আমাদের হিরনের শুরু থেকে শেষ

এপ্রিল ০৩ ২০১৭, ০৯:৪০

ইতিহাস কে কখনো বিকৃত করা যায় না । ইতিহাস বার বার পূনারা বৃত্তি ঘটে । কিছু মানুষ আছে যাদের মরে যাওয়ার পর আর কেউ মনে করতে চায় না,কিংবা চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে মনের আড়াল হয়ে যায়। আবার কিছু মানুষ আছে যাদের মরে গেলেও থেকে যায় অজস্র গুনাগ্রহীদের মনের গহিনে।মরে যাওয়ার পরে তার জিবদ্দশায় করে যাওয়া কাজগুলো স্থান করে নেয় মানুষের হৃদয় মাঝে। তেমনী একজন মানুষ শওকত হোসেন হিরণ । যাকে বলা হয় আধুনিক বরিশালের রূপকার

 
নগরের  রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা, স্থানে স্থানে সবুজ পার্ক নির্মান ও বৃক্ষরোপণ করাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ রাখেন তিনি। বরিশাল নগরের বেশিরভাগ উন্নয়নমূলক কর্মসূচী তাঁর সময়েই সম্পাদিত হয়। এছাড়া তিনি তাঁর এলাকায় বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা বজায় রেখেছিলেন।


জন্ম ও শিক্ষাঃ বরিশাল নগরীর আলেকান্দায় মামার বাড়িতে ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর শওকত হোসেন হিরণ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালীশুরি ইউনিয়নের আড়াইনাও গ্রাম। তাঁর পিতা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর আব্দুল হাসেম সরদার এবং মাতা গৃহিনী জয়নব বেগম। চার পুত্র ও ছয় কন্যার মধ্যে তিনি তৃতীয়। শৈশব থেকে শুরু করে তার সারাজীবন কেটেছে আলেকান্দায়।

তিনি বরিশাল নগরির নুরিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন। এরপর বি এম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং স্নাতক পাস করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বরিশাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করেন।

ব্যক্তি ও কর্মজীবনঃ হিরণের স্ত্রী বরিশাল-৫ আসনের সাংসদ জেবুন্নেছা আফরোজ । তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার মেয়ে রোশনী হোসেন তৃণার বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ছোট ছেলে সাজিদ হোসেন রাফসান ঢাকায় পড়াশুনা করছেন । তিনি বসবাস করতেন নগরীর রিফুজী কলোনী এলাকার ডেঙ্গু সরদার রোডের ওহাব বাড়ির ‘হিরন পয়েন্ট’ নামের বাসায়।


পেশায় তিনি ছিলেন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। এছাড়া তিনি সাউথ এ্যাপোলো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেড, বেলস লিমিটেড, বেলস ফার্মা ইউনানি প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যাভান্স অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান, এইচ পি এল ও এইচ পি এল শিপিং এবং সাউথ বেঙ্গল পরিবহনের সত্ত্বাধিকারী, সাউথ এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স প্রাইভেট লিমিটেড ও বেলভিউ মেডিক্যাল সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালকসহ অন্তত ১১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলো ।

রাজনৈতিক জীবনঃ
বরিশাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করার পরে তিনি যোগ দেন জাসদ ছাত্রলীগে। তারপর ১৯৭৯ সালে বিএনপির ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি যোগ দেন এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে বরিশাল সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।


এবং ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য পদের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঐবছর অপর একটি উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন হিরন।

১৯৯৬ সালে ঐকমত্যের সরকারের শরীক দল জাতীয় পার্টির মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। ফলে তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপি’র বরিশাল বিভাগের নেতৃত্বে আসেন।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর হাত ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের মাধ্যমে হিরণ যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সদর আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন তিনি এবং তা সক্রিয়ভাবে রাজপথে থেকে করেন। তাই যোগ্যতা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি তাঁকে মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মনোনীত করে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও শক্তিশালী নেতৃত্ব দিয়ে তিনি মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নকে নতুন করে সাজান। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন এবং মেয়র নির্বাচিত হন।

 
হিরণ তাঁর নিজের কার্যক্ষমতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে টানা ৩৫ বছর পর বরিশাল

নগর ভবনের নেতৃত্বে নিয়ে যান। ২০১৩ সালের ১৫ জুন বিসিসি’র নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের কাছে পরাজিত হন।

এরপর ২০১২ সালের সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বরিশাল সদর আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ।

কিছু ঘটনাঃনগরের যেখানেই চোখ যায়, হিরনের কাজের ছাপ। বর্তমানে বরিশাল নগরে সবুজ বৃক্ষও অর্ধেকের বেশি হিরনের লাগানো। স্বপ্ন ছিল সবুজের নগর তৈরির। রাস্তায় টিস্যু, থুতু ফেলতে নিষেধ করতেন হিরন। সবাইকে নিজের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদ দিতেন। সূর্য ওঠার আগে নগরের আবর্জনা সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। ৩০ ওয়ার্ডের বাড়ি বাড়ি থেকে বাঁশি বাজিয়ে ময়লা অপসারণের উদ্যোগও তাঁর। নগরে বালুর গাড়ি চলাচলে
নিষেধাজ্ঞা এবং রাত জেগে তার তদারক করেছেন হিরন। নগরের সড়ক প্রশস্তকরণ, আলোর নগরে পরিণত করা, ফুটপাত নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিনোদনকেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা— সর্বত্র অবদান ছিল হিরনের। তাই তো হিরন সবার কাছে এত প্রিয় হয়ে ওঠেন। ছয় বছর আগে যাঁরা বরিশালে এসেছেন, তাঁরা দেখেছেন, একটি দুর্গন্ধ জঞ্জালের নগর ছিল বরিশাল। সেই সব জঞ্জাল সরিয়ে বরিশাল নগরকে নান্দনিক সৌন্দর্য দিয়েছেন হিরন। দলমত-নির্বিশেষে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টিতে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তিনি।
২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলন উপলক্ষে নগরে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনাসহ দলের নেতা- কর্মীদের বিলবোর্ডে ছেয়ে যায়। দুই দিন পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরিশালে আসেন জনসভা করার জন্য। শওকত হোসেন হিরন ওই জনসভা সফল করার জন্য দলের সব বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলেন। সেই সব স্থানে মুহূর্তের মধ্যে খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাদের ছবি, বিলবোর্ড স্থান পায়। ওই জনসভা যাতে সফল হয়, সে জন্য আগের দিন বঙ্গবন্ধু উদ্যানে বিএনপির জনসভাস্থল পরিদর্শন করেন। বরিশালের ইতিহাসে কোনো ধরনের হামলা ও সহিংসতা ছাড়া বিএনপির ওই জনসভা সফল হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বরিশালে
ঘটে যাওয়া সন্ত্রাস, অন্য দলের নেতা- কর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের সব ঘটনা বন্ধ হয়ে যায় হিরন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর। পাশাপাশি অবস্থান করে আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দল রাজনীতি
করেছে। হামলা-মামলার ঘটনা এখন শূন্যে দাঁড়িয়েছে হিরনের কল্যাণে। বর্তমানে বরিশাল নগর শান্তির নগর হিসেবে পরিচিত। সন্ত্রাসের বরিশাল শান্তির বরিশালে রূপান্তর করেছেন হিরন।
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও হিরন ছিলেন নগরবাসীর প্রাণের মানুষ।


মৃত্যুঃ ২০১৪ সালের ২২ মার্চ, শনিবার রাত ১০টায় হিরণের বরিশাল ক্লাবের সামনে ব্রেন স্ট্রোক হয়। এর সাথে সাথেই তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং চেতনা হারিয়ে পড়েন। সাথে সাথেই তাঁকে শেরে বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নিয়ে যান। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই রোববার তাঁর মস্তিষ্কে ‘ডিকমপ্রেসিভ ক্রানেকটমি’ নামে একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপরে মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই অনুযায়ী সোমবার রাতে হিরণকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের গ্লেনঈগলস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মঙ্গলবার সকালে তার একটি অস্ত্রোপচার করা হয়।সেখানকার চিকিৎসকেরা হিরণের বাঁচার সব আশা ছেড়ে দেয় এবং বাংলাদেশে এনে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরবর্তী বৃহস্পতিবার রাতে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনরায় অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থায় রাখা হয়।


অবশেষে ৯ই এপ্রিল, ২০১৪; বুধবার সকাল সাতটায় তিনি পরলোকগমন করেন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে নেই । কিন্তু তার করা মহৎ কাজ গুলো আজ ও মানুষের মনে নাড়া দেয় । মাঝে মাঝে মানুষ কে বলতে শুনি “আজ যদি হিরন মিঁয়া বেঁচে থাকতো , তাহলে বরিশাল স্বপ্নের নগরী হয়ে যেতো”

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>