ঝালকাঠির সাংসদ হারুনের পুত্র মাহিরের মাধ্যমে রেইনট্রি হোটেল বুকিং করেছিল ধর্ষকরা!

আপডেট : May, 11, 2017, 12:57 pm

কামরুজ্জামান খান : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ধর্ষণের ঘটনায় বনানী ‘কে’ ব্লুকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের চারতারকা হোটেল দ্য রেইনট্রি গত কয়েকদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রুম ভাড়া নিয়ে ধনীর দুলালেরা ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা তথ্য পেতে শুরু করেছেন। ধর্ষণের ঘটনা এই প্রথমবার জানাজানি হলেও অভিযুক্তরা আগে একাধিকার ওই হোটেলে মদ, ইয়াবার আসরের পাশাপাশি তারকা মডেলদের নিয়ে ফুর্তি করেছেন বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে। রেইনট্রি হোটেলের একজন পরিচালকের সহায়তায় হয়েছে সবকিছু। ওই হোটেলের মালিক ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুণ (বি এইচ হারুন)। তার পুত্র মাহির হারুন ওই হোটেলের একজন পরিচালক। তিনিই মূলত হোটেলে রুম বুকিং ও সার্বিক তদারকি করে থাকেন। পুলিশের গুলশান জোনের একাধিক কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

৮ মার্চ ডিভোর্সপ্রাপ্ত সাফাতের স্ত্রী টিভি উপস্থাপিকা ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা গতকাল বুধবার বলেছেন, রেইনট্রি হোটেলের পরিচালক মাহির হারুন ধর্ষণ মামলার মূল আসামি সাফাত আহমেদের (২৬) ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অ্যাপেলো হাসপাতালের পেছনে অবস্থিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা’র (আইএসডি) সহপাঠী। মাহিরের বন্ধু হওয়ায় ওই হোটেলে সাফাতের অবাধ যাতায়াত ছিল। মাহির প্রায়ই তার জন্য রুম বুকিং করে দিতেন। ওই রাতে ঘটনা ঘটে হোটেলের ৭০১ ও ৭০২ নম্বর রুমে। সাফাতের জন্মদিন উপলক্ষে হোটেলের পক্ষ থেকে কেক উপহার দেন মাহির। ওই রাতে তারা সুইমিং পুলের পাড়েও মদ্যপ অবস্থায় হই-হুল্লোড় করেন। সাফাত প্রায়ই হোটেলে বিভিন্ন বয়সী বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে আড্ডা জমাতেন। রাতে অনেক নামি মডেলকে সেখানে ডেকে নেয়া হতো। সাফাতের বন্ধু নাঈম মডেলদের আপন জুয়েলার্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করার নাম করে সেখানে ডেকে নিতেন। এরপর প্রলোভনে ফেলে করা হতো অনৈতিক কাজ। পিয়াসা বলেছেন, গত মাসে সাফাত পিয়া বিপাশা নামে এক মডেল অভিনেত্রীকে নিয়ে ভারতে বেড়াতে যান।

সেখানে পানচাকলা এলাকায় অবস্থানকালে তারা বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব ও বারে সময় কাটান- যার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এমন অনেক মডেল অভিনেত্রী দেশ-বিদেশে সাফাতের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন এবং লং ড্রাইভে গেছেন বলে চাউর রয়েছে।

হোটেলের একজন স্টাফ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বলেছেন, সাফাত একেক সময় একেকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যেতেন। মালিকপুত্রের বন্ধু এবং নামি জুয়েলারি দোকান আপন জুয়েলার্সের মালিকপুত্র হওয়ায় হোটেলে সবাই তাকে সমীহ করতেন। পরিচালক মাহির হারুন তার জন্য রুম বুকিং করতেন। অনেক আড্ডায় মাহিরও অংশ নিতেন। ২৮ মার্চ ঘটনার রাতে চিৎকার চেঁচামেচি আড্ডার অংশ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল হোটেল কর্তৃপক্ষ। আর মোটা অঙ্কের বখশিশ পাওয়ায় স্টাফরা সাফাতের সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে থাকতেন। পরদিন সকালে হোটেল ত্যাগ করার সময় দুই তরুণীর চোখেমুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। সবাই যেন সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করেছিল।

ওই হোটেলের একজন বয় জানিয়েছেন, মিরপুর এলাকার একজন সাংসদ পুত্র (‘জ’ আদ্যাক্ষর) সাফাতের বন্ধু। তিনিও অনেক সময় আড্ডায় থাকতেন। তারা রুম বুকিং করে মদের আড্ডার বাইরে অনেক সময় ইয়াবার আসর জমাতেন। কখনো

দিনে আবার কখনো রাতে বসত আড্ডা। হোটেল রুমের বাথরুমে তারা ইয়াবা সেবন করতেন। ইন্টারকমে কল করে তারা রুমে খাবার, পানীয় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনিয়ে নিতেন।

গুলশান পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে সাফাত, নাঈম ও সাদমান কমপক্ষে ৫টি ইয়াবা সেবন করেছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। সেইসঙ্গে তারা মদ পানও করেছিলেন। ভিকটিমদেরও মদ পানে বাধ্য করা হয়।

রেইনট্রি হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার ফরাসি নাগরিক ফ্রাঙ্ক ফরগেটের সঙ্গে গতকাল বিকেলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশকে সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে। কিছু বলার থাকলে পুলিশ এ ব্যাপারে কথা বলবে। তারা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলবে না। এমনকি হোটেল কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্ব, মালিক, পরিচালক ও তাদের গাফিলতি প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

হোটেলের এক্সিকিউটিভ ইন্টারনাল অপারেশন (ইআইও) ফারজান আরা রিমি জানান, গত বছরের ডিসেম্ব^রে এই হোটেলের যাত্রা শুরু হয়। হোটেলের মালিক বাংলাদেশি হলেও এটি আন্তর্জাতিক মানের। বর্তমানে সেখানে দেশীয় প্রেক্ষাপটে পাঁচ তারকা এবং আন্তর্জাতিক মানে চার তারকা মানের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

জানা গেছে, ১১তলা এই ভবনে মোট ৪১টি বিলাসবহুল কক্ষ রয়েছে। রয়েছে চারটি রেস্টুরেন্ট ও ১টি পার্টি সেন্টার, সুইমিং পুল, ব্যায়ামাগার (জিম) ও বার। চার ক্যাটাগরির কক্ষের ভাড়ার তালিকায় প্রতিরাতের জন্য সর্বোচ্চ ৫৫০ ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২৫০ ডলার বা সাড়ে ২৪ হাজার টাকা। হোটেলের ম্যানেজমেন্ট আন্তর্জাতিক মানের। রিমি জানান, হোটেলে ৭৭ জন দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। হোটেলের বাইরে-ভেতরে রয়েছে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। তিনি জানান, তবে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বশেষ ৩০ দিনের ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়।

রেইনট্রি হোটেলটির মালিক, জনশক্তি রপ্তানিকারক ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য বিএস হারুনের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা বলতে মোবাইল ফোনে বারবার চেষ্টা করলেও দুটি নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। তার পুত্র মাহির হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনো সহযোগিতা করেনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে সাফাত আহমেদ নামে এক বন্ধুর জন্মদিনে যোগ দিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন দুই তরুণী। তাদের অভিযোগ, সাফাত আহমেদ তার বন্ধুদের যোগসাজশে অস্ত্রের মুখে তাদের ধর্ষণ করেন। ওই ঘটনার ৪০ দিন পর শনিবার সন্ধ্যায় বনানী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলায় সাফাত আহমেদ, তার বন্ধু নাঈম আশরাফ, সাদনান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও তার দেহরক্ষী আজাদকে (এজাহারে নাম অজ্ঞাত) আসামি করা হয়েছে। রোববার ভিকটিম দুই তরুণীর জবানবন্দি গ্রহণের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ ও প্রকৃত বয়স নির্ধারণের জন্য রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষার পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে সেগুলো পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছে ফরেনসিক বিভাগ। এরপর পুলিশ প্রহরায় ভিকটিমদের প্রথমে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। রাতে তাদের এক খালার বাসায় রেখে আসে পুলিশ।

সূত্রঃ দৈনিক ভোরের কাগজ

Facebook Comments