খুনের পর দুধ দিয়ে গোসল করতেন এরশাদ শিকদার

মে ১০ ২০১৭, ১৬:৩৯

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেকেই সিরিয়াল কিলিংয়ের খাতায় নাম লিখে জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। নানাভাবে হত্যাকাণ্ড ও তার আগে নির্যাতনে পিছপা হয়নি এই কিলাররা। এসব খুনের পেছনে মানসিক অসুস্থতা এবং দীনতাই দায়ী। বাংলাদেশে খোঁজ পাওয়া সিরিয়াল কিলারদের কারো ফাঁসি হয়েছে, কারো নামে মামলা চলছে আবার অনেকেই আইনি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে। গত পর্বে দেশের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর সম্পর্কে জেনেছেন। এই পর্বে পাঠকদের জন্য থাকছে ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের গল্প।

এরশাদ শিকদার

শতাব্দীর ভয়ঙ্কর খুনি এরশাদ শিকদার প্রতিটি খুনের পরই দুধ দিয়ে গোসল করে পবিত্র হতেন। তবু নিজের পাপকে ঢাকতে পারেননি খুলনার কুখ্যাত এই সিরিয়াল কিলার। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে তাকে।

এরশাদ শিকদারের নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ যে সেসব খুনের বর্ণনা দেওয়াও লোমহর্ষক ব্যাপার। আস্তে-ধীরে রয়ে-সয়ে কষ্ট দিয়ে নিজের শিকারকে খুন করতেন তিনি। তার বরফকলে যার ডাক পড়তো, তিনি আর কখনোই সেখান থেকে জীবিত বের হতে পারতেন না। এদের অধিকাংশের লাশও আর খুঁজে পাওয়া যেত না।

হাত-পা বাঁধা শিকারের পা চেপে ধরে রাখতেন এরশাদ শিকদার। আরেকজন বড় হাতুড়ি দিয়ে পায়ের ওপর পিটিয়ে যেতেন অবিরাম। শিকারের দুই পায়ের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হলে পরে একটি রশি নিয়ে রক্তাক্ত শিকারের গলায় পেঁচিয়ে ধরে টান দিতেন নরপিশাচ এরশাদ। ততক্ষণে মানুষটির নাক-মুখ ও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বোঝা যাচ্ছে তার দেহে প্রাণ নেই। তবু থামতেন না মানুষরূপী দানবটি।

মেঝের উপর পড়ে থাকা নিথর দেহের বুকের উপর উঠে দাঁড়িয়ে লাফাতে শুরু করতেন। পাঁজর ভাঙার শব্দ হলে শান্ত হতেন এরশাদ। লাশ জমাটবাঁধা সিমেন্টের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে ফেলে দেওয়া হতো ভৈরব নদে। ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ হত্যার পর খাঁটি দুধ দিয়ে গোসল করে ‘পবিত্র’ হতেন এরশাদ।

তার সহযোগী ও পরবর্তীতে মামলার রাজসাক্ষী নূরে আলমের মতে, এরশাদ শিকদার কমপক্ষে ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে তিনি ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন।

কুখ্যাত খুনি এরশাদ শিকদার তার রাজত্বকালে রূপসার যুবলীগ কর্মী খালিদ; দৌলতপুরের অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবীর ফটিক; সোনাডাঙ্গার ইনসাফ, কামাল, খালেক; সেনহাটির টাক আজিজসহ আরও অনেককে হত্যা করে জমাট সিমেন্টের বস্তায় বেঁধে ভৈরব নদে ফেলে দেন। এর মধ্যে শুধু খালিদের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদের লাশ পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরিধেয় কাপড় আর কিছু হাড় পরবর্তীতে পুলিশ উদ্ধার করে। খুলনার এই ডন নিয়ন্ত্রণ করতেন আন্ডারওয়ার্ল্ড।

আলোচিত এই ক্রমিক খুনির জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা

গ্রামে। তার পিতার নাম বন্দে আলী। নৃশংস এই সিরিয়াল কিলারের কুলি থেকে ধনাঢ্য হবার কাহিনীর অধিকাংশ অক্ষরই রক্তে লেখা। খুন ছাড়াও অন্যান্য অত্যাচার, চুরি-ডাকাতি ও নানান অপরাধের জন্য কুখ্যাত এই খুনি ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে জন্মস্থান ছেড়ে খুলনায় আসেন এবং রেলস্টেশনে কুলির সহকারী হিসেবে কাজ নেন।

কালক্রমে তিনি রেললাইনের পাত চুরি করে অবৈধভাবে বিক্রি করার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একসময় তিনি নিজেই তাদের নিয়ে নতুন দল গঠন করে ও রাঙ্গাচোরা নামে পরিচিতি পান। ১৯৭৬-৭৭ সালে রামদা বাহিনী গঠন করে ডাকাতি, রাহাজানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর ওই বাহিনী নিয়েই ১৯৮২ সালে ৪ ও ৫ নং ঘাট এলাকা দখল করে তার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনৈতিক ব্যাপারে তিনি ছিলেন যথেষ্ট সুবিধাবাদী, যখন যে দল সরকার হিসেবে নির্বাচিত হতো, সেখানে যোগ দিতেন এই খুনি। ভয় দেখিয়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে এরশাদ রাজনৈতিক সুবিধা ও সমর্থন আদায় করতেন। খুলনার বরফকল মালিক রফিককে ভয় দেখিয়ে বিতাড়িত করে মানুষকে সেখান থেকে বরফ কিনতে বাধ্য করেন এবং বরফকলকে তার নির্যাতনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করে। ওই বরফকলে টর্চার সেল গড়ে তোলেন এরশাদ শিকদার। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যে-ই তার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতেন তাকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে দ্বিধা করতেন না তিনি। যাকে ভালো লাগতো তাকেই তুলে এনে নির্যাতন করতেন এই এরশাদ শিকদার। এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবেও তার খুন করার নজির আছে।

তার এক হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষীর মতে, ১৯৯৯ সালের ১৫ মে খালিদ হোসেন নামে এক যুবলীগ নেতাকে নির্মমভাবে পেটানোর পর তার বুকের ওপর নিজে লাফিয়ে পড়েন এই খুনি। এতে পাঁজরের সব হাড় ভেঙে মৃত্যু হয় তার। এ হত্যাকাণ্ডে তার সহযোগী ছিল জামাই ফারুক ও লিয়াকত লস্কর। ১৯৯৯ সালের ১১ আগস্ট গ্রেফতার হন এই খুনি। গ্রেফতারের সময় তার নামে ৪৩টি মামলা হয়েছিল।

৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের মধ্যে এই খুনি ১৮টি কেসে বেকসুর খালাস পেলেও ৭টি মামলায় তার ফাঁসির সাজা হয় এবং চারটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়। তার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন তার সহযোগী নূরে আলম। শিকদারের কাছে ৭০টি আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা নূরে আলম জানালেও এরশাদের বাড়ি স্বর্ণকমল থেকে মাত্র একটির সন্ধান পাওয়া যায়। ঘৃণ্য অপরাধী ও নৃশংস এই খুনির করা প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতি নাকচ করে দেন। ২০০৪ সালের ১০ মে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মাধ্যমে অবসান ঘটে ত্রাসরূপী এই পিশাচের।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>