নেড়েছি। নতুন ভাড়াটিয়া ওঠেছে। কেউ কোন খোঁজ দিতে পারেনি। লিলির সাথে মোবাইলে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। যোগাযোগ করতে পারিনি। সুইচ অফ।

এ জীবনে কী আর লিলিকে পাবো না? আমিই প্রথম লিলিকে প্রপোজ করি। হাঁটু গেড়ে ডান হাতে লাল গোলাপ বাড়িয়ে বলেছিলাম, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ ভালোবাসি কথাটা শুনে ও আকাশ থেকে পড়ল! অস্ফুটস্বরে বলল, ‘ভালোবাসা! ওম্মা ওটা আবার কী!’ তারপর শুরু হয় হাসি। হাসি আর থামে না।

‘ভালোবাসা’ শব্দটি যেন লিলি এ জীবনে আর শুনেনি! আজই প্রথম শুনল। সহজ-সারল্যে ভরা মুখে লিলির অদ্ভুত প্রতিক্রিয়াও তাই বলে। লাজ রাঙা চোখে গালে টোল পড়াটাও ছিল মনে রাখার মতো। কথাটা আজও আমার কানে ভেসে আসে। রাস্তা চলার পথে কোন তরুণীর মুখে ‘ওম্মা’ কথাটা শুনলে আমার দৃষ্টি আটকে যায়। কে ওখানে? লিলি নয়তো?

তিন.

লিলির অশরীরী আত্মা আমার সঙ্গেই থাকে। নিরন্তর খুঁজে ফিরি রক্ত-মাংসের শরীরী লিলিকে। ওই তো লিলি, ওকে দেখতে পাচ্ছি। হাতের একদম নাগালে। আমার সামনে হেঁটে যাচ্ছে। বাতাসে ওর ভুবনজয়ী হাসি শোনা যাচ্ছে। অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে ভেসে যাচ্ছে লিলির হাসি। ঝর্ণার মতো। খিল খিল শব্দ করে।

Facebook Comments