ক্ষমতা চাই কিন্তু ভোট চাই না?

আপডেট : June, 4, 2017, 6:13 pm

ভোটের বাজেটই ভালো বাজেট—এমন ধারণা অনেকের। তো এবারের বাজেট কি ভোটমুখী? ‘ভ্যাট-ভোটের টানাপোড়েনের বাজেটে’ কে জিতল: অর্থ আদায়ের ভ্যাট, নাকি ভোটপ্রিয় পদক্ষেপ? কোন ঘাটতি আগে মেটাবে সরকার: কোষাগারের রুগ্‌ণতা, নাকি জনপ্রিয়তার অভাব? কেমনই-বা হবে সেই ভোট? ২০০৮-এর যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছিল, তার মতো? নাকি ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির যে বিতর্কিত নির্বাচনে সরকার দ্বিতীয় মেয়াদের ‘সুযোগ’ নিল, তার মতো? আগামীতে কেমন নির্বাচন আমরা পেতে যাচ্ছি, বর্তমান বাজেটে তার উত্তর আছে। ভালো নির্বাচন আর ভালো বাজেটের মধ্যে সম্পর্ক আছে। তা চেনারও উপায় আছে।

ভালো নির্বাচনের দিন ভোটাররা ‘অ্যাকশনে’ থাকেন, অশুভ শক্তি থাকে দর্শকের ভূমিকায়। খারাপ নির্বাচনে ভোটাররা হয়ে পড়েন অসহায় দর্শক। কেননা অশুভ শক্তি থাকে পরিপূর্ণ অ্যাকশনে। ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে বসে সবাই টেলিভিশনে দেখে ভোট হচ্ছে, গণনা হচ্ছে, জয় হচ্ছে— অথচ জনগণ হেরে যাচ্ছে।

ভালো বাজেটে জনগণের আশা-ভরসার প্রতিফলন থাকে। কিন্তু যে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিতর্কিত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গঠিত, তার বাজেট জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে তৈরি হয়। করার মালিক করে যান, দেখার মালিক আমজনতা শুধুই দেখে যান। আর অর্থমন্ত্রী মহোদয় কথার ফুলঝুরি দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ভাগ্যলিখন একাই পাঠ করে যান। এই প্রক্রিয়ায় জনগণ বেকার বলেই তো সরকার ভ্যাট বাড়ায়, গ্যাস-বিদ্যুৎ-খাদ্যের দাম বাড়ানোর লোভ চাপা দেয় না। বেকারত্ব ঘোচানোর জন্য শিল্পকারখানা বসানো হয় না। প্রবাসী আয় কমে আসা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনার ব্যবস্থা করে না। হাওরে কৃষি বিপর্যয় সামলে ওঠার জন্য বরাদ্দ দিতে ভুলে যায়। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কিংবা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন কিংবা ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলের অঙ্গীকারও বাজেট বক্তৃতায় বাদ পড়ে যায়।

আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত হলো দুই বেচারা, অন্য খাতের খরচ তাদের মেটাতে হয়। এবার যেমন শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি খাতকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সব মন্ত্রণালয়ই প্রযুক্তি খাতে ব্যয় করবে, কিন্তু খরচ দেবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি নামের যৌথ খাত। প্রাচীন গণিতবিদ শুভংকরও এত চালাকি জানতেন কি না, সন্দেহ। এবারও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলো না। ভোর দেখে দিনের আভাস পাওয়া যায়। অর্থমন্ত্রীর জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেটে দেখা যায় জনগণের জীবনের শ্রেষ্ঠ ভোগান্তির আভাস।
বাজেট অগণমুখী হলে বুঝতে হবে যে সরকার আগামী নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের মনপসন্দ বাজেট দিত। জনতুষ্টিবাদী সরকারের এই উল্টা চালের অর্থ একটাই। এখনই ভোটারদের মনজয় করবার দরকার তাঁদের পড়ছে না।

রাজনীতির রিমোট কন্ট্রোল যখন সরকারের হাতে, তখন জনগণের হাতে থাকবে শুধু টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোলের সুইচ। ভালো না লাগলে সরকার বদলাতে না পারুন, চ্যানেল বদলানোর অবাধ স্বাধীনতা আমাদের থাকবে। এ জিনিস কেউ আমাদের থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। পাঠক, আবারও বাজেটের দিকে তাকান। জটিল পরিসংখ্যানের বীজগণিতটা সরিয়ে হিসাবটা সরল করে আনুন। পাটিগণিতের একটা ঐকিক অঙ্ক করুন।

এই বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে কোন চার খাত? বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, প্রতিরক্ষা এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই চার খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। এটা মোট বাজেটের প্রায় ৩৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। দেশে বর্তমানে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। বাজেটের ২২ শতাংশ ব্যয় হবে তাঁদের জন্য। গত বছরের

চেয়ে এই অঙ্ক ২৬ শতাংশ বেশি! মাত্র ১৪ লাখের জন্য যদি ২২ শতাংশ ব্যয় হয়, তাহলে কী রইল বাদবাকি জনগণের ভাগ্যে? মোট কর্মহীন মানুষের যে ষাট শতাংশ যুবক, তাদের কী রইল? কী রইল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য?

বৈধতার সংকটে থাকা সরকার চালাতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে খুশি রাখতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে লুটপাট ও দুর্নীতিনির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থা। তার জন্য আরও বেশি ঋণ করে যেতে হবে। করের টাকা, ভ্যাটের টাকা, ঋণের টাকায় চলবে নিম্নতম সুশাসন ও উচ্চতম দুর্নীতি, কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এবং স্বল্প গণতন্ত্রে অধিক অবিচারের রাজনীতি। যখন প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছিল, তখনও বছরে চল্লিশ লাখ কর্মসংস্থান হতো, এখন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে হচ্ছে মাত্র ২৬ লাখ!

দেশি-বিদেশি ঋণের সুদবাবদ বর্তমানে বাজেটের ১৭ শতাংশ চলে যাচ্ছে। নতুন আরও ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের টার্গেট নেওয়া হয়েছে। সুতরাং আগামীতে সুদ-আসল ফেরত বাবদ প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাঁধে সিন্দাবাদের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করায়, এসব ঋণের সুফল তারা পাবে না। কর্মসংস্থানহীন এ প্রবৃদ্ধি তরুণদের আশা দেখায় না। প্রবাসীদের বড় অংশটাই যুবক বয়সী, ব্যাংকে লাখ টাকার ওপর আবগারী শুল্ক বসানোয় তারা ব্যাংকের বাইরে ছায়া অর্থনীতির আশ্রয় নেবে।

অন্যদিকে লুটপাটনির্ভর খাতগুলো এ বাজেট থেকেও পরিপুষ্ট হচ্ছে। গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ জানাচ্ছে, ‘২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে মোট পাচারের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। পাচার হওয়া ওই সব সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকারের কোনো উদ্যোগের কথা মন্ত্রীর বক্তব্যে নেই। কিন্তু নানা কৌশলে কথিত ঋণ খেলাপের মাধ্যমে দেউলিয়া হতে যাওয়া রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠনে বাজেটে আবারও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। এই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে বর্তমান অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ১৪ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন। এ পর্যন্ত খেলাপিতে পরিণত হওয়া এবং অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।’
ভারত-চীনের চেয়ে ১০ গুণ ব্যয়ে সড়ক-সেতু বানানোর খেসারত, অঢেল দুর্নীতির খেসরাত তো জনগণকেই দিতে হবে। জনগণের বড় অংশ হলো তরুণেরা। তারা ক্ষমতা না, সকল অক্ষমতার উৎস, সকল সম্পদহরণের শিকার। সুশাসনবিরোধী প্রশাসন চালানোর জন্য, দুর্নীতির গর্ত পূরণের জন্য, ঋণ করে ঘি খাওয়া এবং রাজনৈতিক সুবিধা বিতরণের তহবিল জোগানোর জন্য আর কে আছে এমন জনগণ ছাড়া?

যদি আগামীতে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আসত, তাহলে ভোগ-সুদ-দুর্নীতির খাতের (বেতন-ভাতা-ঋণের সুদ-ভর্তুকি ও প্রণোদনা) বদলে বেশি গুরুত্ব পেত জনকল্যাণকর খাত। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খরুচে প্রকল্পের দেশই যে সবচেয়ে বেশি হারের ভ্যাটের দেশ হবে, সে দেশে কর্মহীন মানুষের ৬০ শতাংশই যুবক হবে এবং সামাজিক খাতে ব্যয় হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের চেয়ে ‘ব্যক্তিগত ব্যয়’ বাড়তে থাকবে, রাজধানীর জীবনযাত্রার মান হবে নিকৃষ্ট কিন্তু ব্যয় হবে বিশ্বের মধ্যে প্রথম সারিতে। এর সবই স্বাভাবিক। এভাবেই লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে যাবে। কথায় বলে, মরা রে মারো ক্যা? উত্তর: নড়েচড়ে ক্যা? এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, যেখানে সবলেরা দুর্বলের ওপর এমনভাবে চেপে বসতে পারে!
এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রীর ‘শ্রেষ্ঠ বাজেটে’ ভরসা করে মালয় দ্বীপের সেই শেয়ালের মতো হব কি? যে কিনা মুরগি এঁকে দেয়ালে, আপন মনে চাটতে থাকে খেয়ালে!

Facebook Comments