ইমো বোঝে ইমোশন বোঝে না!

ফেব্রুয়ারি ২৪ ২০১৭, ০৫:৪৪

‘কোলনের পর প্রথম বন্ধনী দিলে আগে হাসিমুখের অভিব্যক্তি বোঝা যেত। মানে সে খুশি। এখনকার তরুণদের কাছে শুধু 🙂 এই চিহ্নের অর্থ মন খারাপ!’
—তাহলে খুশি বোঝানোর চিহ্নটা কী?
‘কোলনের পর D দিয়ে দেয়। এতে দাঁত বের করে হাসার একটা অভিব্যক্তি চলে আসে। মানে সে সত্যি খুশি।’
কথোপকথনটা হচ্ছিল তিরিশের কম বয়সী এক তরুণের সঙ্গে। এ ধরনের লিখিত বা প্রতীকী অভিব্যক্তির চালাচালি চলে ইন্টারনেটে বা মুঠোফোনে বার্তা বিনিময়ের সময়। চ্যাট বা চ্যাটিং নামেই পরিচিত এটা। অভিধান খুললে দেখা যায়, চ্যাট শব্দের অর্থ কথোপকথন, খোশগল্প করা কিংবা আড্ডা দেওয়া। ইন্টারেনেটের যুগে এসে চ্যাট হয়ে গেছে লিখে লিখে যোগাযোগের সমার্থক। আর যে চিহ্নের কথা বললাম, সেগুলো ইমো। একই প্রতীকের অর্থও আবার সময়ের সঙ্গে বদলে যায়।
চ্যাটিংয়ে ইমোর ব্যবহার ব্যাপক। কেন? অনূর্ধ্ব তিরিশের ওই তরুণ বললেন, ‘সামনাসামনি কথা বলার সময় তো চেহারায় অভিব্যক্তি বোঝা যায়। এমনকি ফোনে কথা বলার সময়ও গলার স্বরে ওপাশের আবেগটা টের পাওয়া যায়। চ্যাট করার সময় অনেক কিছুই অক্ষরে লিখে লিখে শব্দ বা বাক্য বানিয়ে বোঝানো যায় না, যে কাজটা সহজেই করা যায় ইমো দিয়ে।’
ইমোর পুরো নাম ইমোটিকন। দিন যত গড়িয়েছে, এর নামও বদলে গেছে। ইমো, ইমোজি, স্মাইলি—এসব নামে পরিচিত এই চিহ্নগুলো। প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, ইমোর রূপেও এসেছে পরিবর্তন। শুধু কি-বোর্ডের হরফ দিয়ে তৈরি প্রতীক নয়, দ্বিমাত্রিক-ত্রিমাত্রিক, কখনো অ্যানিমেটেড হচ্ছে ইমোগুলো। হলুদ রঙা ইমোগুলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আবার ভালোবাসার সেই চিরায়ত হৃদয় প্রতীকে লালের জয়জয়কার। ইমো, ইমোজির পরে আছে স্টিকার। নানা অভিব্যক্তি, আবেগ কিংবা বিষয়ের ওপর তৈরি স্টিকারও অনলাইনে তুমুল জনপ্রিয়। কত রকমের ইমো আছে তা গোনা মনে হয় সম্ভব নয়। তবে ইমোর ভান্ডার দেখতে যেতে পারেন ইমোজিপিডিয়া ওয়েবসাইটে (www.emojipedia.org)। চাপা হাসি, মাপা হাসি, মুচকি হাসি, অট্টহাসি, উপহাসের হাসি—যত প্রকার হাসি আছে, তার চেয়েও বোধ করি হাসি প্রকাশে ইমোর সংখ্যা বেশি। কান্না–বেদনার ইমোও কম নেই।
বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? এককালে স্কুলপড়ুয়াদের বিতর্ক প্রতিযোগিতার জনপ্রিয় এই বিষয়টা এলেই বিপক্ষ দলের বক্তা গড় গড় করে বলতেন, ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।’ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে আজ প্রশ্ন উঠতেই পারে, ইমোতে কি সত্যিই ইমোশন আছে? যাকে ইমো পাঠাচ্ছি সে ইমো তো বোঝে—ইমোশন কি বোঝে? শুনুন দীপ্তর কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি। ‘ধরুন হৃদয়াকৃতির একটা ইমো দিল একজন আরেকজনকে। এর মানে তো ভালোবাসা। এর সঙ্গে যদি একটা 😛 জুড়ে দেয়, তবে সেটা হয়ে যাবে ফান।’ 😛

জুড়ে দেওয়া মানে হলো ওই ইমোর পাশে জিব বের করে ভেংচি কাটার প্রতীক। এর অর্থ, বিষয়টা মজা করার জন্যই। সত্যিকারের আবেগ এখানে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সুইফট মিডিয়ার এক জরিপে বলা হয়েছে, মার্কিন নাগরিকদের ৭৪ শতাংশ অনলাইন যোগাযোগে ইমো বা স্টিকার ব্যবহার করে। এদের প্রত্যেকে দিনে গড়ে ৯৬টা ইমো চালাচালি করে। বাংলাদেশেও ইমোর ব্যবহার এখন যথেষ্টই তরুণদের হাত ধরে। বেশি বয়সী যাঁরা অনলাইন যোগাযোগে অভ্যস্ত, তাঁরাও কম যান না। ‘গুড মর্নিং’ থেকে ‘বোরিং’—সবকিছুর ইমো, স্টিকারই আছে ফেসবুক, ভাইবার কিংবা স্মার্টফোনের কি-বোর্ডে। ফেসবুক তো লাইক বোতামে রাগ, ভালোবাসা, দুঃখ জানাতে কয়েকটা ইমো যোগ করে দিয়েছে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে। এসবের ব্যবহার নিত্যকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার পরও ইমো দিয়ে প্রকৃত আবেগ কতটা বোঝানো যায় কিংবা বোঝা যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্রী তামান্না রহমান যেমন এটাকে অনুভূতি প্রকাশের শুধুই একটা মাধ্যম হিসেবে মনে করেন। কিন্তু ইমো সব সময় বাস্তব অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। তিনি বললেন, ‘সরাসরি বলেও তো আবেগ অনেক সময় ঠিকমতো বোঝানো যায় না। সেখানে ইমোজি দিয়ে আর কী হবে?’ তবে তরুণেরা কেন এত ইমো ব্যবহার করেন? ‘কারণ তাঁরা এখন সরাসরি যোগাযোগের চেয়ে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ বেশি করে। ডিজিটাল যুগ আমাদের যান্ত্রিক করে তুলছে। তাই হয়তো সরাসরি না বলে ভার্চ্যুয়াল জগতে আবেগ প্রকাশ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি।’
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, যখন আমরা অনলাইনে হাস্যোজ্জ্বল ইমো (স্মাইলি) দেখি, তখন মস্তিষ্কের সেই অংশটা সক্রিয় হয়, যেটা উজ্জীবিত হয় সামনাসামনি কারও হাসিমুখ দেখলে। এমনকি ইমোর মতো করে ভাবের পরিবর্তন বা চেহারায় অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও করেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামের নিজস্ব এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইমো আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের প্রায় সর্বজনীন একটা পদ্ধতি হয়ে উঠেছে। ইনস্টাগ্রামে ব্যবহারকারীদের দেওয়া সব ছবি ও মন্তব্যের প্রায় ৫০ শতাংশেই কমপক্ষে একটি বা দুটি ইমো থাকে। ইনস্টাগ্রামের গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি যে ইমো ব্যবহৃত হয়, সেটা লাল রঙের হৃদয়। ভালোবাসার প্রকাশ। এর পরেই আছে হৃদয়াকৃতির চোখসহ হাসিমুখ, চোখে-মুখে হাসি—ইত্যাদি ইমো।
এ কথা ঠিক, অনলাইন যোগাযোগে ইমো বেশ কার্যকর আর সহজ এক পদ্ধতি। ইমোর পেছনে থাকা মানুষের মনে সত্যিই সেই আবেগটা তখন কাজ করছে কি না, এটাই হচ্ছে আসল কথা। তবেই হয়তো ইমোর যুগে ইমোশনটা খুঁজে পাওয়া যাবে। না হলে যান্ত্রিক যুগের মাপা হাসি, মাপা কথার মতো ইমোগুলো নিছকই প্রতীক হয়ে থাকবে। শব্দ বানাতে বা বাক্য সাজানোর জন্য টাইপ করার সময়টাই শুধু বাঁচাবে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>