আসামের পানি আসছে, ১২ জেলায় বন্যা অবনতির শঙ্কা

জুলাই ১১ ২০১৭, ০৯:৫৫

ডেস্ক রিপোর্টঃ দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়তে পারে সিলেট, মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার। ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় রবিবার রাত থেকে তিস্তায় পানি বাড়ছে। দেশে দীর্ঘস্থায়ী বড় বন্যার আশঙ্কায় সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১২ জেলাকে বন্যাপ্রবণ চিহ্নিত করে ওই সব জেলায় ত্রাণ মজুদের কাজও শুরু হয়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার বিভিন্ন স্থান অতিবর্ষণ ও ঢলের কারণে তলিয়ে গেছে। সেখানকার মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। উজানে ভারতের আসাম ও অন্যান্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে প্রবল বন্যা শুরু হয়েছে। ভাটির দেশ হিসাবে এই বন্যার পানি বাংলাদেশের উপর দিয়েই সাগরে নামবে। ইতিমধ্যে এই পানি নামতে শুরু করায় উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে তিস্তা ব্যারেজের গেটও খুলে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর গতকাল সোমবার থেকে আবারও সুরমা-কুশিয়ারার পানি বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতির পাশাপাশি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। সব মিলিয়ে বড় বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার দেশের ভাটিতে অবস্থিত নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যার পানি নিস্কাশনও বিলম্বিত হতে পারে। তাই সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গত রবিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বন্যার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল এতে সভাপতিত্ব করেন। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এবার ভারী বন্যার আশংকার কথা উল্লেখ করে আগাম প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, যে ১২ জেলা এবার দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়তে পারে      সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলাগুলো হচ্ছে – সিলেট, মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবন্ধা। এ ছাড়াও বগুড়া, লালমনিরহাট, খাগড়াছড়ি জেলাতেও বন্যা দেখা দিতে পারে বলে ওই সভায় অভিমত দেয়া হয়।

সচিব মো. শাহ কামাল বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে মানুষের যাতে খাদ্যাভাব দেখা না দেয় বা সঞ্চলান ব্যবস্থায় বাধা তৈরি না হয় সে জন্য আগে ভাগে ওইসব জেলায় খাদ্যশষ্য মজুদ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকালই আলোচ্য জেলাগুলোতে ৩০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫১ লাখ টাকা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এসব ত্রাণ সহায়তা জেলা প্রশাসকের তহবিলে জমা করা হচ্ছে। যাতে তাত্ক্ষণিক চাহিদা মিটানো যায়।

সূত্র জানায়, বন্যা প্রবণ জেলাগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও কমঝূঁকিপূর্ণ। সার্বক্ষণিকভাবে আবহাওয়া অফিস, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে মন্ত্রণালয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। ওই বরাদ্দের বাইরেও এখনো প্রতিটি বন্যা প্রবণ জেলায় ৫০ টন চাল ও ৫ লাখ করে টাকা দেয়া হবে। জেলা প্রশাসনকে স্থানীয় জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে – যাতে তারা উদ্যোগ নিয়ে শুকনো খাবার, আলু, পিয়াজ, মোমবাতি, দেয়াশলাই, কেরোসিন ইত্যাদি আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি নিয়ে প্রস্তুত থাকেন। জেলা প্রশা্সনকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উদ্ধার- ত্রাণবাহী নৌযান, যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামীদি প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। সকল ও সম্ভাব্য আশ্রয়কেন্দ্র বসবাসের উপযোগী করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে মেডিক্যাল টিম গঠন, পানি বিশুদ্ধ রাখার ব্যবস্থাসহ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কাজকর্ম নির্ধারণ করে আগেই প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। মত্স্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়কে পশু প্রাণিকুল মাছ রক্ষার আগাম ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে

খাদ্য মজুদ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেবা ও সুরক্ষা বিভাগ, কৃষি, শিক্ষা, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বন্যার সময়ে তাদের মন্ত্রণালয়ের করণীয় নির্ধারণ করে আগাম ব্যবস্থা রাখতেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের নেতৃত্বে একাধিক তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেখানেই ত্রাণ দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে সেখানে এসব টিম কাজ শুরু করবে।

আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি একদিন স্থিতিশীল থাকার পর আবারও বাড়তে শুরু করায় কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সোমবার ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এতে উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, নাগেশ্বরী ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চরাঞ্চলের ২৫টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বন্যা দুর্গতরা যাতে চিকিত্সার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে ৮টি স্কুলে বিকল্প উপায়ে পাঠদান অব্যাহত থাকলেও বাকীগুলোতে বন্ধ হয়ে গেছে পাঠদান। ভাঙনের মুখে পড়েছে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি সোমবার আরো অবনতি হওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি।

কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান. ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৩২ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমবার (১০ জুলাই) দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটার। যা স্বাভাবিকের (৫২.৪০ সে.মি.) চেয়ে ৩২ সে.মি. উপরে।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারতের গজল ডোবা ব্যারেজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় রবিবার রাতে তিস্তা পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সোমবার (১০ জুলাই) সকাল ৬টায় বিপদ সীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপরে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়। পরবর্তি ৩ ঘন্টা পর সকাল ৯টায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটার। যা বিপদ সীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপরে। প্রচন্ড গতিতে পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। আরও কি পরিমাণ পানি আসবে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের অধিকাংশ গেটই খুলে দেয়া হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৭ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সোমবার জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

সিলেট অফিস জানায়, রবিবার থেকে আবারো অবনতি হচ্ছে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির। আগের তিন দিন নদনদীর পানি কমলেও রবিবার থেকে আবারো সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সোমবার সন্ধা ৬টায় কানইঘাটে সুরমার পানি বিপদসীমার ১ দশমিক ৪৯ সে.মি. , অমলসীদে কুশিয়ারা ৭৫ সে.মি. ও শেওলায় ৬৮ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল দিনভর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে পানি আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এছাড়া ডিমলা (নীলফামারী), ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম), উলিপুর (কুড়িগ্রাম), গঙ্গাচড়া (রংপুর), কাউনিয়া (রংপুর), আদিতমারী (লালমনিরহাট), কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতারা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ও মানুষের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>