চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়…..

বেলায়েত বাবলু ॥ ঈদের ছুটি উপভোগ করার জন্য অন্য সবার মতো আমিও গতকাল মঙ্গলবার পরিবারের সদস্যদের সাথে বাসায় ছিলাম। দৈনিক আজকের বরিশালের সম্পাদক খলিলুর রহমানের ফোন পেয়ে যা শুনলাম তা বিশ্বাসযোগ্য নয় ভেবে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির ভাইকে ফোন দিলাম তার কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে ফোন দিলাম সাংবাদিক আরিফিন তুষারকে। ও শুধু কান্না জড়িত কন্ঠে আমাকে বললো লিটন ভাইকে বরিশাল মেডিকেল নিয়ে যাচ্ছে অবস্থা খুব একটা ভালো না।

একথা শুনে যখন বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম তখন স্ত্রী রোমানা বললো আমিও তোমার সাথে যাবো। এরপর ওকে সাথে নিয়ে রিকসা যোগে রওয়ানা হলাম শেবাচিমের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে অনেকজনকে ফোন দিলাম লিটন ভাইর সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য। রাজা বাহাদুর সড়কে বসে ফোন পেলাম সিটি কর্পোরেশনের অফিস সহকারী সাদি’র। সে জানালো লিটন ভাইকে যখন চরমোনাই থেকে যখন বরিশালের উদ্দেশ্যে ট্রলারে উঠিয়েছে তখনই মনে হয়েছে তিনি আর হয়তো বেঁচে নেই। সাদি’র কথাও বিশ্বাস করতে পারলাম না।

কিন্তু বুকের ভিতর কেমন জানি একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আসলেই কি লিটন ভাই নেই! রিকসা চালককে বললাম জলদি করে টানতে। পথে দেখা হলো আমজাদ স্যার ও সাংবাদিক জাকির ভাইয়ের সাথে। জাকির ভাইকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো খবর ভালো না। এরই মধ্যে ওই পথ ধরে দৈনিক দখিনের মুখের এক ফটো সাংবাদিক মোটর সাইকেল যোগে যাচ্ছিল। ওকে থামিয়ে স্ত্রী রোমানাকে রিকসায় রেখেই চেপে বসলাম মোটর সাইকেলে। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। হয়তো প্রকৃতি আগেই খবর পেয়েছিলো আমার অভিভাবক লিটন বাশার আর নেই। তাই অন্যদের সাথে বৃষ্টিও সংহতি প্রকাশ করে অঝোড় ধারায় ঝড়ে বিলাপ করছিলো প্রিয় মুখ লিটন বাশার এই জগতের মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মেডিকেলে পৌঁছে দোতালায় দৌড়ে উঠতে গিয়েই শুনলাম কান্নার রোল। লিটন ভাইকে হারিয়ে তার সহকর্মীরা কাঁদছেন। আমিও তার নিথর মুখখনা দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। লিটন ভাইয়ের আকস্মিক অকাল প্রয়ানে কার কি ক্ষতি হয়েছে জানিনা কিন্তু আমার যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনো পুষবে কিনা জানিনা।

লিটন ভাইয়ের সাথে আমার সর্ম্পক প্রায় ২০ বছর আগের। তার সংস্পর্শে থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। তিনি বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার অনুপ্রেরনায় আমি তার পরে বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়ার সাহস করেছিলাম। ওই সময়ের নির্বাচনে তিনি আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় একবার আমি তার পরিষদ থেকে পাঠাগার সম্পাদক এবং আরেকবার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়েছিলাম। এবারের নির্বাচনেও আমাকে তার পরিষদ থেকে নির্বাচন করতে বলেছিলেন । কিন্তু আমি সমস্যার কথা বলায় তিনি আমাকে প্রার্থী না করিয়ে তার নির্বাচন পরিচালনার একটি কমিটিতে আমাকে রেখেছিলেন। নির্বাচনকালীন সময়ে তার খুব কাছে যাওয়ার সৌবাগ্য আমার হয়েছিল। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্ঠা করেছি তার পরিষদকে বিজয়ী করতে। যেদিন নির্বাচনী ফলাফল ঘোষনা করা হয়েছিলেঅ সেদিন মাত্র এক ভোটে তার পরাজয় মেনে নিতে না পেরে কান্না করেছিলঅম,। তিনি হাসিমুখে পরাজয় মেনে নিয়ে আমাকে বলেছিলেন আগামী বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে।

চলতি বছরের ৯ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম। খবর পেয়ে ওই রাতেই শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসেনসহ অন্যদের নিয়ে শেবাচিম হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন লিটন ভাই। তিনি আমার পরিবারের সদস্য বিশেষ করে আমার স্ত্রীকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন আমরা আছি, কোন চিন্তা করবেনা, বাবলুর সব ধরনের চিকিৎসা করতে যা যা করার দরকার সব ব্যবস্থা করা হবে।

এরপর আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। লিটন ভাই ফেইসবুক আর পত্রিকার মাধ্যমে সকলকে জানিয়ে দিলেন আমার অসুস্থতার কথা। তার লেখা পড়ে

অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। এরপর শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে লিটন ভাই আমার বাসায় গেলেন। তিনি ওই দিনও বুকের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন চিন্তা করিছনা আমরা তো আছি। এরপর তার ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় ১০এপ্রিল আমার এনজিও গ্রাম ও রিং বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। ৭এপ্রিল লিটন ভাইয়ের সাথে দেখা করতে অসুস্থ শরীর নিয়ে তার কর্মস্থল দৈনিক ইত্তেফাকের নীচ তলায় গিয়ে তাকে ফোন দেই। তিনি আমাকে উপরে না উঠে নীচেই অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষন পর তিনিসহ শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির ভাই, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ আমার কাছে আসলেন।

লিটন ভাই আমার চিকিৎসার খুটিনাটি সাদিক আবদুল্লাহকে জানালেন। সাদিক আবদুল্লাহ বললেন চিকিৎসার জন্য যতো টাকা লাগে আমি দেবো। লিটন ভাই বিনয়ের সাথে তাকে জানালেন আর মাত্র ৫০ হাজার টাকা হলেই হবে। এর বেশী দরকার হবেনা। পরবর্তীতে লিটন ভাই আমার অপারেশনের সব ব্যবস্থা করলেন।

৮এপ্রিল আমাকে ঢাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি ৯ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ১০ এপ্রিল আমার অপারেশনের দিন তিনি ঢাকায়। আমাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন তিনি একটি হোটেলে। আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, তুই যা আমি আসতাছি। এরপর আমার অপারেশন হলো। সিসিইউতে নেয়ার পর অন্যদের সাথে দেখলাম লিটন ভাইও আমার শয্যাপাশে। পরদিনও লিটন ভাই ছুটে এলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে।

আমাকে নিয়ে ছবি তুললেন। সেই ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করে সবাইকে জানালেন আমি সুস্থ আছি এবং অল্প দিনের মধ্যেই বরিশাল ফিরছি। এরপর ফোনে প্রায়শই তার সাথে যোগাযোগ করতাম। বরিশাল এসে একদিন ইত্তেফাকে গিয়ে তার সাথে দেখা করি। তিনি আমাকে সুস্থ দেখে অনেক খুশী হন। সাথে থাকা আমার স্ত্রীকে কিছু পরামর্শ দিয়ে বলেন আমার আচরনে যেন ও রাগ না করে। এরপর অনেক বার বিশেষ করে রমজান মাসে বেশ কয়েকটি ইফতার পার্টিতে তার সাথে দেখা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বার কয়েক ফোনে কথা হয়। সর্বশেষ ঈদের আগের দিন বিকেলে তার একটি ফোন পাই। ওই সময় তার ফোনটি ধরতে পারিনি। পরবর্তীতে আমি তাকে ফোন দিলে তিনি অভিযোগের সুরে বলেন কিরে আমার ফোন ধরছনা কেন।

আমি বলি ভাই এখনো আপনার কাছে আসছি। একথা বলে ছুটে যাই তার ইত্তেফাক অফিসে। সেখানে বেশকিছু সময় তার সাথে অবস্থান করার পর তিনি একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে বলেন সামান্য শুভেচ্ছা। এরপর তিনি আমার বিভিন্ন খোঁজ খবর নিয়ে জানান ঈদ করতে বাড়ী যাবেন। তার পা’ ছুয়ে সালাম করে ফেরার সময় বলেছিলাম ভাইয়া আমাকে সব সময় আপনার সাথে রাইখেন। প্রতিউত্তরে তিনি বলেছিলেন আমি সব সময় তার সাথে আছি। আজ বারবার তার শেষ কথা টুকু কানে ভাসে আমি তোর সাথে আছি…। কই ভাই ? আপনি সাথে কই ?

আমাকে সহ অনেককে অভিভাবকহীন করে আপনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আপনি ছাড়া আমি যে বড় অসহায়। আপনি আমাকে সুস্থ করে চলে যাবেন এটা হতে পারেনা। আপনাকে হারিয়েছে আমরা অনেকেই বিশেষ করে আমি, জে খান স্বপন, এম. মোফাজ্জেল, কে এম নয়ন, আরিফিন তুষার, রুবেল খান, এম. জহিরসহ অনেকেই অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আপনার জন্য শুধু প্রার্থনা আপনি পরপারে যেন শান্তিতে থাকেন। সকল অপরাধ মার্জনা করে আল্লাহতায়ালা আপনাকে যেন বেহেশতবাসী করেন। আজ শুধু আপনার পছন্দের সেই গীতি কবিতার উচ্চারন টুকু করতে চাই- চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ নয়, চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন করা আর্ত রজনী। আপনার (লিটন বাশার) দেহখানা হয়তো মাটি চাপা পড়েছে কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া কর্ম, আদর্শ আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>