আমতলীতে আমন বীজ ধানের কৃত্রিম সঙ্কট,৩৫০ টাকার বীজ ৬৫০ টাকায় বিক্রি

আমতলী প্রতিনিধি: আমতলীতে আমন ধানের বীজের কৃত্রিম সঙ্কট চলছে। কৃষকরা বাজারে বিআর-২৩, বিআর-৪৯ ও বিআর – ৫২ (ভিত্তি) জাতের ধানের বীজ পাচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী এ জাতের বীজ না পাওয়ায় কৃষক দিশেহারা। অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃপক্ষ ডিলারদের সাথে সিন্ডিকেট করে বীজের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। এতে কৃষকদের বাজার থেকে দ্বিগুন মূল্যে বীজ কিনতে হচ্ছে।
আমলতলী কৃষি অফিস সূত্রে জানাগেছে, আমতলীতে এ বছর আমনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ১২ হাজার হেক্টর জমির জন্য ৪০ মেট্রিক টন আমন ধানের বীজ বরাদ্দের জন্য বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে চাহিদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএডিসি কর্তৃপক্ষ কৃষি অফিসের চাহিদা অনুযায়ী বীজ পেলেও সরবরাহ করছে না। কৃষকরা ক্ষেতে আমন ধান চাষাবাদে জন্য প্রস্ততি নিয়েছে। পুরো আষাঢ় জুড়ে আমনের বীজতলার জন্য বীজের চাহিদা রয়েছে। বাজারে আমনের বিআর-২২, বিআর-২৩, বিআর- ৫২ (ভিত্তি), বিআর-৪৯, বিআর-১১, বিনা-৭,বিরি-৪৪ ও বিরি-৪০ আট জাতের ধানের বীজ রয়েছে। এর মধ্যে বিআর-২২, বিআর-৫২ (ভিত্তি) ও বিআর-৪৯ জাতের ধানের চাহিদা বেশী। এ তিন জাতের ধানের বীজে ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের এ বীজের প্রতি ঝুঁক বেশী।
বিএডিসি অফিস সুত্রে জানাগেছে, আমতলীতে বিভিন্ন জাতের ৬০ মেট্রিক টন আমনের বীজ ধান বরাদ্দ করা হয়েছে কিন্তু চাহিদা বেশী থাকায় ৭০ মেট্রিক টন সরবরাহ করা হয়েছে । এ উপজেলায় বিএডিসি’র নিয়োগকৃত ১১ জন ডিলার রয়েছে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিআর-২২, বিআর-৫২ ও বিআর -৪৯ ধানের বীজের দাম ৩৫ টাকা কেজি দরে ১০ কেজির এক বস্তা ধানের মূল্য ৩৫০ টাকা। এ দামে কৃষকদের কাছে বীজ বিক্রি করার কথা থাকলেও ডিলাররা ভ্যাট, পরিবহন ও লেবার খরচ দেখিয়ে ওই বীজ বেশী টাকায় বিক্রি করছে। বরাদ্দ ও চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশী হওয়া সত্ত্বেও আমতলীতে বীজের চরম সঙ্কট চলছে। ডিলাররা অভিযোগ করেন বিএডিসি কর্তৃপক্ষ চাহিদা মত বীজ সরবরাহ না করায় বাজারে বিআর-২২, বিআর-৫২ ও বিআর-৪৯ ধানের বীজের চরম সঙ্কট চলছে।
কৃষকরা অভিযোগ করেন ডিলার ও বিএডিসি কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেট করে বাজারে বীজের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দ্বিগুন মূল্যে বিক্রি করছে। অনেক ডিলার বীজ গুদামজাত করে রেখে দিয়েছেন। তাদের চাহিদামত দামে বীজ বিক্রি করছে।
শনিবার আমতলী পৌর শহরের একে স্কুল সড়কের মেসার্স হাওলাদার টেড্রার্স, হাসপাতাল সড়কের মেসার্স ইউনুস এন্ড সন্স, মামুন এন্টার প্রাইজ ও জাহিদ এন্টার প্রাইজ ঘুরে দেখাগেছে, বিআর-২২, বিআর-৫২, বিআর-৪৯ ও বিআর-২৩ জাতের ১০ কেজির এক বস্তা ৩৫০ টাকার বীজ ধান ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছে।
এদিকে ওইদিন সকালে আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মুশফিকুর রহমান ও কৃষি অফিসার এসএম বদরুল আলম দ্বিগুন মূল্যে বীজ বিক্রি রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। হাসপাতাল সড়কের জাহিদ এন্টার প্রাইজের মোঃ খালেক মিয়াকে লাইসেন্স বিহীন বীজ রাখা ও দ্বিগুন মূল্যে বীজ বিক্রি করার অপরাধে ভোক্তা অধিকার আইনের ৪০ ধারায় ৫০০০ টাকা জরিমানা করেছে। একই

সময়ে ওই সড়কের মামুন এন্টার প্রাইজের প্রোপাইটার মামুন মিয়াকে বরাদ্দের চেয়ে বেশী বীজ এনে দ্বিগুন মূল্যে বিক্রি করায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। মামুন এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সের নামে বিএডিসি’র বরাদ্দ ৫ মেট্রিক টন কিন্তু তিনি পটুয়াখালী বিএডিসি অফিস থেকে ২৬ মেট্রিক টন বীজ ধান উত্তোলন করেছে। এ বীজের বিক্রির সঠিক কোন তালিকা মোবাইল কোর্টকে দেখাতে পারেনি।
কালিবাড়ী গ্রামের বাবুল মিয়া ও মহসিন বলেন ৬৫০ টাকা দরে দুই বস্তা বিআর-৪৯ জাতের বীজ ইউনুস মিয়ার দোকান থেকে ক্রয় করেছি। চালিতাবুনিয়া গ্রামের কৃষক ফিরোজ মৃধা অভিযোগ করে বলেন ডিলাররা বাজারে বীজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশী মূল্যে বীজ বিক্রি করছে। তিনি আরো বলেন বিআর-২৩ ধানের ১০ কেজির তিন বস্তা বীজ ৬৫০ টাকা দরে ১৯৫০ টাকায় ক্রয় করেছি। চন্দ্রা গ্রামের কৃষক আশ্রাব গাজী বলেন বাজার ঘুরে মেসার্স ইউনুস এন্ড সন্সের দোকান থেকে বিআর-২৩ ধানের এক বস্তা বীজ ৬৫০ টাকা ক্রয় করেছি। আমতলী হাসপাতাল সড়কের মেসার্স ইউনুস এন্ড সন্সের প্রোপাইটার ইউনুস মিয়া বলেন বাজারে বিআর-২২, বিআর-৫২ ও বিআর-৪৯ জাতের বীজের তীব্র সঙ্কট চলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে কৃষকদের এ জাতের বীজ দিতে পারিনি। প্রতিদিন কৃষকরা এসে এ বীজ চাচ্ছে। পটুয়াখালী বিএডিসি গুদাম থেকে বীজ ধান সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন পটুয়াখালীর দু’জন ডিলার বাজার নিয়ন্ত্রন করছে। তারা জুন মাসে ৫৫ মেট্রিক টন বিআর-২৩ ও ভিত্তি-৫২ ধানের বীজ গুদাম থেকে উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
মেসার্স হাওলাদার এন্টার প্রাইজের প্রোপাইটার মোঃ নাজমুল হাসান বলেন বীজের প্রচুর চাহিদা রয়েছে কিন্তু বিএডিসি বীজ সরবরাহ না করায় কৃষকদের দিতে পারছি না।
পটুয়াখালী বিএডিসি উপ পরিচালক আসাদুজ্জামান মুঠো ফোনে বলেন আমতলীতে ৬০ মেট্রিক টন বিভিন্ন জাতের আমনের বীজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওইখানে বরাদ্দের চেয়ে ১০ মেট্রিক টন বেশী বীজ সরবরাহ করেছি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুন দামে বীজ বিক্রি ও বরাদ্দের চেয়ে বেশী দেয়ার পরেও বীজের সঙ্কট কেন? এম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এ বিষয়টি আমার দেখার নয়, এগুলো দেখবে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ডিলারদের সাথে আপনী সিন্ডিকেট করে বাজারে বীজের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও ডিলারদের বেশী মূল্যে বীজ বিক্রির সহযোগিতা করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা।
আমতলী কৃষি অফিসার এসএম বদরুল আলম বলেন বিএডিসি কর্তৃপক্ষ কৃষি অফিসের সাথে কোন সমন্বয় করছে না। তারা তাদের ইচ্ছামত ডিলার নিয়োগ দিয়ে বীজ সরবরাহ করছে। পটুয়াখালী বিএডিসি অফিসের উপ-পরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামানের কাছে বীজ বরাদ্দ ও সরবরাহের পরিমান জানতে চাওয়া হলে তিনি জানাননি।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোঃ মুশফিকুর রহমান বলেন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশী দামে বীজ বিক্রির অভিযোগে পেলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন শনিবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দু’জনকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

 

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>