এক প্রতিবাদী সাংবাদিকের মহা প্রয়ান

ফেব্রুয়ারি ২৫ ২০১৭, ০৭:৩০

লিটন বাশারঃমায়াবী পৃথিবী থেকে যখন সূর্য্য বিদায় নেওয়ার জন্য একে বারে হেলে পড়েছে ঠিক তখনই একের পর এক অব্যাহত রিং টোন সেল ফোনে বেজেই চলছে। প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, জিয়া শাহীন, শাহীন সুমন, এম মোফাজ্জল, আসাদুজ্জামান, তন্ময় তপু সহ অনেক সহকর্মী সাংবাদিকরা অব্যাহত ফোন করেই চলছেন। তাদের কারো ফোন তোলার আগেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক প্রয়াত মাইনুল হাসান আমাদের প্রিয় মাইনুল ভাইর বড় বোন শ্রিপা দিদি বাসায় হাজির হয়ে জানালেন- ‘সাংবাদিক মীর মনির ভাই আর বেচে নেই’। আমার প্রিয়তমা স্ত্রী তখনই ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন এ কারনেই হয়তো সব সাংবাদিকরা তোমারে অব্যাহত ফোন করে যাচ্ছে! কয়েক জনকে কল ব্যাক করে স্ত্রীর কথাই ঠিক বুঝতে পারলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম না হঠাৎ করে মীর মনির ভাইয়ের মত একজন সুস্থ্য সবল মানুষ কেন আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন।
মীর মনির ভাইকে নিয়ে লেখার মত অনেক কিছুই রয়েছে। কিন্ত তার সাথে শেষ দেখার আবেগঘন স্মৃতিটা নিজের ফেসবুকের এ্যালবামে আজো বন্দী হয়ে আছে। অথচ মানুষটা নেই। কে জানতে সেদিন মীর মনির ভাইর সাথে এটাই হবে আমাদের শেষ ছবি তোলা, শেষ কথা, শেষ দৃশ্য! দিনটি সম্ভবত ১৮ ডিসেম্বর ছিল। প্রেসক্লাব নির্বাচনের জন্য ভোটারদের দ্বারে দ্বারে দলবেধে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। উৎসুকদের মধ্যে কেউ কেউ আমার একমাত্র শিশু পুত্র শ্রেষ্টকে মটোর সাইকেলের বহরে তুলে নিয়েছে। মীর মনির ভাইর নতুন বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্টানে হাজির হতেই তিনি আমার ছেলেকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিলেন। আগে পরে যখনই তার কাছে ভোট চাইতে গিয়েছি তিনি দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন ‘ আমার কাছে সময় নষ্ট করার দরকার নেই, অন্যদের কাছে যাও’। কখনো কখনো কয়েকজন সিনিয়র মেম্বরদের কাছে বেশী যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্ত ঐ দিন আমার ছেলেকে পেয়ে মীর মনির ভাই আর ছাড়লেন না, ছেলের হাতে কিছু একটা খাবার কিনে দিতেই তিনি মরিয়া হয়ে উঠলেন। আমরা রসিকতায় মেতে উঠে মীর মনির ভাইর কোলে আমার ছেলে সহ সেলফী তুলতে ব্যাস্ত হয়ে উঠলাম। ফটো সাংবাদিকরা কেউ কেউ ক্যামেরার বাটন টিপতে ভুল করলেন না। নির্বাচনের পূর্বে বির্তক এড়াতে এ ধরনের ছবি আমরা সংবাদপত্রের পাতায় স্থান দেইনি। তাই ছবি স্থান করে নিলো ফেসবুকের এ্যালবামে। মীর মনির ভাই সেই ছবিতে লাইক চিহৃ রেখে দিয়েছেন যা অবিনশ্বর হয়ে রইলো। অথচ তিনি নিজে থাকলেন না এই নশ্বর ধরাধামে।
২৫ ডিসেম্বর প্রেসক্লাব নির্বাচনের দিনও মীর মনির ভাইর সাথে স্বল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছে। তার ভোট দিতে আসতে বিলম্বের কারনে ফোন করলাম। সেল ফোনটাও বন্ধ পেয়ে আমি আর এসএম জাকির মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটে গেলাম তাকে নিয়ে আসার জন্য। ব্যবসা প্রতিষ্টানের সামনে যেতেই তার ছোট ভাই আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন ‘ গেছে – গেছে, চলে গেছে’। আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই যেমন তিনি বুঝে ছিলেন তেমনি তার কথারও অর্থ বুঝতে আমাদের কষ্ট হয়নি। তাই তো মনির ভাই যেখানে গেছেন সেই খানে সেই প্রেসক্লাবের উদ্দেশ্যে আমরা ফিরে এলাম। এসে মনির ভাইকে ক্লাবের নীচতলায় পেলাম। ততক্ষনে আমাদের দৌড়ঝাপের খবর হয়তো তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন। তাইতো স্বভাব

সুলভ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা ‘ আমারে আবার খোজতে যাওয়া লাগে!’ রসিকতার সুরে বললাম কয়েক জন বিশেষ ভোটার আজ বরিশালেই নেই। তাদের সেল ফোন বন্ধ। তাইতো আপনার ফোন বন্ধ পেয়ে মনের মাঝে অজানা শংকা জেগেছিল! ভাবলাম নিখোজের তালিকায় বুঝি যুক্ত হয়েছেন!’ মীর মনির ভাইর চেহারাটা দেখলাম সেই ১৫ বছর পূর্বের মত তেজ দিপ্ত অগ্নি মূর্তি রূপ ধারন করেছেন। মুখে কিছু বললেন শুধু বললেন ‘ বাদ দে’। আমিও বাদ দিয়েই নির্বাক হয়ে রইলাম। গতকাল তার আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে কিং কর্তব্য বিমূঢ় হয়ে রইলাম।
সন্ধ্যার পর অন্ধকার যখন সবকিছু গ্রাস করতে শুরু করলো তখন মীর মনির ভাইর বাসার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। দেখলাম প্রতীক্ষারত সহকর্মী সাংবাদিকদের সাথে এলাকার শত শত মানুষ প্রতীক্ষারত। কখন আসবেন তিনি! কতক্ষন লাগবে সময় আর? এ নিয়েই সকলের মাঝে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। অত;পর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে তিনি এলেন এ্যাম্বুলেন্সে করে। কিন্ত কারো সাথেই কোন কথা বললেন না। এ্যাম্বুলেন্স মানুষের ভির ভাঙ্গতে ভ্যেপু বাজিয়ে আওয়াজ দিলো কিন্ত মীর মনির ভাই যেন অভিমানে চিরতরে নিথর হয়ে শুয়ে রইলেন এ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে। শোর্কাত পরিবারের স্বজনদের গগণ বিদারী কান্নার আওয়াজ মনির ভাইর ঘুম ভাঙ্গাতে পারলো না। অথচ এই প্রতিবাদী মনির ভাই সহকর্মীদের কান্নার আওয়াজ পেলে নিজেই আপন গতিতে ঝলসে উঠতেন। আজো মনে আছে ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর প্রেসক্লাব সদস্যদের উপর বর্বর হামলার খবর পেয়ে মীর মনির ভাই একাকী ছুটে এসেছিলেন। সেদিন আমাদের পাশে দাড়িয়ে দীপ্ত কন্ঠে প্রতিবাদী সাহসী বক্তৃতা দিয়ে সকলকে প্রেরনা জুগিয়েছেন। যদিও তখন মীর মনির ভাই প্রেসক্লাবের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তিনি এসেছিলেন তার বিবেকের দায় বোধ থেকে। অথচ প্রেসক্লাবের অনেক সদস্য সেইদিন পাশে দাড়িয়ে সাংবাদিক পিটানোর দৃশ্য উপভোগ করেছেন। সহকর্মীকে রক্ষায় তাদের এক পা আগাতেও দেখা যায়নি। মীর মনির ভাই সেদিন বক্তৃতা দিয়ে খান্ত হননি। বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দৈনিক আজকের কাগজ যখন দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা তুঙ্গে তখন মীর মনির ভাই একদিকে খবরের পিছনে দৌড়ঝাপ আরেক দিকে সাংবাদিকদের সু-রক্ষায় সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। তার প্রতিবাদী কণ্ঠ ও সাহসী পদক্ষেপ দেখেই হয়তো সহযোদ্ধা সহকর্মীরা তাকে একাধিক বার বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত করেছিলেন। আবার সহকর্মীর উপর হামলার প্রতিবাদ জানাতেই তিনি প্রেসক্লাব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অভিমানী মানুষটিকে প্রেসক্লাবে ফিরিয়ে আনতে সময় লেগেছে দেড় যুগ। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তার মত সিনিয়র ৫ জন সাংবাদিককে প্রেসক্লাবে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি তখন সাধারন সম্পাদক হিসাবে নূন্যতম ভূমিকা রাখতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কিন্ত আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দু:খ প্রকাশ করছি। কারন মীর মনির ভাই প্রেসক্লাব, তার প্রিয় প্রতিষ্টান, সহকর্মী আর আদরের স্ত্রী সন্তানদের রেখে এতটা দূরে চলে গেলেন যেখান থেকে তাকে আর ফিরিয়ে আনার শক্তি ইহ জগতে আর কারো নাই। পরপারে ভাল থাকুন মনির ভাই। মহান রব্বুল আল-আমীন যেন আপনাকে জান্নাতবাসী করেন। আপনার আকস্মিক মৃত্যু আমাদের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটি পর্যন্ত দিল না। তবুও আমাদের প্রত্যাশা আপনি নিশ্চয়ই আমাদের মত অনুজদের ক্ষমা করবেন। আপনার জন্য যেন দোয়া করতে পারি আমরা সবাই । মহান সৃষ্টি কর্তা আমাদের সকলকে সেই তওফিক দান করুন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>