এক মাসের জন্য ফাটাকেষ্ট হতে চায় পটুয়াখালীর এমপি মাহবুব!

আপডেট : May, 28, 2017, 10:50 am

কয়েক বছর আগেও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বদনামের মধ্যে ছিল টুকটাক চাঁদাবাজি। এখন কোটিপতি হিসেবে এলাকায় নামডাক। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদরে বানিয়েছেন দ্বিতল মার্কেট। তা সরকারি খাসজমির ওপরে। জমিটি কী করে ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেল তার হদিস করা দুষ্কর। আত্মীয়তার হদিস পাওয়া না গেলেও এই করিতকর্মা হুমায়ুন কবীর তালুকদার পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান তালুকদারের ‘ভাগ্নে’। জানতে চাইলে এমপি মাহবুবুর রহমান তালুকদার স্বয়ং মোবাইল ফোনে বলেন, ‘রাঙ্গাবালী উপজেলার যত জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের নেতা আছেন তারা সবাই আমাকে কেউ চাচা কিংবা মামা ডাকেন। এই সুবাদেই ভাগ্নে।’ এমনিভাবেই স্থানীয় লোকমুখে রাঙ্গাবালী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মামুন খান ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হানিফ মিয়ার পরিচিতি এমপির ‘কামাইপুত’ হিসেবে। এই দুই চেয়ারম্যান ভূমিহীনদের কাছ থেকে শতাংশপ্রতি তিন-চার হাজার টাকা নিয়ে খাসজমি বণ্টন করেন। এ টাকা উচ্চ পর্যায়ে ভাগাভাগি হয়। বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া যায়, এমপির দ্বারা পরিচালিত হয়ে তার এরূপ ‘ভাগিনা’ ও ‘কামাইপুত’রা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমপি লাভবান হলেও তিনি সরাসরি জড়িত হন না। আওয়ামী লীগের নিষ্ঠাবান কর্মীদের মতে, জনগণের চোখে এমপি কাঠগড়ায় ওঠার ফলে আগামী নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে নৌকায় ভোট চাওয়া কঠিন হবে। যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহবুবুর রহমান তালুকদার এমপি ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘চোর হলো সাধু, আমি হলাম চোর_ এই হচ্ছে আমার ৫৫ বছরের রাজনীতির অর্জন।’ মোবাইল ফোনে প্রায় ৪৫ মিনিটের কথোপকথনে তিনি নিজের দলেরই অন্যদের দোষারোপ করে বলেন, ‘রাজনীতি এখন আর ভালো মানুষের হাতে নেই, টাকার খেলায় রাজনীতি থেকে ভদ্রলোকরা হারিয়ে গেছে। পায়রা ও মৎস্যবন্দরকে ঘিরে বড় মাফিয়া জোনে পরিণত হয়েছে কলাপাড়া। ওই চক্রটি আমার বিরুদ্ধে ঢালাও অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ ‘ভাগিনা’ সমাচার :এমপির ‘ভাগিনা’ অনেক। হুমায়ুন কবীর তালুকদার রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি। নুরে আলম বিপ্লব কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী এবং উপজেলা যুবলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। তিনিই আবার এমপির মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত হালিমা খাতুন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ। রাঙ্গাবালী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এমপির আশীর্বাদ নিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত বলে অভিযোগ আছে। এক সময়ের কলাপাড়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মান্নান খান এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এমপির হাত ধরে তার দলে আসা। গত বছরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মান্নান খান আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। এখনকার আওয়ামী লীগ কর্মী গাজী আব্বাস বাচ্চু তখন ছিলেন ঘোর বিএনপি সমর্থক। এই বাচ্চু গত ১ মে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা বরকতউল্লাহ অভি হত্যা মামলায় প্রধান আসামি। পুলিশের ভাষায় ‘পলাতক’, তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে বাজারে ঘুরতে দেখেছেন বলে জানান। স্বয়ং এমপিও গত পৌর নির্বাচনে কলাপাড়া এবং কুয়াকাটা পৌরসভায় দল মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে গোপনে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেন কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী লীগ নেতারা। সরকারি খাস জায়গায় হুমায়ুন কবীর তালুকদারের মার্কেট সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এমপি বলেন, ‘রাঙ্গাবালী সদরে যত মার্কেট আছে সবই সরকারি জমিতে নির্মিত। হুমায়ুন যে মার্কেট করেছে তা ১৫ বছর আগের, তখন আমি এমপি ছিলাম না।’ রূপান্তর :২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে এলাকাবাসীর কাছে প্রিয়ভাজন রাজনীতিক ছিলেন মাহবুব। তখন তার অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল না। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এক সময়ের সজ্জন রাজনীতিক বলে গৃহীত মাহবুবুর রহমান তালুকদার পর পর দু’বার এমপি হয়ে এখন আর এলাকায় নন্দিত নন। দলের নেতাকর্মীরাই তার নিন্দায় পঞ্চমুখ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, ২০০৯ সালে প্রতিমন্ত্রী হয়েই মাহবুব তালুকদার বেপরোয়া হয়ে পড়েন। তখন প্রথম দুই-আড়াই বছরের মধ্যে প্রায় ১৫০ একর জমি দখল করে নিজের নামে দলিল করানোর অভিযোগ আছে। কলাপাড়ার সাব-রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৪৩৮৪/০৯, ৪৭৮০/০৯, ৫১৩৯/০৯ ও ৪৪৭৪/০৯ নম্বরের চারটি দলিল এবং তিনটি বায়নাপত্রে ১৪ একর জমি মাত্র ৩৯ লাখ টাকায় কিনেছেন এমপি মাহবুব। অথচ কলাপাড়ায় তখন জমির শতাংশপ্রতি দাম দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। দখল হওয়া জমির এক পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৯ সালে তাদের প্রায় চার একর জমি দখল করে প্রথমে পিলার পুঁতে দেয় তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর অনুগত সজলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। পরে পাঁচ একর জমি মাত্র ১১ লাখ টাকায় দলিল করে দিতে বাধ্য করা হয়। ওই পরিবারটি পরে মামলার প্রস্তুতি নিলে তাদের বসতবাড়িতে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, কুয়াকাটার আদর্শপল্লী ও গঙ্গামতি সৈকতের কাছে প্রায় ৫০ একর খাস জমি কয়েকটি হাউজিং কোম্পানির পক্ষে দখল নিতে নেতৃত্ব দিয়েছে এমপি মাহবুবের অনুগত সুজন-সজল বাহিনী। মাহবুবুর

রহমান তালুকদার নিজে যে ‘ওশান গ্রুপ’ নামের একটি হাউজিং কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন সেই কোম্পানি ওই সময় আদর্শপল্লী হিসেবে পরিচিতি সরকারি খাস জমি দখল করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়। ২০১১ সালের ১ অক্টোবর সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর ক্যাডাররা কুয়াকাটার পান্দুপাড়া গ্রামের শাজাহান হাওলাদারের বসতবাড়িসহ ৬৬ শতাংশ জমি দখল করে। একই দিনে সরকারি খাস খতিয়ানের শত বছরের পুরনো একটি পুকুরও দখল করে তারা। দখলের পর ওই জমিতে টানানো সাইনবোর্ডে পাঁচ দখলদারের নামের মধ্যে দ্বিতীয় নামটি ছিল এমপি মাহবুবের একান্ত অনুগত ক্যাডার জিয়াউল রহমানের। কুয়াকাটার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় এমপি মাহবুবের অনুগত সুজন-সজল-জিয়া বাহিনী কুয়াকাটার লতাচাপলী-গঙ্গামতি এলাকায় প্রায় দেড়শ’ একর জমি বিভিন্ন নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে দখল করেছে। দখল হয়ে যাওয়া জমির মালিক একাধিক পরিবার এখনও ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে এমপি মাহবুব ও তার স্ত্রী প্রীতি রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলায় চার্জশিট হয়েছে। প্রীতি রহমানের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজের তখন দাপট ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা জানান, দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান আজাদের পৈতৃক সাড়ে ৬ শতাংশ জমি দখল করেছেন এমপি। এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা। রাঙ্গাবালী সমাচার :২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৪ এমপির একজন মাহবুবুর রহমান তালুকদার। এর পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে দলের নেতারাই বেশি সোচ্চার। বড় একটি অভিযোগ_ বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন লোককে আনুকূল্য দেওয়া। কলাপাড়া উপজেলার ওই আওয়ামী লীগ নেতা জানান, এমপি মাহবুবের ভাগি্নজামাই জামায়াত সমর্থক কলেজ শিক্ষক আবু সালেহ মোজাহার অজ্ঞাত উৎসের সম্পদে কোটিপতি হয়েছেন। স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে এমপির ভাগ্নে রুহুল আমিন, ফুপাতো ভাই ইউসুফ আলীসহ জামায়াত-বিএনপির একাধিক নেতা ২০০৮ সালের পর থেকে কয়েকশ’ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করেছেন, যেগুলোর অধিকাংশ শেষ না করে বরাদ্দের অর্থ খরচ হয়ে গেছে। যেমন, মহিপুরের নিজামপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৫ কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙন প্রতিরোধের কাজ হয়নি এক টাকারও। ওই কাজের ঠিকাদার গঙ্গামতি এন্টারপ্রাইজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাঙ্গাবালী উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, এমপির বন্ধু বর্তমান জেলা পরিষদ সদস্য এবং চরমোন্তাজ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবু সামসুদ্দিন রাঙ্গাবালীতে হাজার একর জমির মালিক। একডজন মাছের ঘের আছে তার। পাশের উপজেলা গলাচিপায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বানিয়েছেন বিলাসবহুল বাসভবন। অথচ আবু সামসুদ্দিনের বিত্ত-বৈভবের উৎস জানা যায় না। এমপির অনুসারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এনামুল ইসলাম লিটু বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের মরা নদী দারভাঙ্গা দখল করে মাছের ঘের করেছেন। ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় তার আছে একটি স্থায়ী জুয়ার আড্ডা। এনামুল ইসলাম ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে পটুয়াখালীতে দায়ের করা একটি ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এমপির আরও এক ঘনিষ্ঠজন ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজি মান্নান গত দুই-তিন বছরে নামে-বেনামে দেড় হাজার একর খাসজমির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দুটির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি থাকতে না পারলেও মাহবুবুর রহমান তালুকদার কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে কলাপাড়ার ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান সানু এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে সব ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তার সভাপতি পদ স্থগিত করা হয় এবং সভাপতি পদে থাকা কেন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি হয়। এরপর বিধি অনুযায়ী ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী। জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, জেলা প্রশাসকের পক্ষে তিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সভাপতির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। টেলিফোনে আলাপকালে এমপি মাহবুবুর রহমান তালুকদার আত্মপক্ষ সমর্থন করে  বলেন, তিনি ছাত্রজীবন শেষ করে ১৯৮৮ সালে কলাপাড়ায় এসে মাত্র ৭-৮ জন আওয়ামী লীগার পেয়েছিলেন। যুবলীগ-ছাত্রলীগ ছিল না। সেই অবস্থা থেকে দলকে সংগঠিত করেছি। এখন কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী আওয়ামী লীগে বড় বড় ভুঁইফোড় নেতা গজিয়েছে। ‘ওরা মিথ্যুক, ঠকবাজ’ বলে এমপি মাহবুব তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে আরও বলেন, ‘আবার যদি আল্লাহ আমাকে এমপি বানান তাহলে যেন আমাকে এক মাসের জন্য ফাটাকেষ্ট হওয়ার সুযোগ দেন।’ ফাটাকেষ্ট হচ্ছে মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত একটি ভারতীয় বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চরিত্র, যে একজন সাধারণ গুণ্ডা থেকে আইনসভার সদস্য ও মন্ত্রী হয়ে তার বিরোধী মন্ত্রীসহ দলের ভেতরের খারাপ লোকদের শায়েস্তা করে।

সূত্রঃ সমকাল

Facebook Comments