গুলশান হামলার গ্রেনেড প্রশিক্ষণ বুড়িগঙ্গায়

জুলাই ৩০ ২০১৭, ০৯:২৯

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আসলাম হোসাইন মোহন ওরফে আবু হাররা ওরফে রাশেদুল ইসলাম জঙ্গিদের গ্রেনেড ছুঁড়ে মারার প্রশিক্ষণ দেয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। হলি আর্টিজানে হামলার কয়েকদিন আগে এক রাতে রাশেদ সদরঘাট থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে। রাশেদের সঙ্গে ছিল হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের মধ্যে মীর সামীহ মুবাশ্বীর ও রোহান ইবনে ইমতিয়াজ। ট্রলারটি পোস্তগোলা ব্রিজ অতিক্রম করার সময় র্যাশ তার ব্যাগ থেকে কয়েকটি গ্রেনেড বের করে। তাদের রাশেদ গ্রেনেড নিক্ষেপের কৌশল দেখিয়ে দেয়। এ সময় রাশেদ একটি গ্রেনেডের চাবি খুলে বুড়িগঙ্গা নদীতে ছুঁড়ে মারে। নদীর পানি স্পর্শ করার মুহূর্তে গ্রেনেডটি। অপেক্ষাকৃত কম শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এ সময় ট্রলারের মাঝি বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদের নামিয়ে দেয়ার কথা বলেন। এতে রাশেদ ট্রলারের মাঝিকে হুমকি দেয় যে এ ঘটনা কাউকে জানালে তাকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর কাউন্টার টেররিজম ইউনিট বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে ট্রলারের ওই মাঝির কাছ থেকে এমন তথ্য পায়। পরে গত শুক্রবার নাটোর থেকে র্যাশকে গ্রেফতারের পর তাকে ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য পেয়েছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা। গতকাল ঢাকা মেট্রাপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাশ সম্পর্কে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, নব্য জেএমবির নেতা রাশেদ ওরফে র্যাশকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য সংগ্রহের পরই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। তিনি বলেন, রাশেদকে গ্রেফতার করায় গুলশান হামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হলি আর্টিজানে হামলার চার্জশিট প্রস্তুত করা হবে।

মনিরুল জানান, রাশেদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে যে অস্ত্রগুলো এনেছে তার মধ্যে রয়েছে ৪টি নাইন এমএম পিস্তল ও ৮টি ম্যাগাজিন। একটি পিস্তল রাশেদ তার কোমরে করে নিয়ে এসেছিল। বাকি অস্ত্র ফলের ঝুড়িতে করে নিয়ে আসে। রাশেদ নিহত জঙ্গি জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর খুব বিশ্বস্ত হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে অস্ত্র আনার দায়িত্ব তার ওপর ছিল। তারপর কল্যাণপুর থেকে সেই অস্ত্র বাশারুজ্জামান চকলেট বসুন্ধরার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ। পুলিশের কাছেও এ সব তথ্য স্বীকার করেছে রাশেদ।

মনিরুল ইসলাম আরো জানান, কাজের দক্ষতার বিচার বিশ্লেষণ করে রাশেদকে বড় পদে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তামিম। কিন্তু তামিম নিহত হওয়ায় তার আর বড় পদে যাওয়া হয়নি। তখন মাইনুল ইসলাম মুসা নব্য জেমবির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। মুসার দায়িত্ব নেওয়ার

পর থেকেই তাদের সঙ্গে রাশেদের দূরত্ব বেড়ে যায়। রাশেদের মন অনেকদিন খারাপ থাকার পর সংগঠনের পুরাতন সদস্য ও নতুনদের নিয়ে দল গোছানোর চেষ্টা করে বলেও জানান মনিরুল ইসলাম।

জঙ্গি রাশেদের বরাত দিয়ে মনিরুল ইসলাম জানান, নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরকেও আজিমপুরের বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল রাশেদ।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম জানান, হলি আর্টিজান হামলায় অংশগ্রহণের জন্য রাশেদকেও রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রধান সমন্বয়ক রাশেদকে অন্য অপারেশনের কাজে নিয়োজিত করবে বলে শেষ মুহূর্তে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের জঙ্গি আস্তানায়ও রাশেদের আসা-যাওয়া ছিল বলেও জানান তিনি। গাজীপুরের দুটি বাড়িতে অভিযানের পরপরই রাশেদ আবার উত্তরাঞ্চলে আত্মগোপন করেছিল।

নব্য জেএমবিতে অন্তঃকলহ: কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের বলেন, আস্থাহীনতার কারণেই সংগঠিত হতে পারছে না নব্য জেএমবি সদস্যরা। নব্য জেএমবিতে প্রচণ্ড অবিশ্বাস থেকেই তাদের মধ্যে অন্তঃকলহ শুরু হয়েছে। এই কলহের কারণে হলি আর্টিজান হামলার মামলার অন্যতম পলাতক আসামি হাদিসুর রহমান ওরফে সাগরকে খুঁজে পেলে তাকেও হত্যা করতে পারে জেএমবি। এর আগে পুরনো জেএমবি সদস্যরা তাদের ৫/৭ জনকে মেরে ফেলেছে। এদের মধ্যে নজরুল ছাড়া আর বড় মাপের তেমন কেউ ছিল না।

হলি আর্টিজান হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশ, দল বা সংস্থার সম্পৃক্ততা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত চলছে। আইএস’র যেমন নির্দিষ্ট কোনো আইডিওলজি নেই, পুরনো বা নব্য জেএমবির তেমন কোনো নির্দিষ্ট আইডিওলজি নাই। এরা ভবিষ্যত্বাণী দিয়ে বিভিন্ন মানুষকে বিশেষ করে যারা ধর্ম সম্পর্কে কম জানেন তাদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করতো। মূল ঘরানার জেএমবি আর নেই। নব্য জেএমবি বা অন্যরা এখন দল গোছানোর কাজে মনোযোগী। তাদের অপারেশন বা হামলার প্রস্তুতি নেই। এখন তারা মূলত সদস্য রিক্রুট করার কাজে বেশি মনোযোগী। হাদিসুর রহমান ওরফে সাগরও একটা গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য আছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ডিসি মহিবুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান ও  ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মোঃ মাসুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

রাশেদ ৬ দিনের রিমান্ডে : জঙ্গি রাশেদকে ছয় দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম নুরুন নাহার ইয়াসমীন এ আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির আসামিকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে ছিলেন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>