আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামছে বরিশাল নগরীর পানির স্তর!

এককালে ‘প্রাচের ভেনিস’ খ্যাত খাল-পুকুরের নগরী বরিশাল-এ পানির স্তর ক্রমশ আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। একদিকে লবনাক্ততা, অপরদিকে স্তর নিচে নেমে যাওয়া এ নগরীর সুপেয় পানির প্রাপ্যতা সহ সুস্থ্য নগরিক জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেও এ নগরীর বেশীরভাগ এলাকা সহ রাস্তাঘাট পানিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। অচলবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে নগর জীবনে। একদিকে আরসিসি ড্রেন ভূ-উপরিস্থিত পানি ভূ-গর্ভে যেত বাধা দিচ্ছে, অপরদিকে ওই সব ড্রেন ময়লা, আবর্জনা ও পলি জমে ভড়াট হবার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীকে সয়লাব করে দিচ্ছে।
পানি ইতোমধ্যেই বরিশালের নগর জীবনকে চরম সঙ্কটে ফেলতে যাচ্ছে। পাঁচ লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ নগরীতে চাহিদার অর্ধেক বিশুদ্ধ পানিও সরবারহ করতে পারেছে না সিটি করপোরেশন। সরবারহ বৃদ্ধির লক্ষে সরকারি তহবিলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফ্তর প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে পানি সরবারহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও সিটি করপোরেশন এখনো তা বুঝে নেয়নি। প্রকল্পের আওতায় দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণ করা হলেও চালু হবার আগেই তার একটি ইতোমধ্যে কির্তনখোলা নদী ভাঙনের মুখে। নদী ভাঙন থেকে প্লান্টটিকে রক্ষায় আরো বহুকোটি টাকা প্রয়োজন। অপরদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের কাছে বকেয়া প্রায় ২৭কোটি টাকা পরিশোধ না করায় বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সহ নতুন স্থাপিত পাম্প হউজগুলোকে কোন সংযোগ প্রদান করছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে সরকারী বিপুল অর্থ ব্যায়ে বরিশাল মহানগরীতে পনি সরবারহ উন্নয়নে নির্মিত অবকাঠামোগুলো চালুর ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপে খুব শিঘ্রই বিদ্যুৎ সংওযোগ নিয়ে এসব ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এতেও পানি সংকটের কতটা সুরাহা হবে তা বলতে পারছেন না কেউ। ঠিক এরই মধ্যে এবারের শুষ্ক মওসুমে শুরূ হওয়া পানির হাহাকার সদ্য শুরূ হওয়া বর্ষা মওসুমেও অব্যাহত রয়েছে এ নগরীতে। নগরীর প্রায় ৪২ হাজার হোল্ডিং-এ বৈধ পানির সংযোগ রয়েছে ১৭ হাজারের মত। কিন্তু এসব বৈধ গ্রাহকের মত অবৈধ গ্রাহকগণও চাহিদা মাফিক নিয়মিত পানি সরবারহ না পাওয়ায় গত দুই দশকে গোটা নগরীতে হাজার-হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন নগরবাসী। সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত এসব নলকূপ নগরীর মাটির তলার পানি প্রতিনিয়ত শুষে নেয়ায় এখন ভয়াবহ সঙ্কটে এনগরীর সুস্থ্য সমাজ ব্যবস্থা। ফলে নগরীর পানির স্তর নামতে নামতে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে মধ্যরাতের আগে প্রায় হাজার ফুট গভীরে থাকা নলকূপে কোন পানি উঠছে না। তবে এরই মধ্যে সাবমার্সিবল পাম্প সহ শক্তিশালী মোটর লাগিয়ে ভ‚গর্ভের পানি শুষে নেয়ার তৎপড়তা চলছে নগরী জুড়ে। ফলে মধ্যরাতের আগে নগরীর বেশীরভাগ গভীর নলকূপেও কোন পানি উঠছে না। গত তিন বছরে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে ।
এসব অবৈধ নলকূপগুলোকে বৈধতা দিতে বরিশাল সিটি করপোরেশন আবার নীতিমালাও তৈরী করেছে। নলকূপের পাইপের ব্যাসার্ধের প্রকার ভেদে ২৫হাজার টাকা থেকে লক্ষাধীক
টাকা জামানত দিলে যেকোন হোল্ডিং মালিক তার বাড়ীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের অনুমোদন পাচ্ছেন। ফলে ইতোমধ্যে দেড় ইঞ্চি ব্যাসার্ধের প্রায় ২হাজার গভীর নলকুপ স্থাপনকে বৈধতা দিয়েছে নগর ভবন। তবে নগর ভবনের এ নীতিমালা প্রয়নের আগে, এমনকি এখনো অবৈধভাবে প্রতিনিয়ত বিপুল সংখ্যক গভীর নলকূপ স্থাপন অব্যাহত রয়েছে নগরী যুড়ে। অবৈধ নলক‚পের সঠিক কোন পরিসংখ্যন নগর ভবনের কাছে না থাকলেও ন্যুনতম ৫ হাজার ফুট গভীর নলকূপ এ নগরীতে অবৈধভাবে খননের পরে এখন তা দিয়ে পানি তুলে আনা হচ্ছে। ফলে নগরীর  মাটির তলার পানি ক্রমশ শুষে নেয়ায় এক অবধারিত সংকটে এককালের প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল মহানগরী।
অথচ নিকট অতীতেও বরিশাল মহানগরী যুড়ে বেশ কিছু খালে জোয়ার-ভাটা আসা যাওয়া করত। সেখানে নৌকাও চলত। যার বেশীরভাগ খালই বুজিয়ে পাকা ড্রেন সহ রাস্তাও নির্মাণ করা হয়েছে। গত দুই দশকে এ নগরীর বেশীরভাগ  খাল ও ড্রেনগুলোকে অরসিসি ঢালাই করে আটকে দেয়া হয়েছে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে। এসব ড্রেনের তলদেশ আরসিসি ঢালাই করে আটকে দেয়ায় ভূ-উপরিস্থিত কোন পানি ভূ-তলে প্রবেশ করছে না। অথচ ভূতলের পানি নলকূপ দিয়ে এতদিন শুধু ওপরেই তুলে আনা হয়েছে। তলায় আর কোন পানি ফেরত যাচ্ছে না।
কিন্তু এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের নকশায় প্রতি ১৫-৩০ ফুট অন্তর একটি করে হোল রাখার কথা। যার মুখ ব্যাটস দিয়ে ভড়াট করে রাখলে আরসিসি ঢালাই অটুট থাকার পাশাপাশি ওই হোল দিয়ে ওপরের পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করত। ফলে ভূগর্ভে পানির স্তর কিছুটা হলেও স্থতিশীল অবস্থায় থাকার কথা। নগরীর নবগ্রাম রোডের চৌমহনী থেকে বটতলা এবং বগুড়া রোডের ধারের কাঁচা ড্রেন সহ সদর রোডের একসময়ের কাঁচা ড্রেনগুলো গত দুই দশকে আরসিসি ঢালাই ড্রেন নির্মানকালে ভূ-উপরিস্থিত পানি ভূগর্ভে প্রবেসের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি নগর ভবনের প্রকৌশলীগন। পাশাপাশি গত দুই দশকে এ নগরীর তিন-চতুর্থাংশ পুকুর ও ডোবা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কথিত উন্নয়ন সহ জনসংখ্যার চাপে বরিশাল মহানগরীর পানির সঙ্কট ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধীক পরিবেশবীদগন। এসংকট থেকে উত্তরনেরও কোন মাথাব্যাথা নেই নগর ভবন কতৃপক্ষের।
এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পানি সরবারহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, ড্রেন ও খালগুলোকে আরসিসি ড্রেনে রূপান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের আরো ভাবা উচিত ছিল। তিনি এব্যপারে একটি বিদেশী প্রশিক্ষনের কথা স্মরণ করে বলেন, বিশ্বের বহু দেশেই আরসিসি ড্রেনের তলায় নির্দিষ্ট এলাকা পর পর বড় মাপের হোল রেখে তা ব্যাটস দিয়ে ভড়াট করে দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এত করে ভূ উপরিস্থিত পানি ভূগর্ভে প্রবেসের সুযোগ থাকে। ফলে ভূগর্ভে পানির স্তরে একটি সমতা থাকে বলেও জানান তিনি। ওই বিদেশী প্রশিক্ষণের আলোকে বরিশাল মহানগরীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রয়োগ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>