ট্রেনের নিচে বাবা-মেয়ে সব হারানোর পরে হালিমার গরু চুরির মামলা নিল পুলিশ

মেয়ের শ্লীলতাহানির অভিযোগ করতে গিয়ে গরু খুইয়েছিলেন হজরত আলী আর হালিমা দম্পতি। শ্লীলতাহানির অভিযোগটি কেউ কানেই তোলেনি। এরপর গরু চুরির লিখিত অভিযোগ নিয়ে যখন তাঁরা থানায় গেলেন, পুলিশও তাঁদের কথা শোনেনি। ক্ষোভে-দুঃখে গত ২৯ এপ্রিল মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মঘাতী হন হজরত আলী। স্বামী আর মেয়ে খুইয়ে দিশেহারা হালিমা। এত দিন পর তৎপর হয়ে পুলিশ গরু চুরির মামলাটা নিয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে মামলার এক আসামিকেও।
গাজীপুরের শ্রীপুরের কর্ণপুর সিটপাড়া গ্রামের হজরত আলীর পালিত মেয়ে নয় বছরের আয়েশা আক্তারের শ্লীলতাহানির পরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ও পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি। এ অভিযোগ করার কারণে শিশুটিকে নিপীড়নকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে হজরতের একটি বড় গরু ধরে নিয়ে খেয়ে ফেলে। আবারও পুলিশের কাছে গরু চুরির অভিযোগ নিয়ে যান হজরত। কিন্তু তখন পুলিশ মামলা নেয়নি। ক্রমাগত নিপীড়ন আর উপেক্ষা সইতে না পেরে মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে আত্মঘাতী হন হজরত আলী। গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচিত হলে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে হালিমার করা গরু চুরি মামলায় কুদ্দুস আলী (৪০) নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ বাবা-মেয়ের আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলার কোনো আসামিকে ধরতে পারেনি।
পুলিশ, ভুক্তভোগী পরিবার ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, হালিমা বেগম এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে শ্রীপুর থানায় একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কর্ণপুর গ্রামের ফারুক হোসেন, মো. আফসু, মো. কুদ্দুস আলী ও আ. খালেক খারাপ ও উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির লোক। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে হালিমা বেগমের সঙ্গে খারাপ আচরণ, তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে আসছেন।

৪ এপ্রিল হালিমাদের একটি ষাঁড় গরু বাড়ির পাশের খেতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ওই দিন সকাল ১০টার দিকে গরুটি চুরি হয়। পরে প্রতিবেশীরা হালিমাকে বলেন, ওই চারজন তাঁর গরুটি নিয়ে গেছেন। পরে হালিমা গরুর বিষয়ে তাঁদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। পরে তিনি স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানালেও ন্যায়বিচার পাননি। এরপর থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে দুই দফায় হালিমার বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়। তবে অভিযোগটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। ২৯ এপ্রিল হজরত আলী তাঁর আট বছরের পালিত মেয়ে আয়েশা আক্তারকে নিয়ে ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা করেন। ১৬ মে হালিমার সেই অভিযোগটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে শ্রীপুর থানার পুলিশ।
হালিমা আক্তার বলে আসছেন, মেয়ের শ্লীলতাহানি, গরু চুরি যাওয়া ও প্রতিবেশীদের হামলার হুমকির বিচার না পাওয়ায় তাঁর স্বামী মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
জানতে চাইলে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে পার্শ্ববর্তী কাপাসিয়া উপজেলা থেকে কুদ্দুস আলীকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল শুক্রবার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্র জানায়, ২৯ এপ্রিলের ঘটনার পর হালিমা বেগম কমলাপুর রেলওয়ে থানায় তাঁর স্বামীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আসামিরা হলেন কর্ণপুর গ্রামের ফারুক হোসেন (৩০), আ. খালেক (৬০), ফাইজুদ্দিন (৫০), পটকা গ্রামের বোরহান (৩৫), আব্দুল হামিদ (৪৫), শাহিদ (৪০) ও গোসিঙ্গা ইউপি সদস্য আবুল হোসেন বেপারী (৫৫)। ঘটনার দিনই পুলিশ আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত ঘটনার ২১ দিনেও এজাহারভুক্ত ৬ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>