আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা

জুন ০৭ ২০১৭, ১৭:১৬

লিটন বাশারঃ ছোট বেলায় শার্লক হোমস, মাসুদ রানা আর তিন গোয়েন্দার গল্প পড়েননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন। তখন গোয়েন্দা চরিত্র গুলো আমাদের কল্পনার ক্যানভাসে কখনো কখনো ম্যাকগাইভার চরিত্র কে হার মানিয়ে স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেত।  আরথার কোনান রচিত শার্লক হোমস চরিত্রটি আজও পৃথিবীর মানুষকে বুঁদ করে রেখেছেন। অসাধারন যুক্তি, চুলচেরা বিশ্লেষন এখনো আমাকে মুগ্ধ করে।  অসীম সাহসী এই চরিত্রটির মূল আকর্ষণ আজও অমর হয়ে আছে। এরপরে আছে ফেলুদা । সত্যজিৎ রচিত ” ছিন্নমত্তার অভিশাপ ” বইটি অথবা ” বাদশাহী আংটি ” আকৃষ্ট করে রাখবে যে কোন মানুষকে। মাসুদ রানা বা বোমক্যাশ কিংবা কাকাবাবু বইগুলো সাধারন মানের হওয়ায় শিশু বয়সে যে কাউকে সেই চরিত্র টানবেই। শার্লক হোমসের গোয়েন্দা কাহিনী ও মাসুদ রানার গুপ্তচর বৃত্তির বুদ্ধিমত্তা দেখে হয়তো কিশোর বয়সে আমার মত সকলেই মনে মনে আফসোস হতো ‘ এমন পাক্কা একজন গোয়েন্দা নিজে হওয়ার বাসনায়। আমরা কৈশরে স্বপ্নের জাল বুনতাম শার্লক হোমস বা মাসুদ রানার মত একজন দক্ষ চৌকশ গোয়েন্দা হওয়ার নেশায়। বড় হয়ে বুঝলাম সবই তো গল্পের রং মিশানো চরিত্র। তবে বাস্তবে যে গোয়েন্দারা রয়েছেন দেশ বিদেশে তারাও দেখি সেই গল্পের চরিত্রের গোয়েন্দাদের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।

বিভিন্ন দেশের সরকারি বিশেষায়িত সংস্থা যা আইন প্রয়োগে, জাতীয় নিরাপত্তা সংরক্ষনে, সামরিক প্রতিরোধে ও বৈদেশিক নীতি প্রনয়নের সহায়তার জন্য বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, গবেষনা ও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। সরাসরি কিংবা গোপনীয় বিভিন্ন উপায়ে গোয়েন্দা  সংস্থা গুলো তথ্যাদি সংগ্রহ করে থাকেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজের প্রেক্ষিতে দুটো অংশে ভাগ করা যায়। প্রথমত, নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থা রাস্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধানে কাজ করে। দ্বিতীয় বৈদেশিক কাজে নিযুক্ত গোয়েন্দা সংস্থা: যা বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথ্যাদি সংগ্রহে নিযুক্ত থকেন।

বিশেষ করে রাস্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী বিভাগ অনেকটাই ভরসা করেন গোয়েন্দা সংস্থার উপরে। কারন গোয়েন্দা সংস্থা যে পরিমান গুরুত্বপূর্ন তথ্য সরকারকে দিয়ে থাকেন তা কখনোই কোন সাধারন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তদুপরি দেশে যখনই কোন সামরিক শাসন এসেছে তখনই গোয়েন্দা সংস্থা গুলো প্রশ্ন বিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি গোয়েন্দা সংস্থাকে দাড়াতে হয়েছিল ২০০৭ সালে। সেই বহুল আলোচিত সমালোচিত ওয়ান ইলেভেনের সময় এ দেশের মানুষ তথা বরিশালবাসী দেখেছেন কতিপয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা কি ভাবে চোখের পলকে নিজেদের চরিত্র বদলে মানুষের টুটি টিপে ধরেছেন। সাধারন নিরহ ব্যবসায়ী কিংবা সাংবাদিক কাউকে রেহাই দেওয়া হয়নি। আজো মনে পড়ে লে. কর্নেল পদ মর্যাদার এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বার বার তার দপ্তরে ডেকে নিয়ে কি ভাবে মানুসিক টর্চার করতেন। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে তখন বরিশালের সেনা ক্যাম্পের ইন-চার্জ লে;কর্ণেল মোহম্মদ আলী, জেলা প্রশাসক প্রয়াত মঞ্জুর -ই লাহী ও পুলিশ কমিশনার হিসাবে খান সাইদ হাসানের মত কয়েক জন ভাল মানুষ বরিশালের গুরুত্বপূর্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালবাসীর জন্য অনেকটা রক্ষা কবজ হিসাবেই যেন দেবদূত হয়ে এসেছিলেন এই সোনার মানুষ গুলো। তাদের কারনেই এখানকার মানুষকে তেমন হয়রানীর শিকার হতে হয়নি। তা না হলে ঐ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হয়তো বরিশালের অনেক মানুষের আন্ডারওয়ার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যেতেন। তার ‘মুখে শেখ ফরিদ আর বদলে ইট’। গোয়েন্দা দপ্তরে লেখা থাকতো আল-কোরানের বানী, আর মুখে থাকতো জালেমের শব্দ। সৎ উপদেশ দিয়ে ব্যবসায়ীদের পকেট কেটে নিজের পকেট ভারী করতেন। ভয় দেখাতেন, নীতি কাব্য শুনাতেন,

দেশ প্রেম শিখাতেন আবার নিজেই অনৈতিক ভাবে কোন মামলায় কার বিরুদ্ধে চার্জশীট হবে এবং কাকে আসামীর তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে তার সবই নির্দেশ দিতেন সেই লে: কর্নেল।  ওয়ান ইলেভেন বিদায় হওয়ার পর শুনেছি এমন কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভয় ভীতি দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চাকুরীচ্যুত হয়েছেন। অন্যায়ের সাথে যুক্ত পাপীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি সাধারন মানুষকে স্বস্থি দেয়।
অভিশপ্ত ওয়ান ইলেভেনের বিদায় হয়েছে আজ প্রায় ৮ বছর। ইতিমধ্যেই দেশের রাজনীতি অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরে দাড়িয়েছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা গুলো। গোয়েন্দা সংস্থার সর্বত্রই যেন এখন খাটি সোনার মানুষ গুলোকে বসানো হয়েছে। তাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি থেকে এখন আর কোন কিছুই এরায় না। আমরা যারা টাকা পয়সার নেশায় সব ভুলে শুধু অর্থ বৃত্তের পিছনে ঘুরছি কিন্ত আমার অপকর্ম যে আবার কেউ গোপনে দেখছেন জানছেন সেই খেয়াল আমরা হারিয়ে ফেলছি। যার একটি বাড়ি রয়েছে তিনি দশটি বাড়ি তৈরীর নেশায় মশগুল। যার একটি গাড়ি রয়েছে তিনি আরো ৫টি অত্যাধুনিক মডেলের গাড়ির পিছনে ছুটছি। সম্পদের নেশায়  ঠিক যেন আমরা পাগল হয়ে গেছি । একজন মানুষ কয়টি বাড়িতে বসবাস করতে পারেন! একজন মানুষের চলাফেরার জন্য কয়টি গাড়ির প্রয়োজন! সে সব কিছু আমরা ভুলে গিয়ে সৎ ও অসৎ কিংবা ন্যায় – অন্যায়ের তোয়াক্কা না করেই অর্থ লিপাসু হয়ে উঠছি। নিজেকেই একাকী চালাক মনে করে বাকী সব মানুষদের বোকা ভাবছি। ক্ষমতার দম্ভে নিজেকে সর্বে সর্বা মনে করছি। কেউ যদি দেখেন ফেলে তাতে যেন কিছু যায় আসে না। এমন  ভ্রান্ত ধারনায় আমরা বুধ হয়ে আছি।  মাঠে থাকা বর্তমান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হাসি খুশী মুখে ইয়ার্কীর ছলে আপনার আমার হাড়ির খবর নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের তথ্যের ভান্ডার এখন এতই সমৃদ্ধ যে- আমাদের মত ছাপোষা খেটে খাওয়া সাংবাদিকরা পর্যন্ত কে কোথায় কেন কি ভাবে, কোন উদ্দেশ্যে পা ফেলছি তার সবটুকুই রপ্ত করে রেখেছেন। এমনকি কোন পত্রিকায় কোন উদ্দেশ্যে প্রনোদিত খবর প্রকাশিত হলে তাও গোয়েন্দা অনুসন্ধানে বের করা হচ্ছে।  রাজনীতি, সরকারী দপ্তর থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম পর্যন্ত রয়েছেন গোয়েন্দা মনিটরিংয়ের মধ্যে। হয়তো এ কারনেই দখিনের জনপদে মাথাচড়া দিয়ে উঠতে পারেনি জঙ্গী সংগঠন গুলো। কারন দক্ষ ও মেধাবী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সর্তক দৃষ্টি থেকে কোন কিছুই এখন আর বাদ যায় না। তাদের নিজস্ব সোর্স সহ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ এতই নিবিঢ় যে কোন তথ্যই আর গোপন থাকছে না। গোয়েন্দা সংস্থা গুলো এখন খাটি মানুষদের নিয়ে ঢেলে সাজানো হয়েছে। বিএমপি কমিশনার এসএম রুহুল আমিন নিজেও একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক পদে বদলী হয়েছেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনুমেয় পুলিশ অফিসার হিসাবে সততা ও ন্যায় পরায়নতার বিবেচনায় তিনি মানুষ হিসাবে কেমন। ঠিক তেমনি বাছাই করা সৎ দক্ষ ও যোগ্য লোকদের নিয়ে এখন পরিচালিত হচ্ছে দেশের প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থার ইউনিট। হাজারো সমস্যার বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বটে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট নেতৃত্বের কারনেই দেশে এমন শক্তিশালী গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা সম্ভব হয়েছে। যে কারনে বার বার চেষ্টা করেও জঙ্গীরা মাথাচড়া দিতে পারেনি। অবশ্য এ জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও প্রশংসনীয় ভুমিকা রয়েছে। জঙ্গী দমন সহ অপরাধ দমনে গোয়েন্দা সংস্থার এমন ভুমিকাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। একই সাথে প্রত্যাশা করি সরকারের অপর গুরুত্বপূর্ন সংস্থা ও বিভাগ গুলোকে ঢেলে সাজানো হবে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>