এ শহর ময়লার শহর!

আপডেট : April, 1, 2017, 2:06 pm

বরিশাল কলেজের পড়ুয়া শাকিলের সাথে,নগরজুড়ে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অাবর্জনায় জনসাধারনের দূর্ভোগ নিয়ে। শুরুতেই তিনি চিরকুটের গাওয়া গান এ শহর ঢাকার শহরের অবিকল করে ক্ষোভের সাথে বলেন, “এ শহর ময়লায় শহর”। এ যেন ময়লার শহরই।যে কেউ এই শহরে প্রথমবার এসে এই অবস্থা দেখে কখনো বিশ্বাস করবে না।এটাই তিলোত্তমা বরিশাল শহর।এটাই শওকত হোসেন হিরনের হাতে গড়া বরিশাল শহর।

অার কিভাবেই বা করবে অাজ শনিবারসহ ছয় দিন ধরে বরিশাল শহরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে আছে। এতে করে নগরবাসী পড়েছে চরম দুর্ভোগে। বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত সোমবার থেকে কর্মবিরতির ডাক দেন। তাঁরা নগর ভবনে তালা দিয়ে বর্জ্য অপসারণসহ সব ধরনের কাজ বন্ধ রেখেছেন।

এই অবস্থায় দ্রুত নগর পরিচ্ছন্ন করতে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে গত বৃহস্পতিবার একটি নাগরিক অধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামাল, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধাকে আইনি (উকিল) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
গতকাল বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের ব্যস্ততম সদর রোড, ফজলুল হক অ্যাভিনিউ, হাসপাতাল রোড, কালীবাড়ি রোড, আলেকান্দাসহ সব আবাসিক এলাকায় বর্জ্যের স্তূপ। দুর্গন্ধে মানুষ নাক চেপে হাঁটছে। নগরের অশ্বিনীকুমার হলের সামনের সদর রোড, বিবির পুকুরপাড়, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের চারপাশ, নগর ভবনের চারপাশ, অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, পুরান বাজার, নতুন বাজার, বাংলাবাজার, বটতলা বাজার, চৌমাথা বাজার, রূপাতলী বাজার, সাগরদি বাজার এলাকায় সড়কে ময়লা স্তূপ হয়ে আছে। পচা বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা তন্ময় কুমার নাথ বলেন, হাসপাতাল রোড থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত পুরো সড়কের ওপর ক্লিনিক ও বাসাবাড়ির বর্জ্য ছড়িয়ে আছে। দুর্গন্ধে বের হওয়া যাচ্ছে না।
কালীবাড়ি সড়ক এলাকার বাসিন্দা সোয়েব আহম্মেদ বলেন, নগরবাসী এখন সিটি করপোরেশনের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। পাঁচ দিন ধরে ময়লার মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। বাসায় পেটের পীড়া দেখা দিয়েছে। দ্রুত ময়লা না সরলে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আইনি নোটিশ
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি বরিশালের পক্ষ থেকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বরিশাল মহানগরে প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাস। এটি পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে পরিচিত। এখানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন

ধরে পুরো মহানগর ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে আছে। সিটি করপোরেশনের কাজ হচ্ছে নগর পরিচ্ছন্ন রাখা, নাগরিকদের সেবা করা। কিন্তু সিটি মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার উদাসীনতার কারণে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। নানা রোগ দেখা দিয়েছে।
নোটিশে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে নগর পরিচ্ছন্ন করা না হলে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নগর পরিচ্ছন্ন করতে বাধ্য করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়।
পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি বরিশালের সদস্য ও বরিশাল নগর সৌন্দর্য রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব কাজী এনায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, করপোরেশনের বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন হতেই পারে। কিন্তু নাগরিকদের জিম্মি করার অধিকার কারও নেই। দুর্গন্ধে নগরে হাঁটা-চলা করা যাচ্ছে না। দ্রুত এই অবস্থার অবসান দরকার।
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি
গতকাল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন কর নির্ধারক কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজস্ব আয় কয়েক গুণ বেড়েছে। তারপরও বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা হচ্ছে। মেয়র বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। তাঁর অব্যবস্থাপনা, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণেই করপোরেশনের বেহাল অবস্থা। এ পরিস্থিতির জন্য মেয়রই দায়ী। তাই দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিস্বার্থে আন্দোলন করা হচ্ছে—মেয়রের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা বলেন, মেয়রের বারবার আশ্বাসের পরও বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেবল তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনে নেমেছেন। এখানে কোনো শ্রমিককে উসকে দেওয়া হয়নি।
বর্জ্য অপসারণ না করে নাগরিকদের জিম্মি করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে ঠিকই। আমরা চাই মেয়র এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হোক।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শক মো. নূর খান, বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. রাসেল খান, জরুরি বিভাগের শ্রমিক জিয়াউদ্দিন।
মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, ‘আমরা এখনো উকিল নোটিশ পাইনি। তা ছাড়া উকিল নোটিশ লাগবে কেন? এক মাসের বেতনের জন্য এভাবে নগরবাসীকে কেউ জিম্মি করে? আমাকে অফিসে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে নগর ভবনে যাব। কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
মেয়র আরও বলেন, ‘করপোরেশনের রাজস্ব আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। বর্তমানে রাজস্ব আয় পর্যাপ্ত নয়। তা ছাড়া আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে।’

Facebook Comments