এবারের বাজেট আলোচনার কেন্দ্রে তিন ইস্যু

জুন ২০ ২০১৭, ১২:০৩

এবারের বাজেট আলোচনায় তিনটি ইস্যু নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। এগুলো হলো ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাব ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা। সরকারি, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্রসহ বেশিরভাগ সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের সমালোচনা করছেন। তারা সবাই এই ইস্যু তিনটি পুনর্বিবেচনা দাবি তুলেছেন। এমনকি রেওয়াজ ভেঙে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরাও এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অবশ্য সংসদ সদস্যদের এই অব্যাহত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখাতে শুরু করেছেন। ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিষয়গুলোর ‘কিছু ক্ষেত্রে’ বিবেচনা করার।

টিভিতে দেখানো হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা (ছবি: ফোকাস বাংলা)অর্থমন্ত্রী গত ১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেন। বাজেট প্রস্তাবনা সময় ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বছরের যেকোনও সময় ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকার বেশি স্থিতি থাকলে আবগারি শুল্ক বিদ্যমান ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হবে। পাশাপাশি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেনে ১৫ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেন।

ব্যাংক আমানতের কর আরোপের পাশাপাশি বাজেট প্রস্তাবনায় কিছু নিত্যপণ্য বাদে অন্যান্য পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করেন। এছাড়া বাজেটের পর দিন সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বিদ্যমান হারের থেকে ২ থেকে আড়াই শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেন। কিছু দিনের মধ্যে এ বিষয়টি কার্যকর করা হবে বলেও তিনি জানান।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবনার পর ৫ জুন থেকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে ৫ ও ৬ জুন চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের সম্পূরক বাজেট ও বাকি দিনগুলোয় চলতি প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেট নিয়ে সাধারণ আলোচনা। সোমবার পর্যন্ত ১৪৮ জন সদস্য বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
.

জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ সালের বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী (ছবি: ফোকাস বাংলা)বেশিরভাগ সংসদ সদস্য তাদের আলোচনায় এই তিনটি বিষয় তুলে এনেছেন। সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বিশেষে জাতীয় সংসদে এর সমালোচনা করে বিষয়টি বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কেউ কেউ সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। মাদকদ্রব্য বা সমাজের ক্ষতিকর কোনও পণ্য ও সেবার ওপর আরোপিত হওয়া এই আবগারি শুল্ককে ‘পাপ কর’ উল্লেখ করে এর নাম পরিবর্তনেরও দাবি তুলেছেন।

বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের প্রভাবশালী সদস্য আবদুল মান্নান, অধ্যাপক আলী আশরাফ, হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার, কাজী নাবিল

আহমেদ, তানভীর ইমাম, ডা. হাবীবে মিল্লাতসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য বাজেট বক্তৃতায় বিষয় তিনটি তুলে এনেছেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনসহ কয়েকজন মন্ত্রীও এই নিয়ে সংসদে কথা বলেছেন।
তারা অর্থমন্ত্রীকে ‘জিদ ধরে’ বসে না থেকে আগামী নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেন, আমানতের ওপর কর প্রস্তাব করে মানুষের ওপর কনফিউশন ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জিদ ধরে আছেন কমাবেন না। এখানে জেদ ধরার বিষয় নেই। আওয়ামী লীগ মানুষের রাজনীতি করে। মানুষের চাওয়া পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। মানুষ এ শুল্ক চায় না। আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতি করে, এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ব্যাংক হিসাবের ওপর আরোপিত বর্ধিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি তুলে তিনি বলেন, আমি কেবিনেটের সদস্য। কেবিনেটে এই বাজেট পাস হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কথা বলা নৈতিকতা বিরোধী। তবে আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাদের কথা বলতে হবে। সঞ্চয়ের ওপর কর আরোপ করা ঠিক হবে না। ফিক্সড ডিপোজিটের ওপর যাতে কর আরোপ না করা হয়। সাধারণ মানুষ, স্বল্প বেতন পাওয়া মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। এখানে শুল্ক আরোপ করা ঠিক হবে না।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া বলেন, ‘ব্যাংকের সুদ নিম্ন পর্যায়ে, ব্যাংক সার্ভিস চার্জ কাটে। এরমধ্যে এই আবগারি শুল্ক হবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। এটা তো মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলের টাকা না, যে ঘি দিয়ে প্রদীপ জ্বালাব!’ তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদ কমানো ঠিক হবে না। ১০ শতাংশ সুদ ধরলে হয়ত হবে এক হাজার কোটি টাকা। এর সুবিধা পাবে লাখ-লাখ লোক। যাদের জন্য কোনও সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প নেই। ’

এছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সমালোচনা করে এমপিরা বলেছেন, ঢালাওভাবে ভ্যাট আরোপ করা হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। যার প্রভাব পড়বে আগামী সংসদ নির্বাচনে। আলোচনাকালে বেশ কয়েকজন সদস্য সুনির্দিষ্ট করে কয়েকটি খাত যেমন ই-কমার্স, মেডিটেশন, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।

সংসদের ভেতর-বাইরের এসব দাবি ও ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী রবিবার প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক আমানতের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্কের নাম ও হার উভয়ই পরিবর্তন করার কথা জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আবগারি শুল্ক নামটি ভালো শোনায় না, তাই এর নাম পরিবর্তন হবে। এ শুল্ক আগে থেকেই ছিল, আমি শুধু হার বাড়িয়েছি। এতেই ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা দহচ্ছে। চিৎকার যেহেতু হচ্ছে, তাহলে এ হারে কিছু পরিবর্তন হবে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান প্রস্তাবিত বাজেটে অসামঞ্জস্য কিছু থাকলে তা বিবেচনার আশ্বাস দেন।

Facebook Comments