গাড়িচালক ও দেহরক্ষীকে মুখোমুখি করা হবে সাফাত-সাদমানের

মে ১৭ ২০১৭, ০৯:৫০

বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ মামলায় আসামি গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আজাদকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলার আসামি বিল্লালের চার দিনের এবং আবুল কালাম আজাদ ওরফে রহমত আলীর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম লস্কর সোহেল রানা তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ মামলায় ইতিমধ্যে রিমান্ডে থাকা সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফের মুখোমুখি করা হবে বিল্লাল ও আজাদকে। বিল্লাল সাফাতের গাড়িচালক, আজাদ তার দেহরক্ষী।

ধর্ষণের ঘটনায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেছে বনানীর রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ। সকাল ১১টার দিকে ওই হোটেলেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। তারাও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছে। আর মামলা নিতে গড়িমসিসহ ভুক্তভোগীদের হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত টিম।

গত সোমবার রাতে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। মহাখালী এলাকা থেকে আজাদকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিমান্ড মঞ্জুর শেষে গতকাল সন্ধ্যায় বিল্লাল ও আজাদকে আদালত থেকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ওই সময় সাফাত ও সাদমান ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা কার্যালয়ের একটি কক্ষে ছিল। বিল্লাল ও আজাদকে দেখে তারা চমকে ওঠে। সেখানে তাদের মধ্যে কিছু কথাও হয়েছে। এরপর তাদের আলাদা কক্ষে নেওয়া হয়। চারজন যখন মুখোমুখি অবস্থায় ছিল তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, রাতে (মঙ্গলবার) চার আসামিকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

র‌্যাব ১০-এর পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বিল্লাল ধর্ষণ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানায়। র‌্যাবের কাছে দেওয়া তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্তে তার তথ্য বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সাফাত ও সাদমানকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে বিল্লাল র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। সে দাবি করেছে, ধর্ষণের ঘটনায় সাফাতরা সবাই জড়িত।

এ মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে এখনো দ্বিতীয় আসামি নাঈম আশরাফ ধরা পড়েনি। তার অবস্থান সম্পর্কেও সঠিক কোনো তথ্য নেই তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে। নাঈম আশরাফ ভারতে পালিয়ে গেছে বলে কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে—এ বিষয়ে গতকাল জানতে চাইলে ডিবির উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, নাঈম ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে। তার অবস্থান সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে। তাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।

রেইনট্রি কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন : সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রেইনট্রি হোটেলের অর্থায়নকারী হুমায়রা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মস্তফা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন রেইনট্রি

হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচ এম আদনান হারুন। তিনি ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বি এইচ হারুনের ছেলে। তিনি ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, তাঁদের হোটেলটি ‘সফট ওপেনিং’ পর্যায়ে (পুরো কার্যক্রম নয়) আছে। ঘটনার দিন হোটেলের ৭০০ ও ৭০১ নম্বর সুইট ভাড়া নিয়েছিল সাফাত। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হোটেলে অবস্থান করেছিলেন হোটেলের মহাব্যবস্থাপক ফ্র্যাংক ফরগেট। ওই সময় পর্যন্ত তিনি হোটেলে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেননি। তবে তাঁর অজান্তেই ঘটনার দিন কিছু ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে। তবে এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেইনট্রি হোটেলই। তাঁদের বিশ্বাস, অপরাধীদের শাস্তি হবেই।

এর আগে হোটেল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, মামলার বাদী হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। ঘটনার পরদিন সকালে তাঁরা বেরিয়ে গেছেন। গতকাল এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আদনান হারুন বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। এ নিয়ে তিনি কিছু বলবেন না। হোটেলে কোনো অপরাধ হয়েছে কি না তা আদালতে প্রমাণিত হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করছে।

সেদিন জন্মদিনের অনুষ্ঠান কতক্ষণ হয়েছিল জানতে চাইলে কোনো জবাব দেননি আদনান হারুন। তবে তদন্তাধীন বিষয়ে কেন ব্রিফিং করা হচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের পাশাপাশি ব্রিফিংয়ের আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ থাকে হোটেল কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের আরো অনেক প্রশ্নের একপর্যায়ে তাঁরা উঠে চলে যান।

ধর্ষণের ঘটনার পর বনানী থানায় মামলা গ্রহণে গড়িমসি ও তরুণীদের হয়রানির অভিযোগ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল ফের বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ফরমান আলী কমিটির কাছে তাঁর লিখিত বক্তব্যে মামলা নিতে দেরির কারণ হিসেবে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল বলেও উল্লেখ করেছেন। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) মিজানুর রহমান।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপালেন ওসি : অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে গতকাল বনানী থানার ওসি ফরমান আলী লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, লিখিত বক্তব্যে ওসি মামলা গ্রহণে বিলম্ব হওয়ার দায় পুলিশের গুলশান বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়েছেন। ওসি দাবি করেছেন,  ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ না পাওয়ায় মামলা নিতে বিলম্ব করেছেন। এ ধরনের মামলা নেওয়ার আগে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছিলেন। তবে আসামিদের কাছ থেকে তিনি ২৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেননি।

তদন্ত কমিটির একটি সূত্র জানায়, ওসি ৪ মে ও ৫ মে পর্যন্ত অভিযোগকারীদের মামলা গ্রহণ করেননি। ৬ মে বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অভিযোগকারী দুই ছাত্রীকে থানায় বসিয়ে রাখেন। রাত ৯টার পর গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল আহাদ থানায় যান। কেন একজন অভিযোগকারীকে দুই দিন ধরে থানায় হয়রানি করা হচ্ছে—অতিরিক্ত উপকমিশনারের এমন প্রশ্নের মুখে ওসি মামলা গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ওই দিন রাত ১০টায় ওসি থানায় মামলা গ্রহণ করেন বলে তদন্ত কমিটি তদন্তে প্রমাণ পেয়েছে।

 

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>