কোন খাতে কত ভ্যাট

জুলাই ০৫ ২০১৭, ২৩:৪৯

গত ১ জুলাই থেকে সব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও আগামী দুই বছর তা হচ্ছে না। ফলে বিগত দিনগুলোর মতোই আগামী দুই বছর প্যাকেজ ভ্যাটই বহাল থাকছে। একইভাবে পণ্য ভেদে একাধিক হারে ভ্যাট আদায় করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআই’য়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগের মতোই বিভিন্ন স্তরে ভ্যাট থাকবে। নতুন করে কোনও পণ্যে ভ্যাট বাড়ার সুযোগ নেই। এখন প্যাকেজ ভ্যাটই বহাল থাকবে।’
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক টার্নওভারযুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট দিতে হবে। এর মধ্যে কোনও প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে দেড় শতাংশ হারে, কোনও প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে ৩ শতাংশ হারে। কারও কারও জন্য এই ভ্যাট ৫ শতাংশ, কারও দিতে হবে ৬ শতাংশ, আবার কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানকে ১০ শতাংশ হারেও ভ্যাট দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি ২৪ ধরণের সেবায় ভ্যাট দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে।
এনবিআর জানায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাজ-সজ্জা অর্থাৎ ডেকোরেটার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে ১ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করলে তাদের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। একইভাবে খাবার যদি কেউ সরবরাহ দিয়ে যায়, তাহলে এ ধরনের সেবা ‘ক্যাটারার্স’ সেবা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ক্যাটারার্স সেবার ওপর ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। শব্দ ও আলোক সরঞ্জাম ভাড়া প্রদানকারীকেও দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট।

দেশের গণমাধ্যম তথা মিডিয়া ভুবনের বড় ব্যবসা বিজ্ঞাপনি সংস্থাগুলোকে গুণতে হবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট। অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম, কনসালটেন্সি ফার্ম ও সুপারভাইজরি র্ফামকেও দিতে হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এছাড়া ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, ইন্ডেন্টিং সংস্থা, জরিপ সংস্থা, মূলধনী যন্ত্রপাতি ভাড়া প্রদানকারী সংস্থা, নিলামকারী সংস্থা ও বিভিন্ন ধরণের ছাপাখানাকে দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট।

সব ধরনের কুরিয়ার সার্ভিস ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসকে দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট। তাপানুকূল বা এসি বাস সার্ভিস যিনি পরিচালনা করেন তাকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া ইজারাদার ও পণ্যের বিনিময়ে করযোগ্য পণ্য মেরামত বা সার্ভিসিং কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকেও দিতে হবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট।

এর বাইরে সিকিউরিটি সার্ভিস, আইন পরামর্শক যানবাহন ভাড়া প্রদানকারী সংস্থা, আর্কিটেক্ট, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার বা ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম, বোর্ডসভায় যোগদানকারী, বিজ্ঞাপন প্রচারকারী, বিমান বা হেলিকপ্টার ভাড়া প্রদানকারী, ভবন মেঝে ও অঙ্গন পরিস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণকারী, লটারির টিকিট বিক্রয়কারী, অনুষ্ঠান আয়োজক, মানবমসম্পদ সরবরাহ বা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, স্পন্সরশিপ সেবা ও অন্যান্য বিবিধ সেবায় ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। ‘অন্যান্য বিবিধ সেবা’র আওতায় অন্তর্ভুক্ত ফাস্ট ফুডে ভ্যাট ১৫ শতাংশ, সিমকার্ডে ১৫ শতাংশ

ভ্যাট দিতে হবে। কোচিং সেন্টারের ওপর বর্তমানে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ।

এছাড়া বাড়ি ভাড়ার ওপর ভ্যাট দিতে হবে ৯ শতাংশ হারে। জুয়েলারি ব্যবসা, যোগানদারী ব্যবসা ও বিদ্যুৎ বিলে দিতে হবে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট। নির্মাণ সংস্থাগুলোকে দিতে হবে ৬ শতাংশ হারে। ভূমি উন্নয়ন সংস্থাকে ভ্যাট দিতে হবে ৩ শতাংশ হারে। আসবাবপত্র উৎপাদন পর্যায়ে দিতে হবে ৬ শতাংশ হারে। আসবাবপত্র বিপণন ও সুপার সপগুলোকে দিতে হবে ৪ শতাংশ হারে। তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর সেবায় দিতে হবে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে।

ভ্যাট আদায় করা হয় মূলত পণ্য এবং সেবার ওপর। পণ্যের ওপর ভ্যাট আদায় করা হয় তিনটি পর্যায়ে, (১) আমদানি পর্যায়; (২) উৎপাদন পর্যায়; এবং (৩) ব্যবসায়ী পর্যায়। ব্যবসায়ী পর্যায়ের মধ্যে ভ্যাট আদায় হয় পাইকারি পর্যায় ও খুচরা পর্যায়। আমাদের দেশে ব্যবসায়ি পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের জন্য কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। (১) মূল্য ঘোষণা প্রদান করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদানকারী ব্যবসায়ী যারা উপকরণ কর রেয়াত পাবেন; (২) মূল্য ঘোষণা প্রদান না করে ৪ শতাংশ ভ্যাট প্রদানকারী ব্যবসায়ী যারা উপকরণ কর রেয়াত পাবেন না; (৩) প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট প্রদানকারী ছোট ছোট দোকান; এবং (৪) আমদানির পর প্রথম বিক্রির ক্ষেত্রে যদি ২৬.৬৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন হয়, তাহলে আমদানি পর্যায়ে ৪ শতাংশ অগ্রিম প্রদত্ত ভ্যাট চূড়ান্ত বিবেচনা করে বিক্রয়কারী ব্যবসায়ী।

বর্তমানে আমাদের দেশের ব্যবসায়ী পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পদ্ধতি, ৪ শতাংশ ভ্যাট পদ্ধতি এবং প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতি এই তিনটি পদ্ধতি চালু আছে। যেসব ছোট ছোট দোকান প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার ছোট ছোট দোকান বছরে ১৪ হাজার টাকা। দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকার ছোট ছোট দোকান বছরে ১০ হাজার টাকা। জেলা শহরের পৌর এলাকায় অবস্থিত ছোট ছোট দোকান বছরে সাত হাজার দুইশত টাকা এবং অন্যান্য এলাকার ছোট ছোট দোকান বছরে তিন হাজার ছয়শত টাকা ভ্যাট দেবে। কোন কোন দোকান প্যাকেজ ভ্যাট প্রদান করবে তা স্থানীয় দোকান মালিক সমিতির নেতারা এবং স্থানীয় ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তারা মিলে অর্থবছরের প্রারম্ভে নির্ধারণ করেন।

প্রসঙ্গত, ব্যবসায়ীদের প্রবল আপত্তির মধ্যেও গত ১ জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করার লক্ষ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য বাজেট সংসদে প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর থেকে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা আসবে বলে ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে ভ্যাট আইন কার্যকর দুই বছর পিছিয়ে দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন  নিয়ে বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>