আমি মনে করি, আমি সফল-মেয়র কামাল

মে ৩০ ২০১৭, ১১:১২

বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিএনপি-সমর্থিত মেয়র আহসান হাবিব কামালকে আর সব মেয়রের মতো জেলে যেতে হয়নি। মামলার খড়্গও ছিল না। প্রায় চার বছর নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করে তিনি এখন মেয়াদের শেষ দিকে। কিন্তু নগরবাসী ও তাঁর দল বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, মেয়র হিসেবে চার বছরে কামাল ছিলেন নিষ্প্রভ। এই সময়ে তিনি দলেও গুরুত্ব হারিয়েছেন।

বরিশাল বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, ২০১৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর কামাল দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ওই সময় বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনেও জড়াননি তিনি। গত চার বছরে বিএনপির ছোট-বড় কোনো সভা-সমাবেশ বা সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল না।

দলের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে মেয়র কামাল ব্যস্ত ছিলেন সরকার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নগর ভবনে নিজের চেয়ার ধরে রাখতে। ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট রাখতে সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজ ভাগ-বাঁটোয়ারা করেন বলেও অভিযোগ আছে। কিন্তু নগর ভবনের সব পক্ষকে শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট রাখতে পারেননি। উপরন্তু নিজ দল তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে।

মেয়র কামাল  বলেন, ‘বিনা বাধায় চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি ঠিক, কিন্তু মানসিক ডিস্টার্বও আছে। তারা (ক্ষমতাসীনেরা) যখন যেটা বলে, সে অনুসারে কাজ করতে হয়।’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ক্ষমতাসীনদের মন রক্ষা করতে গিয়ে দলের কিছু ঘনিষ্ঠজন ছাড়া বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের তেমন কোনো সুবিধা দিতে পারেননি মেয়র। এতে মেয়রের সঙ্গে দলের দূরত্ব বেড়েছে। দলের বড় একটি অংশ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

যদিও মেয়র  কাছে দাবি করেন, যখন যে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে তার কাজ করে দিয়েছেন। তবে তিনি এ-ও বলেন, ‘বিএনপি এত বড় দল যে সবার চাহিদা মেটানো কারও পক্ষেই সম্ভব না।’

নগর বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, মেয়রের ওপর এত দিনকার ক্ষোভের একটি প্রকাশ ঘটে ৫ মে বরিশাল মহানগর বিএনপির তৃণমূল কর্মিসভায়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের উপস্থিতিতে ওই সভায় মেয়র কামাল অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে মিলনায়তনে একযোগে হইচই শুরু করেন নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে বক্তৃতা না করেই মেয়র বসে পড়েন। মেয়রের উপস্থিতিতেই বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, কামাল বিএনপির সমর্থনে মেয়র হয়েছেন। মেয়র হওয়ার পর তিনি নেতা-কর্মীদের ভুলে গেছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে টিকে আছেন। তিনি আর বিএনপির নন, আওয়ামী লীগের মেয়র।

এই অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়র কামাল  বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতাটা কী? মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আমার কাজ হলো জনগণকে পানি দেওয়া, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা, সেবা দেওয়া। এটাই আমি করছি। এর বাইরে তো আমি অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত নই।’

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে যৌথ বাহিনীর অভিযানে হেফাজতে ইসলামকে বিতাড়িত করার এক মাস পর দেশের চার সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়। সবগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা জেতেন। বরিশালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তখনকার মেয়র শওকত হোসেনকে (হিরণ) হারিয়ে জয়ী হন কামাল।

গত তিন দিন বরিশাল বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের

দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেয়র হওয়ার আগ পর্যন্ত দলে আহসান হাবিবের যে অবস্থান ছিল, এখন আর তা নেই। নির্বাচনের আগে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। একই সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। গত বছর দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর কোনো পর্যায়ের কমিটিতে কামালের নাম নেই।

বরিশাল জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চান  বলেন, ‘আহসান হাবিব কামাল ব্যক্তি পরিচয়ে মেয়র হননি। এর পেছনে দলের সমর্থন ছিল। তাই দলের প্রতি তাঁর দায় আছে পাশে থাকার। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে তাঁকে তো কেউ দলীয় কর্মকাণ্ডে দেখেনি।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একমাত্র বরিশাল ছাড়া বিএনপি-সমর্থিত অন্য সিটি মেয়রদের জেলে যেতে হয়েছে। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয়নি, এটি ছিল বরিশাল সিটি করপোরেশনের ইতিবাচক দিক। কিন্তু গত চার বছরে তিনি কতটা নাগরিক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন, তার মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগে মেয়র ২১ দফা ইশতেহার দিয়েছিলেন। এখন প্রতিশ্রুতির কতটা পূরণ করতে পেরেছেন, সেই প্রশ্ন আসছে।

বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুস  বলেন, নাগরিক প্রত্যাশা অনুযায়ী করপোরেশন চলছে না। মেয়র কামাল নাগরিকের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন।

মেয়রের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট বিএনপির নেতা এবায়দুল হক চান  বলেন, ‘আমি ওনার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম। কী আর বলব, আমার বাড়ির (শহরের আমানতগঞ্জ) রাস্তাটিও চার বছরে হয়নি। ময়লা-নর্দমা, মশা-মাছি, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যা-এসব তো আছেই।’

শহরের বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, জলাবদ্ধতা ও নালা অব্যবস্থাপনা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা। নগরীর অধিকাংশ ওয়ার্ডে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। বর্ধিত অঞ্চলের পানির সমস্যা প্রকট। অনেক ওয়ার্ডে পানির লাইন স্থাপন করা হয়নি। তার ওপর এই গরমের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বরিশালের সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সাবেক মেয়র হিরণ বরিশাল নগরীর পরিবর্তনে তাঁর স্বপ্ন ও পরিকল্পনার ছাপ রেখে গেছেন। প্রত্যাশা ছিল বর্তমান মেয়র এর ধারাবাহিকতা রাখবেন। কিন্তু নগরে যে পরিবর্তনগুলো অর্জিত হয়েছিল, সেটা সংরক্ষিত হয়নি। নতুন কোনো সংযোজনও দেখছি না।’

সম্প্রতি বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত কর্মবিরতি ও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট পর্যন্ত গড়িয়েছে। জানা গেছে, ১ হাজার জনবলের জায়গায় বর্তমানে ২ হাজার ২৩১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন সিটি করপোরেশনে। কিন্তু তাঁদের বেতনের সংকুলান নেই। তবে মেয়র বলেছেন, এই সমস্যার সমাধানে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না চাপের কারণে। বাড়তি জনবলের খোরাক চালাতে হলে নগরবাসীর ওপর ট্যাক্স বাড়াতে হবে।

নিজ দল বিএনপি ও নগর ভবন-দুটিতেই নিষ্প্রভ বা গুরুত্ব হারানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র কামাল  বলেন, ‘আমাকে নিষ্প্রভই থাকতে হবে। হইচই না করে নীরবে-নিভৃতে কাজ করতে হবে। আমি মনে করি, আমি সফল।’

তবে বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার মতে, ‘তিনি (কামাল) এক অর্থে না ঘরকা, না ঘাটকা। তিনি রাজনীতি বিসর্জন দিয়ে মেয়রের চেয়ার রক্ষা করতে চেয়েছেন। কিন্তু কোনো কূলই রক্ষা করতে পারেননি।’

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>