আমাকে হুমকি দিয়ে লাভ নেই- প্রধানমন্ত্রী

আগস্ট ২২ ২০১৭, ০৯:৩৩

পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ওই হুমকি আমাকে দিয়ে লাভ নেই।’ তিনি বলেন, সব সহ্য করলেও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা তাঁরা কিছুতেই সহ্য করবেন না।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা স্মরণে এই সভার আয়োজন করে দলটি। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এবং কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের রেকর্ড থেকে তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই এ রায়, বিশেষ করে রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। মন্ত্রী, সাবেক বিচারপতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল এ নিয়ে কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিতভাবে আলোচনা করলেও এই প্রথম প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলেন।

এই রায়ে বহু অবান্তর ও স্ববিরোধী কথাবার্তা থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিভিন্ন ত্রুটি জাতির সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের আদালত বড় আদালত। জনগণের আদালতকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

গত রোববার সর্বোচ্চ আদালতে অন্য একটি মামলার শুনানির প্রসঙ্গ টেনে গতকালের আলোচনায় প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব সহ্য করা যায়, কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে এটা আমরা কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। পাকিস্তান রায় দিল দেখে কেউ ধমক দেবে, জনগণের কাছে এর বিচার চাই।’ তিনি বলেন, ‘আজকে পাকিস্তানের সঙ্গে কেন তুলনা করবে? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কেন তুলনা করবে?’

শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। এর সঙ্গে তুলনা করায় তিনি জনগণের কাছে এর বিচার চান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করতে দেওয়া হবে না। যদি কেউ সেই অপচেষ্টা চালায়, তাকে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা ভালো, কিন্তু তা বালকের জন্য নয় বলে একটা কথা আছে। আমরা বালকসুলভ আচরণ আশা করি না।’

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত বিচারপতি জয়নাল আবেদীনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘জয়নাল আবেদীন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার যে তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য দিয়ে লেখা। বিএনপি সরকারের ফরমায়েশি তদন্ত রিপোর্ট তিনি দিয়ে গেছেন। তিনি যে দুর্নীতি করেছিলেন, সেই দুর্নীতির তদন্ত দুদক যখন করতে গেছে, তখন দুদকের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য চাওয়া হয়। আর সেখানে প্রধান বিচারপতি চিঠি দিয়ে বললেন, এই জয়নাল আবেদীনের দুর্নীতির তদন্ত করা যাবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করবে, তারপর যদি সে তদন্তে দোষী হতো, তাহলে তো আদালতেই বিচার চাইতে যেত। আদালতে বিচার চাইলে না হয় উনি (প্রধান বিচারপতি) কিছু বলতে পারতেন। কিন্তু তদন্ত করা যাবে না—এই কথাটা প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি কীভাবে বলেন? তার মানে একজন দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেওয়া, দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা, এটা তো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়। এটা তো সংবিধানকে লঙ্ঘন করা, অবহেলা করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলে সেখানে কোনো বিচার হবে না। তিনি বলেন, ‘বিএনপির আমলে এমন এমন জজ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, দেখা গেল কারও সনদ জাল, কেউ কূটনৈতিক মিশনের দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে বাথরুমের কাজ সেরেছেন। পুলিশ যখন ধরল, বলল, আমি জাজ সাহেব। কাকে বিএনপি আমলে জজ করা হয়েছে? ছাত্রদলের দুই নেতাকে দুই পাশে রেখে রায় পড়ে শোনাচ্ছেন—এ রকম জজও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা আইন মানেননি, কোর্টের স্যানটিটি (পবিত্রতা) যাঁরা ভেঙেছেন, তাঁদের সবাইকে রক্ষা করার জন্যই কি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল উনি চাচ্ছেন? ওটাও তো রাষ্ট্রপতির কাছেই যেতে হবে। আর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হাতিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটা কোন ধরনের দাবি? এটা কোন ধরনের কথা।’

দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আইন পাস হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেটাকে এক কলমের খোঁচায় নাকচ করে দেওয়া, তার মানে এতগুলো সংসদ সদস্য, কর্মকর্তা—সবাই মিলে এতগুলো কাজ করলেন, তাঁদের কারও কোনো জ্ঞানবুদ্ধি নাই? জ্ঞানবুদ্ধি ওই এক-দুজনের?’

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ে সব বিচারপতি স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পেরেছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই সুযোগটা বোধ হয় প্রধান বিচারপতি দেন নাই। রায়টা পড়লে অনেক কিছু বোঝা যায়। কারণ, আমরা রায়টা পড়ছি। আরও কিছু বাকি আছে, পড়ব। তারপর পার্লামেন্টে এটা অবশ্যই আলোচনা করব। প্রতিটি জায়গায় অনেক কথা বলার অবকাশ আছে এবং সময়মতো অবশ্যই বলব। কাজেই জাতির সামনে এগুলো তুলে ধরতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন বলেই আজকে উচ্চ আদালত আছে এবং অনেকে এখানে বসতে পেরেছেন। আর নিয়োগ

দেন কে? মহামান্য রাষ্ট্রপতি।’ প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যাঁকে নিয়োগ দিলেন, তিনি আবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছেন, যে ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। সেটা দেওয়া হচ্ছে না বলেই যত রাগ আর গোসসা।’

সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘অশালীন’ মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না।…জনগণের প্রতিনিধিরাই সংসদ সদস্য। জনগণ হচ্ছে ক্ষমতার মালিক। এ কথাটা ভুললে চলবে না।

বাসস জানায়, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি উচ্চ আদালত থেকে নানা ধরনের বক্তব্য, রাজনৈতিক কথাবার্তা এবং হুমকি-ধমকি। আমার মাঝে মাঝে অবাক লাগে, যাদের আমরা নিজেরাই নিয়োগ দিয়েছি, রাষ্ট্রপতিই নিয়োগ দিয়েছেন এবং নিয়োগ পাওয়ার পরে হঠাৎ তাদের বক্তব্য শুনে এবং সংসদ সম্প‌‌র্কে যে সমস্ত কথা বলা হচ্ছে, সংসদ সদস্য যারা তাদেরকে “ক্রিমিনাল” বলা হচ্ছে। সেখানে ব্যবসায়ী আছে, সেটাও বলা হচ্ছে। কেন, ব্যবসা করাটা কি অপরাধ?’ প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘এভাবে সংসদকে হেয় করা এবং সংসদকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা, এর অর্থটা কী?’

 প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংবিধানের কোনো কোনো অনুচ্ছেদ যেটা মূল সংবিধানে ছিল, সেটাও ওনার পছন্দ নয়। পছন্দ হচ্ছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা ওই জিয়াউর রহমানের অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। হাইকোর্টেরই যেখানে রায় রয়েছে যে জিয়ারÿক্ষমতা অবৈধ, সেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করে দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান, সেটাই ওনার (প্রধান বিচারপতি) পছন্দ। কিন্তু গণপরিষদ যে সংবিধানের ধারা করে দিয়েছে, সেই ধারা ওনার পছন্দ নয়। সেখানে উনি চাচ্ছেন মার্শাল লর সময় যেটা করে গেছে, সেটা।’

রায়ে সংসদ কত দিন চলবে, তা নিয়ে প্রধান বিচারপতি ভুল মন্তব্য করেছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মন্ত্রিসভা নয়, সংসদ কত দিন চলবে, তা ঠিক করে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, যার সভাপতি স্পিকার। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সংসদীয় চর্চার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নারীর ক্ষমতায়নে সংরক্ষিত ৫০টি আসন রাখার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা নিয়েও প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছেন। নারীদের কেন এভাবে নির্বাচিত করা হয়।…এটা নিয়ে মন্তব্য করলে আমার প্রশ্ন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কীভাবে? সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। সেই রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতিকে। তাহলে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ নির্বাচন করতে পারবেন। সেই রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত হয়ে চেয়ারে বসেই তাঁর নিজের নির্বাচনের কথা ভুলে গেলেন।’ প্রধান বিচারপতির বিভিন্ন কথাবার্তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কথাগুলো বলার আগে ওই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল বা বলেই সরে যাওয়া উচিত ছিল।

প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ল না প্রধান বিচারপতির? ফ্লাইওভার, রাস্তা দিয়ে কি উনি চলেন না নাকি?’

শেখ হাসিনা এই মামলার অ্যামিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেনেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন অ্যাটর্নি জেনারেলকে জঘন্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। ড. কামাল কখনো নির্বাচিত হতে পারেননি, বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। উনি আবার সংসদ সদস্যদের নিয়ে কথা বলেন।’

গত নির্বাচনে অনেকের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যুক্তি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনী আইনে আছে, অন্য কোনো প্রার্থী না থাকলে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। কোনো দল নির্বাচনে অংশ না নিলে যিনি এভাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন, সেটা তো তাঁর দোষ নয়। সে জন্য সংসদের বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্ন আসতে পারে না।

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ।

গ্রেনেড হামলা দিবসের স্মরণ

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৩তম বার্ষিকী পালিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করেছে। ১৪ দলভুক্ত রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও নিজেরা কর্মসূচি পালন করেছে, আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে শামিল হয়েছে। এই দিনের মূল কর্মসূচি ছিল আলোচনা সভা।

রোববার মধ্যরাতে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে মোমবাতি প্রজ্বালন করে গ্রেনেড হামলা দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গ্রেনেড হামলায় নিহত ২৪ জনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ২৪ মিনিট নীরবতা পালন করেন।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ গতকাল বিকেলে ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে গ্রেনেড হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় অনেকেই ওই দিনের বীভৎসতা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

 

Facebook Comments