কলম্বোতে আজ শততম টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ

কলম্বোর দরজির দোকান থেকে নীল রঙের ব্লেজারগুলো এসে গেছে। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশ স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করা মেডেলগুলো শেষবারের মতো নেড়েচেড়ে দেখে নিয়েছে পলিশ ঠিক আছে কি না। ম্যাচ শুরুর আগে নীল ব্লেজার গায়ে সার বেঁধে দাঁড়াবেন মুশফিকরা। তাঁদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে ওই পদকগুলো।
একটা টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের গায়ে বিশেষ ব্লেজার কেন, কেনই–বা তাঁদের গলায় উঠবে সোনালি পদক? এটি আমরা জানি। বাংলাদেশ আজ কলম্বোয় খেলছে নিজেদের ইতিহাসের শততম টেস্ট। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর, টেস্ট ক্রিকেট নামক যে ট্রেনের যাত্রী হয়েছিল বাংলাদেশ, সেই ট্রেন ১৭ বছরের যাত্রাপথে ভিড়ছে আজ ১০০ নম্বর স্টেশনে।
মুশফিকুর রহিম, রঙ্গনা হেরাথএ এমন এক টেস্ট ম্যাচ, যেটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জয় ছাড়া অন্য কোনো আয়োজনের কথা ভাবছে না বাংলাদেশ। মনে যদিও জয়ের তীব্র নেশা, তবু প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশের হাতে তুলে দিচ্ছে শুভেচ্ছার ফুল।
শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথ যেমন ভরা সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার শুরুতেই অভিনন্দন জানালেন বাংলাদেশকে। তিন বছর বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচ ছিলেন চম্পকা রামানায়াকে, এখন ওই কাজটিই করছেন শ্রীলঙ্কা দলে। তিনিও কাল পি সারা স্টেডিয়ামে গনগনে সূর্যটাকে মাথার ওপর রেখে মুশফিকের দলকে জানিয়ে গেলেন আন্তরিক শুভকামনা। এই শ্রীলঙ্কানের অন্তরের প্রায় সবটুকু জুড়েই এখন শ্রীলঙ্কা। তবে ওই ‘প্রায়’ শব্দটির একটা সূক্ষ্ম কোণে যেন এক টুকরো বাংলাদেশও আছে। তাঁর বিশ্বাস, মাইলফলকের এই ম্যাচের শেষে জয়ের রঙে রাঙানো মাঙ্গলিক মুহূর্ত তৈরি করার সামর্থ্য এই দলটির আছে। যে দলটিকে তিনি রেখে এসেছিলেন প্রায় ছয় বছর আগে, সেটি এখন অনেক পরিণত।
জেতার সামর্থ্য যে দলের তৈরি হয়েছে, সে নিয়ে তর্ক এখন সামান্যই। তবে সামর্থ্যকেও তো কখনো কখনো ছাপিয়ে যায় সুতীব্র ইচ্ছা। সেই ইচ্ছার আগুনে যেন টগবগ করে ফুটছে গোটা দল। শততম টেস্ট। শততম টেস্ট! মেহেদী হাসান মিরাজ দুই দিন আগে পি সারা ওভালে পা রাখার পর থেকেই বলে যাচ্ছেন, ‘আমরা জিতব। আমরা জিতব। এটা আমাদের শততম টেস্ট, এ টেস্টে আমাদের জিততে হবেই।’ মাহমুদউল্লাহর দেশে ফিরে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে একটা গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে দলের মধ্যে। ক্রিকেটাররা যেন একটা অঘোষিত কার্ফুর মধ্যে পড়ে গেছেন। কারও সঙ্গেই আলাদা করে কথা বলার জো নেই। যেমন ধরেন শুভাশিস। শততম টেস্টের কথা তাঁর কাছে তুলতেই মুখে হাসি, ‘হ্যাঁ, শততম টেস্ট খেলব আমরা, বিরাট ব্যাপার…’, কিন্তু যখনই এই ফাস্ট বোলারের কাছে জানতে চাওয়া হলো,

তাঁর ভাবনা কী? ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, ম্যানেজারের কাছ থেকে একটু পারমিশন নিয়ে আসি!’ তবে শততম টেস্ট খেলতে নামার অনুভূতিকে তো ‘পারমিশন’ দিয়ে বাঁধ দেওয়া যায় না। টেস্টের সহ-অধিনায়ক তামিম ইকবাল যেমন ‘থাম্বস আপ’ করে জানিয়ে দিলেন, এমন একটি টেস্টে জয়ের মন্ত্রে মগ্ন হয়ে আছে সবাই।
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফের সবার কাছে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর শব্দটির নাম এখন শততম টেস্ট। আর সেই টেস্টের যোগ্যতম উপহার—জয়।
কিন্তু এই রোমাঞ্চের সুবাস, এই উৎসবের আবহ আর রং মনোযোগের তারটাকে আবার কেটে দেবে না তো? অলক্ষ্যে এসে জুড়ে বসবে না বিষম চাপ? বাংলাদেশের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম সংবাদ সম্মেলনে খুব ভালো কথা বললেন, ‘চাপ না ভেবে আমরা তো এটিকে অনুপ্রেরণা হিসেবেও নিতে পারি। তা ছাড়া শততম টেস্টটি ঘটনাচক্রে আমাদের সিরিজ বাঁচানোর লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বলা হচ্ছিল উৎসবের কথা। বাংলাদেশের শততম টেস্ট নিয়ে কলম্বোতে উৎসবের মেজাজ শুধু বাংলাদেশ শিবিরেই। আর বাংলাদেশের সমর্থকদের মনে। ঢাকা থেকে উড়ে এসেছেন কিছু দর্শক। শোয়েব আলী নামের এক বিশেষ ভক্ত তো সিরিজের শুরু থেকেই শ্রীলঙ্কায়। কাল বড় একটা লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে তাঁকে রিহার্সালও করে নিতে দেখা গেল পি সারায়। এই টেস্টটাই বাংলাদেশে হলে হয়তো অন্য রকম হতো। মিরপুরকে মনে হতো উৎসবপুর। একটা ঢেউ ছড়িয়ে পড়ত ঢাকায়। যেভাবেই হোক, কালের সরণি বেয়ে, সংখ্যার ধারাবাহিকতায় এই টেস্ট যে বিদেশের মাটিতে হবে, সেটি হয়তো মনে ছিল না বিসিবির। একদিক দিয়ে সেটি ঠিক। টেস্ট ক্রিকেট তার জন্মের পরের এই ১৪০ বছরে যে ২২৫৩টি ম্যাচ দেখল, সেখানে বাংলাদেশের ১০০ নিয়ে কার এমন মাথাব্যথা আছে? এটি সংখ্যা, বিশেষ সংখ্যা ছাড়া কিছু তো নয়। বাংলাদেশের শততম টেস্ট, শ্রীলঙ্কার তাতে কী এসে যায়? কোথাও কোনো উত্তেজনা নেই। কলম্বোর বোরেল্লা এলাকায় যেখানে এই মাঠের অবস্থান, তার আশপাশের গাছগাছালি থেকে মাঝে মাঝে কয়েকটি কোকিল যেন কুহু সুরে জানিয়ে দিচ্ছে, এখানেই বাংলাদেশের শততম টেস্ট।
এই স্টেডিয়ামের পুরোনো আভিজাত্য ঝাঁ-চকচকে আধুনিকতার সঙ্গে এখনো মিলতে পারেনি। তা হোক, বেড়ার ফাঁক গলে কিছু দর্শক যদি দেখে, খুপরির মতো জায়গায় বসা কিছু দর্শকের হাততালি কুড়িয়ে মুশফিকের দল যদি কিছু করতে পারে, সেটাই হবে অনেক পাওয়া।
পি সারা আসলে কী উপহার দিতে পারে বাংলাদেশকে? এই মাঠে বাংলাদেশের আগের তিনটি টেস্ট বড় মর্মযাতনা উপহার দিয়েছে। তিনটিতেই ইনিংসে হার। এখানেই ৬২ রানের সর্বনিম্ন টেস্ট ইনিংস।
ইতিহাস এবার না হয় একটু উল্টো পথে হাঁটুক। এটি যে বাংলাদেশের শততম টেস্ট!

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>