কার নিয়ন্ত্রণে লঞ্চের কেবিন?

আপডেট : June, 24, 2017, 12:52 am

রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরতে সদরঘাটে এসেছেন ‍ফরহাদ হোসেন। কিন্তু লঞ্চের কোনও কেবিন না পেয়ে ডেকে বসেই বাড়ি ফিরতে হবে তাদের। কিন্তু তখনই যেন ফরহাদের পুরো পরিবারের জন্য ‘সৌভাগ্য’ নিয়ে এলেন ঘাটের এক নৌ শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে লঞ্চে যাতায়াত করায় ঘাটের কিছু নৌ শ্রমিকের সঙ্গে পরিচয় রয়েছে তার। সঙ্গে মালামাল থাকায় লঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য আগ থেকেই মোবাইল ফোনে একজন কুলির সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

পরিচিত ওই কুলি তাকে দেখেই প্রশ্ন রাখেন, ‘স্যার আপনি কেবিন পাননি?’ ফরহাদ হোসেন জানান, ‘না’। পরে ওই কুলি জানায় তার কাছে দুটি কেবিন রয়েছে। একটার ভাড়া তিন হাজার টাকা। দুইটা নিলে ৫০০ টাকা কম রাখা যাবে। সঙ্গে প্রবাসী বন্ধু থাকায় ফরহাদ দুটি কেবিনই সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া নেন।

ফরহাদ জানান, বিআইডাবিউটিএ’র ঘোষণা অনুযায়ী তিনি ১৫ জুন কেবিন নেওয়ার জন্য সদরঘাটে আসেন। ওই দিন সকাল ৬টায় প্রথমে হাতিয়া রুটের লঞ্চটির বুকিং নাম্বারে ফোন করলে কর্মকর্তারা তাকে আসতে বলেন। পরে সকাল ৭টার দিকে সদরঘাটে এলে কাউন্টার ম্যানেজার জানান ১২ তারিখের আগেই তাদের সব টিকিট শেষ। এর পর হতাশ হয়ে ফিরে যান তিনি।

ফরহাদ বলেন, ‘ঈদ এলেই এভাবেই অনিয়ম করে লঞ্চগুলো। লঞ্চের কুলি ও কর্মচারীরা নামে-বেনামে রেজিস্ট্রার খাতায় বুকিং দেখিয়ে পরে এক একটা কেবিন ৪ থেকে ৫ গুণ টাকায় বেশি করে বিক্রি করে। যে কেবিন দুটি নিয়েছেন তার ভাড়া দুই হাজার টাকার বেশি নয়। কিন্তু নেওয়া হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। কুলিরা ছাড়াও প্রতিটি এলাকার স্থানীয় ক্ষমতাশীন দলের নেতাকর্মীরাও এ কাজটি করে থাকেন। পরিবার পরিজন নিয়ে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত দামে কেবিন

নিতে হয় যাত্রীদের।’

শুধু ফরহাদ উদ্দিনের নয়, এমন অভিযোগ সদরঘাটের অধিকাংশ যাত্রীদের। তারা বলছেন, ‘১৫ জুন থেকে ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বিক্রি হয়ে গেছে দাবি করে লঞ্চগুলো তখন কোনও টিকিটি বিক্রি করে না। ঈদ যাত্রায় বাড়তি টাকা দিলে কেবিন পাওয়া যায়। এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে লঞ্চগুলো। এর সঙ্গে লঞ্চের মালিক-কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘাটের কুলিরা পর্যন্ত জড়িত।’

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লঞ্চের দায়িত্বরত একজন কেবিন মাস্টার বলেন, ‘যে ব্যক্তি এই কেবিন বুকিং দিয়েছে আমরা সে ব্যক্তির লোককেই কেবিন দিয়েছি। এক্ষেত্রে আমরা বুকিং দেওয়া ফোন নম্বরটি সর্বোচ্চ চেক করি।’ অতিরিক্ত দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা কি করবো? এখানে আমাদের করার কিছু নেই’।

তবে বিআইডাব্লিউটিএ নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন  বলেন, ‘এমনটা হওয়ার কথা নয়। আসলে এটা মালিকরাই ভালো বলতে পারবেন। এই প্রশ্নটি তাদের করেন। আমরা তো দেখছি তাদের টিকিটগুলো বুকিং আছে।’

শুক্রবার দুপুরে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি লঞ্চেই কানায় কানায় ভর্তি হয়েছে গেছে। ধারণ ক্ষমতার ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করছে লঞ্চগুলো। পুলিশ ও নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে কিছু লঞ্চ ছেড়ে গেলেও বুড়িগঙ্গার মাঝ পথে নৌকা ও ছোট ছোট ট্রলার দিয়ে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

সদরঘাট বিআইডাব্লউটিএ অফিস সূত্র জানিয়েছে, বছরের অন্যান্য সময় এ টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে প্রায় ৮০টির মতো লঞ্চ ছেড়ে যায়। ঈদ মৌসুমে এর সংখ্যা অনেকটা বাড়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার সদরঘাট থেকে দেড় শতাধিক লঞ্চ ছেড়ে গেছে। আজ শুক্রবার এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এছাড়া ডজলখানেক স্পেশাল সার্ভিসও রয়েছে।

Facebook Comments