কীর্তনখোলার ভাঙনে উদ্বোধণের আগেই বিলীনের মুখে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট

আপডেট : July, 2, 2017, 8:38 pm

গৌতম কুমার দে, বরিশাল: উদ্বোধনের আগেই বিলীনের পথে কীর্তনখোলা নদীর তীরের নগরীর বেলতলা এলাকায় নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। নদীর অব্যাহত ভাঙনে হুমকির মুখে পরে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সম্পদ গচ্ছা যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন সচেতন মহল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্লান্টের নদীর বাউন্ডারি সংলগ্ন দুইটি ভবন বিলীনের পথে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বেলতলা এলাকায় নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি বিলীনের আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্লান্ট নির্মাণের কাজ ১০ মাস পূর্বেই শেষ হয়েছে। অদ্যবধি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এই দুইটি দপ্তরের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ যুক্ত হয়ে ত্রি-মুখী লড়াইয়ে প্লান্টের কাজ শেষ হলেও চালু করা সম্ভব হয়নি। চরম অনিশ্চয়তার মাঝে থেকে এ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সুপেয় পানি নগরবাসীর ভাগ্যে জুটবে নাকি তার আগেই কীর্তনখোলার অথৈ পানিতে হারিয়ে যাবে তা নিয়ে চরম শঙ্কা বিরাজ করছে। নদী ভাঙনের কবল থেকে প্লান্টটি রক্ষায় ইতোমধ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড ১০ হাজার করে মোট ২০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। যা কোনো কাজেই আসেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নগরবাসীর পানি সংকট নিরসনে ২০১২ সালে কীর্তনখোলা নদীর তীরে বেলতলায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এবং ২০১৩ সালে নগরীর রূপাতলীতে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পৃথক দুটি সারফেজ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ শুরু করা হয়। কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী এ প্লান্ট দুইটি চালু হলে এক কোটি ৬০ লাখ করে প্রতিদিন তিন কোটি ২০ লাখ লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
প্লান্ট দুইটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, এলজিইডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ প্রকল্পের আওতায় সারফেজ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নানান জটিলতায় প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই দীর্ঘসময় পার হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্লান্ট দুইটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। আদৌ এর সুফল পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও নগরবাসীর মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকায় থাকা এ প্লান্ট সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম জানান, কীর্তনখোলা নদীর অব্যাহত ভাঙনে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নদী সংলগ্ন গাইড ওয়াল

ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে, প্লান্টের সীমানার ভিতরে থাকা বালুর স্তরও ধুয়ে ও মাটি ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা বাঁধের চারশ’ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হলে প্লান্টটি রক্ষা পেত। কিন্তু বর্ষা মৌসুমের পূর্বে ওই প্রকল্পের কাজ চালু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সেক্ষেত্রে বর্ষকালে এ প্লান্টটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণর মধ্যে রয়েছে। প্লান্ট চালু না হওয়ার জন্য তিনি সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করে বলেন, ১০ মাস পূর্বে এ প্লান্ট নগর ভবনের বুঝে নেয়ার কথা। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত প্লান্টে বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত আনতে পারেনি।
সংযোগ না দেয়ার ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, সিটি কর্পোরেশনের কাছে তাদের ২৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় তারা এ প্লান্টে সংযোগ দিচ্ছেন না। নগর ভবনকে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের একটি অংশ পরিশোধের শর্ত দেয়া হলেও তারা দুই কোটি টাকার স্থলে মাত্র ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। তবে ভিন্ন সুরে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (পানি) মনিরুল ইসলাম স্বপন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এ প্লান্ট আমাদের কাছে চালু অবস্থায় হস্তান্তর করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ১০ মাসেও বিদ্যুৎ সংযোগ আনতে ব্যর্থ হওয়ায় প্লান্ট চালু করাসহ আমাদের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, নদী ভাঙনে বর্তমানে এ প্লান্ট অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙনের কবল থেকে প্লান্ট রক্ষায় নদী ভাঙন প্রতিরোধ জরুরি বলেও নগর ভবনের এ প্রকৌশলী উল্লেখ করেন।
নদী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাইদ জানান, চরবাড়িয়ার ওই ভাঙন কবলিত এলাকায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণে তাদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। তিনি জানান, কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী এলাকায় সাড়ে চার কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রায় চারশ’ কোটি টাকার শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশন ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। এখন প্রি-একনেক ও একনেকের সভায় পাস হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। এজন্য সময় লাগবে। অপেক্ষা ছাড়া এই মুহুর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছুই করার নেই।
সচেতন নগরবাসীর মতে, ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়নের আগেই সরকারের ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বেলতলা, চরআবদানী ও পলাশপুরের বিশাল এলাকাসহ অসংখ্য স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

Facebook Comments