এমপি হারুনের অপসারণ চায় আ. লীগ

আপডেট : May, 22, 2017, 9:16 am

কে এম সবুজ, ঝালকাঠিঃ ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের (বি এইচ হারুন) বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য এখন ওই দুই উপজেলার বেশির ভাগ নেতাই দলীয় পদ থেকে তাঁকে অপসারণের দাবি জানাচ্ছেন। রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনকে আগামী সংসদ নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন না দেওয়ারও দাবি তাঁদের। এমনকি তাঁকে মনোনয়ন দিলে গণপদত্যাগেরও হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় রাজধানীর বনানীর আলোচিত দ্য রেইনট্রি হোটেলের মালিক মূলত বি এইচ হারুন। তবে কাগজে-কলমে এর মালিকানা তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে ও মেয়ের নামে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাই এখন বলছেন, বি এইচ হারুন ২০০০ সালের আগে আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। ওই বছর তাঁকে দলীয় সদস্য করার পর ২০০৮ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর পরিবার মূলত স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত। আর তাই সংসদ সদস্য হয়ে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাদ দিয়ে জামায়াত-শিবিরের লোকজন নিয়ে ওঠাবসা করছেন। আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডেও তিনি অংশ নেন না।

বি এইচ হারুনের অপসারণের দাবিতে ইতিমধ্যে রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ, ছাত্রলীগের একাংশ ও যুবলীগের একাংশ সম্মিলিতভাবে সভা করেছে। হারুনের অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে লিখিত পত্র পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক ডেজলিং তালুকদার  বলেন, ‘আমরা রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ থেকে বি এইচ হারুনের অপসারণ দাবি করছি। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের অপসারণের দাবি জানিয়ে একটি পত্র দু-এক দিনের মধ্যে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জেলা আওয়ামী লীগের কাছে পাঠানো হবে। এর পরও যদি তাঁকে অপসারণ করা না হয়, তাহলে দল থেকে আমরা গণপদত্যাগ করব। ’

রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের আরো অভিযোগ, বি এইচ হারুন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর গত আট বছরে এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীদের কোনো খোঁজখবর নেননি। স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করে তিনি তাঁর ভাই জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও গালুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুল হক কামালকে দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এর আগে তাঁকে রাজাপুরে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেছিল উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক দিনের জন্যও এসে বসেননি হারুন। দলীয় কার্যালয়ের কোনো সভা-সমাবেশেও অংশ নিচ্ছেন না তিনি। পছন্দের কিছু লোক নিয়ে দলীয়

কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় গিয়েও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারছে না স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, সংসদ সদস্য হারুনের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার ভয় দেখান। জামায়াত-শিবিরের লোকজনের সঙ্গে তাঁর এখনো সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন তিনি।

কাঁঠালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তরুণ সিকদার বলেন, ‘যারা দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মী ছিল, তাদের অবমূল্যায়ন করে বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের পুনর্বাসন করছেন তিনি। যে ভিশন নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন, তা-ই বাস্তবায়ন করছেন। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, গত বছরের ২২ মার্চ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ও এক শিবির ক্যাডারকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়েছেন সংসদ সদস্য হারুন। রাজাপুর উপজেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি কামাল সিকদারকে তিনি মঠবাড়ি ইউনিয়নে মনোনয়ন দেন।

রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক ডেজলিং তালুকদার  বলেন, ‘দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ রাখেননি সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন। তিনি জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে ফায়দা নিচ্ছেন। এতে দলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা তাঁর কারণে কোনো সভা-সমাবেশে গিয়ে বক্তব্য দিতে পারি না। যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী তাদের তিনি (এমপি) চোখে দেখতে পারেন না। ’

সংসদ সদস্য হারুনের গ্রামের বাড়ি রাজাপুরের কানুদাশকাঠি। ওই এলাকারই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়িতে এমপি সাহেব এলে কোনো নেতাকর্মীর খবর নেন না। এখানে কয়েকজন ঠিকাদার নিয়ে তিনি বৈঠক করেন। ’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বি এইচ হারুনের বাবা আব্দুর রব স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। কাঁঠালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তরুণ সিকদার বলেন, বজলুল হক হারুন কখনোই আওয়ামী লীগ ছিলেন না। তিনি ও তাঁর পরিবার ধর্মব্যবসায়ী। ওনার মতো লোক আওয়ামী লীগের এমপি হওয়ায় দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আমরা বি এইচ হারুনের দলীয় পদ থেকে অপসারণ চাই। ’

রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন মাতুব্বর বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী হওয়ায় আমরা বজলুল হক হারুনের মনোনয়নের বিরুদ্ধে ছিলাম, এখনো আছি। আজ রেইনট্রি কেলেঙ্কারির ঘটনায় লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমাদের। ’

রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল আলম সরফরাজ জানান, হারুন ২০০০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক করা হয় তাঁকে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ২০১০ সালে রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পান হারুন। পরে ২০১৩ সালে নতুন করে কমিটি গঠন করা হলে ওই কমিটিতেও তাঁকে সভাপতি করা হয়।

সূত্রঃকালের কণ্ঠ

Facebook Comments