জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে রোগীদের ভোগান্তি

আপডেট : July, 7, 2017, 11:37 pm

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে রোগীদের সেবা দিতে তিন যুগ আগে শুরু হয়েছিল মা ও শিশু হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। ৩৭ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সেবার মান বাড়িয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একের পর এক খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ, বাড়ানো হচ্ছে সেবার পরিধি।

.

জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালের ভেতরে জমে থাকা পানিনিরবিচ্ছিন্ন অত্যাধুনিক সেবা দিতে এত পদক্ষেপ নিলেও তা গ্রহণ করতে পারছেন না দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা। কারণ জোয়ার আর বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় প্রায় বন্ধ থাকছে মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলার সেবা কার্যক্রম। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

বর্ষায় সড়কের নানা ঝক্কি পেরিয়ে নগরে এলেও অনেক সময় জলাবদ্ধতার কারণে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না রোগী ও তাদের স্বজনরা। মাঝে মধ্যে হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি ডিঙিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেও সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে নিচতলার জরুরি ও বর্হিবিভাগে সেবা দিতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। পরে বাধ্য হয়ে সেবা না নিয়েই ফিরতে হয় তাদের।

সবশেষ গত এক মাসে জলাবদ্ধতায় পাঁচ দফায় পানিতে তলিয়ে যায় মা ও শিশু হাসপাতাল। এর মধ্যে গত ৩১ মে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তখন এই হাসপাতালের নিচতলা ছিল পুরোপুরি পানির নিচে। চার দিনেও এই জলাবদ্ধতা কাটেনি। গত সপ্তাহেও দুই দফায় জলমগ্ন হয়েছে হাসপাতালটি।

স্থানীয়রা  জানান, ভারী বর্ষণ হতে না হতে পানির নিচে তলিয়ে যায় হাসপাতালটি। বর্ষায় প্রায়ই এ সমস্যায় পড়তে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। সামান্য বৃষ্টিতেই নিচতলার জরুরি বিভাগ, অভ্যর্থনা বিভাগ, টিকিট কাউন্টার, লিফট রুম, বর্হিবিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ও এবাদত খানা ডুবে থাকে পানিতে। জোয়ারের সময়ও প্রায় গোড়ালি সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এখানে।

মধ্যম গোসাইলডাঙার বাসিন্দা রুবেল পারভেজ  বলেন,‘গত মাসে আমার এক আত্মীয় সীতাকুণ্ড থেকে চিকিৎসা নিতে এই হাসপাতালে আসেন। তখন ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে রোগীরা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছালেও নিচতলায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে জরুরি বিভাগে সেবা দিতে পারেননি চিকিৎসকরা। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে।’

জলাবদ্ধতার সময় শত শত রোগীকে এমন বিড়ম্বনায়

পড়তে হয়েছে। মা ও শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, ‘আগে এখানে পানি উঠতো না। ২০১০ সালের পর থেকে পানি ওঠা শুরু হয়। এখন যতই দিন যাচ্ছে ততই হাসপাতালে পানি ওঠার প্রবণতা বাড়ছে। আগে গোড়ালি পর্যন্ত পানি উঠতো, এখন কখনও কখনও কোমর পরিমাণ পানি জমে যায়।’

হাসপাতালটির উপ-পরিচালক আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির বৈঠকে এখানে নির্মাণাধীন ভবনের প্রথম দুটি তলার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে নিচতলার কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন ভবনে গেলে হয়তো হাসপাতালে পানি উঠবে না।’

মা ও শিশু হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে আমরা হাসপাতালের চারপাশ উঁচু করেছিলাম। কিন্তু তাতেও রক্ষা হচ্ছে না। সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কোমর পরিমাণ পানি ওঠে যায়। এরপর আমরা যেসব পথ দিয়ে হাসপাতালে পানি প্রবেশ করে সেগুলো রোধ করেছি। হাসপাতালের শৌচাগারগুলো উঁচু করা হচ্ছে।’

.

জলাবদ্ধতার মধ্যে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালের ভেতরে চলছে চিকিৎসাহাসপাতালে আসা-যাওয়ার সড়কগুলো উঁচু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করে সৈয়দ মোরশেদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা না হয় হাসপাতাল উঁচু করলাম, কিন্তু তাতে কি দুর্ভোগ কমবে? হাসপাতালে আসার সড়কগুলো জোয়ার আর বৃষ্টিতে ঠিকই জলমগ্ন হবে। তাই এগুলো উঁচু করার প্রয়োজন।’

তবে সড়ক উঁচুকরণ কোনও সমাধান নয় বলে মনে করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ। তার ভাষ্য, ‘মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকা বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী হওয়ার কারণে ওই এলাকা প্লাবিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন প্রতিনিয়ত সমুদ্রপিষ্টের উচ্চতা বাড়ছে। তাই সড়ক উঁচুকরণ কোনও সমাধান নয়। জোয়ারের পানি যেন নগরীতে প্রবেশ না করে সেজন্য খাল ও নালার মুখে স্লুইচ গেট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছি। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হতে পারে।’

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘জলাবদ্ধতার সমস্যাকে আমরা কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখছি না। এটি পুরো নগরীর সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে মহেশখাল খনন শেষ করবো। ওই খালের পানি আগে একদিকে প্রবাহিত হতো, এখন যাতে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

Facebook Comments