ডিসির জাল স্বাক্ষরে ৪শ’ অস্ত্রের লাইসেন্স

রংপুরে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী ডিসির স্বাক্ষর জাল করে চার শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে যেতে পারে বলে খোদ ডিসিই শঙ্কা জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় রংপুর জেলা প্রশাসন ১৮ মে দুই কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছে। ওই দিন তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলাও করা হয়। সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসন গঠন করেছে তদন্ত কমিটিও। মামলার পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে অনুসন্ধান করছে।

স্বাক্ষর জালের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর থেকেই লাপাত্তা ওই দুই কর্মচারী। তাদের ধরতে মঙ্গল ও বুধবার রংপুর ও দিনাজপুরে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে অফিসে তাদের একজনের আলমারি থেকেই ১১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

ওই দুই কর্মচারী হলÑ জিএম শাখার অফিস সহকারী সামসুল ইসলাম ও পিয়ন পান্নু মিয়া। এর মধ্যে সামসুল ইসলামের বিপুল বিত্তবৈভবের খোঁজ মিলেছে। কয়েকটি বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমির এ মালিক প্রাইভেট কারে চলাফেরা করে। তার ও পান্নু মিয়ার অবৈধ সম্পদের খোঁজেও মাঠে নেমেছে দুদক।

প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে, এ চক্রের সঙ্গে ঢাকার এক সরকারি কর্মকর্তাও জড়িত। ডিসি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে এসব লাইসেন্স দেয়া হয়।

অস্ত্রপ্রতি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে এসব লাইসেন্স থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্র। টাকা দেয়ার ১৫ দিনের মধ্যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত পাওয়া কাগজপত্রে দেখা গেছে, ১৯৮৭ থেকে ২০০৯ সময়কালে এসব লাইসেন্স দেয়া হয়। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, গত কয়েক বছরে এসব লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন-তারিখ পুরনো (ব্যাক ডেট) দেখানো হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকার মোহাম্মদপুরের ব্লক-ই এর ৭/১ রোডের বাড়ি নং-২ এর মালিক শেখ গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদের ছেলে শেখ জহুরুল ইসলামকে একটি ৩২ রোল পিস্তল, এফ ৯৯৭৯৯ ডব্লিউ, ইতালি, কার্তুজ ২৫ রাউন্ডসহ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। নং ০৪/২০০০। অস্ত্রটি তিনি কেনা দেখিয়েছেন মেসার্স মাহবুব আর্মস কোং লিমিটেড গণেশতলা থেকে। কিন্তু তা ভুয়া।

আবার রংপুরের বদরগঞ্জের দামোদারপুরের রাজু আহমদের ছেলে সুমন আলীকে ২০০৬ সালে একটি একনলা বন্দুক, বেলজিয়াল ৫৫২১৬, কার্তুজ ১০ রাউন্ডসহ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। নং ০২/২০০৬। অস্ত্রটি কেনা হয়েছিল বগুড়া খান মার্কেটের খান আর্মস কোং লিমিটেড থেকে। এ লাইসেন্সটি নবায়ন করা হয় ২০১৫ সালে।

রংপুরের তারাগঞ্জের ইকরচালী গ্রামের মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের ছেলে মনোয়ারুল ইসলামকে ২০০৯ সালে একটি একনলা বন্দুক, আমেরিকা পিডটওয়াই-১৬ এর লাইসেন্স দেয়া হয়। নং ০৯/২০০৯। এ তিনটি লাইসেন্সই

দেয়া হয় জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষর জাল করে। সূত্র জানায়, এভাবে ৪শ’র বেশি লাইসেন্স দেয়ার দালিলিক প্রমাণ প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গড়া তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবিউল ইসলামকে। তিনি  বলেন, আমরা তদন্ত শুরু করেছি। প্রমাণও পাচ্ছি। শিগগিরই সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ মে জিএম শাখায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় অফিস সহকারী সামসুল ইসলামের আলমারি থেকে ১১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জিএম শাখার সব কাগজপত্র তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেয় জেলা প্রশাসন। তৎক্ষণাৎ সামসুল আলম ও পান্নু মিয়াকে বরখাস্ত করা হয়। পরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস বাদী হয়ে ওই দু’জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার আইনে পৃথক দুটি মামলা করেন।

এর আগেই ডিসি অফিস থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় সামসুল আলম ও পান্নু মিয়া। মঙ্গল ও বুধবার তাদের ধরতে রংপুর মহানগরীর সরেয়ার তল ও আশপাশে এবং দিনাজপুরের কয়েক স্থানে অভিযান চালায় আইনশৃংখলা বাহিনী। দুদকের প্রতিনিধিও সঙ্গে ছিল। রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি এবিএম জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা আমাদের দিক থেকে বিষয়টি তদন্ত করছি। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযানও চালাচ্ছি।
রংপুর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, বিষয়টি জেনে আমি হতবাক হয়েছি। আমাদের সবাইকেই তা অবাক করেছে। এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা তাদের বরখাস্ত করেছি।

তদন্ত করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন, ওই চক্রটি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র সরবরাহ করেছে কিনা তা নিয়ে প্রশাসন চিন্তিত।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, ১৫ দিন আগেও সামসুল আলম রংপুর মহানগরীর খোর্দতামপাট মধ্যপাড়ায় সেকেন্দারের বাড়ির কাছে প্রায় কোটি টাকা দিয়ে ১ একর জমি কিনেছে। সরেয়ার তল এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল তিনতলা এবং একতলা ছাদ পেটানো বাড়ি আছে। সে জিয়াদপুকুর এলাকায় একটি খানকা শরিফ দিয়েছে।

সেখানে ২০-৩০ জন অপরিচিত লোক প্রায়ই আসা-যাওয়া করে। সামসুল ধাপ এলাকায় জমি কেনার জন্যও বায়না করেছে। আশরতপুর ঈদগাহ পাড়া এলাকায় মেয়ের জামাইয়ের মাধ্যমে বিশাল জমি কিনেছে। নামে-বেনামে তার শতাধিক কোটি টাকার সম্পদ আছে।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আবুল কাশেম  বলেন, অফিস সহকারী হয়েও সামসুল আলম প্রাইভেটকারে চলাফেরা করে। বিলাসবহুল জীবনযাপন করে।

এ বছর সে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে প্রচারও চালিয়েছিলে। তার একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে। প্রায়ই সে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সফর করে।

সূত্রঃ যুগান্তর

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>