ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের লোডসেডিংয়ের সাথে বাড়তি ‘স্কাডা’- চরম ভোগান্তিতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে গ্রাহকরা

কে এম সবুজ ঝালকাঠি: ‘শীতকালে কারেন (বিদ্যুৎ) গ্যালে এক ঘন্টা পর আইতে। এহন গরমকালে কারেন গ্যালে আর আইবে কোন সময় কেউ জানে না। একটু আইয়্যাই আবার যায়। অনেক সময় গরমের কষ্টে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলে হেরা কয় ‘ভাই স্কাডা’ চলে। স্কাডা আবার কি! মনে অয় কারেন না দেওয়ার নতুন ফন্দি’। ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের তীব্র লোডসেডিংয়ের কষ্টে কথাগুলো বলছিলেন শহরের চায়ের দোকানী মো. রাসেল। দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন মো. মাসুম নামে এক দিন মজুর। বিকসা চালিয়ে ক্লান্ত মাসুম বলেন, সারাদিন রাস্তায় রিকসা চালাই। শরীর গামে ভিজ্জা যায়। রাইতে বাসায় যাইয়্যা একটু শান্তিতে ঘুমামু হেয়াও পারিনা, কারেন থাহে না। গরমে বালিসে মাথা রাখতে পানিনা। অনেক রাইত না ঘুমাইয়্যাই কাডাই।
শুধু রাসেল কিংবা মাসুম নয় বিদ্যুতের লোডসেডিংয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ঝালকাঠি সদরসহ তিন উপজেলার বিদ্যুৎ গ্রহকরা। লোডসেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ওপর গ্রহকদের অভিযোগের শেষ নেই।
এমনিতেই গ্রীস্মের শুরুতে প্রচন্ড তাপদাহে অতিষ্ট মানুষ। তার ওপর শুরু হয়েছে বিদ্যুতের লোডসেডিং। বিদ্যুতের এ লোডসেডিংয়ের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে স্কাডা। বিদ্যুতের ঘনঘন লোডসেডিংয়ে শুধু সাধারণ গ্রাহকরাই দিশেহারা নয়, চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শহরের ব্যবসায়ীরা। বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ভোগান্তির শিকার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, দিন রাত মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ বার লোডসেডিং হয়। তার ওপর বাড়তি যোগ হয়েছে স্কাডা। এই স্কাডার কারনে বিদ্যুৎ কখন, কোন সময় থাকবে বা যাবে তা কেউই বলতে পারে না। শহরের একটি লবন মিলের মালিক ছালেক শরীফ বলেন, লোডসেডিং ছিল তা মেনে নিয়েছি। কিন্তু স্কাডার কারনে লবন উৎপন্নকারী মেশিন চালু করা যাচ্ছে না। ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করলে মেশিন নষ্ট হয়ে যায়’। আইসক্রীম ও বরফ কারখানার মালিক অসিম দাস বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে সব চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ লোডসেডিং হয় ঝালকাঠিতে। এ জায়গার মতো কোথাও এমন লোডসেডিংয়ের খবর পাই না। আমার বরফ কল প্রায় বন্ধের পথে’।
ঝালকাঠির বাঁশপট্টি এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, ‘ফ্রিজে রাখা মাছ, মাংসসহ অন্যান্ন খাবার প্রতিদিন কিছু না কিছু নষ্ট হচ্ছে। মানুষ বিদ্যুতের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে।’
স্কাডা কিভাবে হয়! এ সম্পর্কে ঝালকাঠি বিদ্যুৎ অফিসে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের ভোগান্তির অপর নাম স্কাডা। ঢাকা থেকে এটি নিয়ন্ত্রিত হয়। বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি ৫০ বা তার অধিক থাকলে বিদ্যুৎ থাকে। এর নিচে নামলেই ফ্রিকোয়েন্সি

ডাউন হয়ে যায়। চলে যায় বিদ্যুৎ। অনেক সময় খুব দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি আপ হয়। কখনো আবার আপ হতে সময় লাগে। যতক্ষণে ফ্রিকোয়েন্সি আপ না হবে, ততক্ষণ বিদ্যুতের বাড়তি লোডসেডিং পোহাতে হয় ঝালকাঠিবাসীকে। ঝালকাঠি প্রায় তিন বছর ধরে স্কাডার আওতায় রয়েছে। মাঝখানে কিছুদিন স্কাডা বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে। এমনিতেই লোডসেডিংয়ের মধ্যে আবার স্কাডা বিড়ম্বনায় গ্রহকরা কষ্ট পাচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন নিয়মিত লোডসেডিং হয় ৭-৮বার। আর স্কাডার কারণে অতিরিক্ত লোডসেডিং হয়েছে ১৮ বার। এই ১৮ বার স্কাডার কারণে বিদ্যুৎ থাকেনি প্রায় ৮ ঘন্টা।
স্কাডাকার কারণে বিদ্যুতের লোডসেডিংয়ে গ্রাহকদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে জানিয়ে ঝালকাঠির ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিশন কোম্পানি জানিয়েছেন, সাময়িক অসুবিধার জন্য সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা। জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া একটি চিঠিতে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, জাতীয় গ্রিড বরিশাল থেকে ১৮ কিলোমিটার মাঝারি দুর্গম এলাকা দিয়ে ৩৩ কেভি লাইনের মাধ্যমে ঝালকাঠি সাবস্টেশন দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১২ মেঘাওয়াট। আসন্ন রমজানে এ চাহিদা আরো বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫-৬ মেঘাওয়াট। যার ফলে তীব্র লোডসেডিং দিতে হচ্ছে। এই তীব্র লোডসেডিংয়ের মধ্যে ঢাকা থেকে যোগ হওয়া স্কাডার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়।
বিদ্যুতের লোডসেডিং বিড়ম্বনা শুধু শহরেই নয়, রয়েছে চার উপজেলার গ্রামাঞ্চলেও। শিল্প কারখানা না থাকলেও গ্রামাঞ্চলের বাসা-বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিদ্যুৎ বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেন পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা। দিনে ৭-৮ বার লোডসেডিং হয় পল্লী বিদ্যুতে। এছাড়া রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আর আসেনা বলেও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওসহ নানা আন্দোলন করেছেন গ্রাহকরা। তার পরেও ওজোপাডিকো এবং পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মাত্রারিক্ত লোডসেডিং থেকে মুক্তি দিতে পারেনি ঝালকাঠিবাসীকে।
লোডসেডিংয়ের কথা স্বীকার করে ঝালকাঠির নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মো. আব্দুর রিহম বলেন, ‘ঝালকাঠিতে লোডসেডিংয়ের সাথে আরেকটি যন্ত্রণাদায়ক হল স্কাডা। ঢাকার আবদুল গনি রোডের বিদ্যুৎ ভবন থেকে স্কাডা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বরিশাল বিভাগের মধ্যে ঝালকাঠি স্কাডার মধ্যে পড়েছে। আমরা ঝালকাঠিকে স্কাডা মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রীড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপকের কাছে চিঠি দিয়েছি। ঝালকাঠিতে দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১২ মেঘাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। তবে পাওয়া যায় মাত্র ৫-৬ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে লোডসেডিং বেশি হয়।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>