এস এম সোলায়মান: মৃত্যুতেও জীবন্ত যে আখ্যান

অক্টোবর ১১ ২০১৭, ১৭:২৭

লালন শাহ্ খ্যাপার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়’। আমাদের খ্যাপা অর্থাৎ বাংলা নাটকের খ্যাপাপুরুষ কিন্তু নিজের খবর না জেনেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর তো নিজের খবর নেওয়ার ফুরসত ছিল না, শুধু কাজ আর কাজই করে গেছেন জীবনভর। জীবনটাও যে ছিল খুব কম সময়ের। মাত্র ৪৮ বছর বেঁচে ছিলেন। (২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০০১)। বলছিলাম অকালপ্রয়াত এস এম সোলায়মানের কথা। বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রতিভাধর এই নাট্যজনের অভাবটা আজ আমরা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের নাট্য আন্দোলনে তিনি যে সৃজনসম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়ায় তা যেন মুখ থুবড়ে পড়ে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর মতোই কম বয়সে অর্থাৎ ৪৮-এ চলে গিয়েছিলেন। মানিক যেমন বাংলা সাহিত্যকে নতুন এক ঐশ্বর্যময় রত্নভান্ডারের সন্ধান দিতে পেরেছিলেন কিন্তু পুরোটা আহরণ করে দিয়ে যাওয়ার সময় পাননি, এস এম সোলায়মানও তাই। দুজনই নতুন পথের সন্ধান করেছেন, একজন সাহিত্যে, অন্যজন নাট্যে।

এস এম সোলায়মানের মৃত্যুটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। কেউ কেউ থাকেন, যাঁরা মৃত্যুর পরে আরও জীবন্ত হয়ে ওঠেন, এস এম সোলায়মান তেমনই একজন। তাঁর কাজ তাঁকে আমাদের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে। এস এম সোলায়মানের কাজ নিয়ে নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে পণ্ডিত ও নাট্যতাত্ত্বিকেরা গবেষণা করবেন, আমি সে কাজের যোগ্য নই। আমি তাঁর সব কাজ দেখার সৌভাগ্যও অর্জন করিনি, এমনকি তাঁর সঙ্গে কোনো রকম সখ্য গড়ে ওঠার সুযোগও হয়নি। দূর থেকে দেখেছি ছোটখাটো এই মানুষটিকে, কখনো টিএসসি চত্বরে, কখনো রাজপথের আন্দোলনে, কখনো মঞ্চে। একটু কুঁজো হয়ে চলতেন তিনি কিন্তু তাতে ব্যক্তিত্বের ঋজুতার কোনো অভাব ছিল না। চোখে সোনালি ফ্রেমের প্রায় গোলাকৃতির চশমায় যেন জ্যোতির পরিপক্বতাই ধরা পড়ত। আর তাঁর বিখ্যাত ৫০ সিসি মোটরসাইকেলে তাঁকে আমার মনে হতো চে গুয়েভারা। বিপ্লবের জন্য চে যেমন ছুটে বেড়াতেন, সোলায়মানও হয়তো তেমনি একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। আর এসবের প্রমাণ মেলে তাঁর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। তিনি যখন নাটকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছেন, তখন দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, গণতন্ত্র—সামরিক একনায়কের বুটের নিচে পিষ্ট আর সংস্কৃতি তার

আপন স্রোতে বাধাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পক্ষে বরং এটা ভাবাই সমীচীন হবে যে, তিনি নাটকের মঞ্চে আবির্ভূত হলেন রাষ্ট্রের সৃষ্ট সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিকূলতার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। তিনি যে সে লড়াইটিকেই সে সময় প্রাধান্য দিয়েছিলেন তার প্রমাণ তো তাঁর নাটক। একের পর এক নাটক রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি জঙ্গম করে তুললেন তাঁর লড়াই। খ্যাপা প্যাচাল, ইঙ্গিত, গণি মিয়া একদিন, আহ্ কমরেড, ইন্সপেক্টর জেনারেল, এই দেশে এই বেশে, কোর্ট মার্শাল প্রভৃতি নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরলেন। তরুণ সংস্কৃতিসেবী ও কর্মীদের কাছে এস এম সোলায়মান আইকনে পরিণত হন। ব্যঙ্গরস-স্যাটায়ারের মাধ্যমে তিনি সমকালীন রাজনীতি, ধর্মব্যবসা ও স্বৈরতান্ত্রিকতাকে বিদ্রূপ করেছেন। আদর্শহীন, সুবিধাভোগী, লোভী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে ঝেঁটিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে তিনি আমৃত্যু কাজ করেছেন, মঞ্চে ও রাজপথে।

এস এম সোলায়মান আমাদের দেশের নবনাট্য আন্দোলনে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন। রাজনৈতিক স্যাটায়ার ধারার প্রচলন তাঁর হাতেই শুরু হয় এবং সফলতা লাভ করে। আমাদের দুঃখও হয়, তাঁর অবর্তমানে আর কেউ এই ধারাটিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হননি। এস এম সোলায়মানের আরেকটি বড় কৃতিত্ব মিউজিক্যাল প্লে। আমাদের মঞ্চে তিনিই প্রথম এই ধারাটির সফল ও সার্থক সূত্রপাত ঘটান। তাঁর আমিনা সুন্দরী, গোলাপজান প্রভৃতি নাটক আমাদের মঞ্চে মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। তিনি প্রায় ৩০টির অধিক নাটক রচনা ও রূপান্তর করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন তারও বেশি। আরও একটি কারণে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তা হলো তাঁর রচিত ও নির্দেশিত নাটক আমিনা সুন্দরী আমেরিকার অব ব্রডওয়ের প্রথম বাংলা নাটক হিসেবে মঞ্চায়নের গৌরব অর্জন করায়।

এস এম সোলায়মান একজন বড়মাপের সংগঠকও ছিলেন। তিনি দু-দুবার বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নির্বাচিত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বেশ কটি সফল নাট্যসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সবশেষে বলতে হয়, তাঁর কাছ থেকে আমাদের নাটক যতটা ঋদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাঁর স্বল্পায়ু জীবনের কারণে তা হতে পারেনি। তবে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, তার যেন সঠিক মূল্যায়নে আমরা কার্পণ্য না করি।

মৃত্যুদিনে একুশে পদকে ভূষিত সংগ্রামী নাট্যপুরুষ এস এম সোলায়মানকে লালসালাম। জয়তু এস এস সোলায়মান।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>