ঢাকা-বরিশাল নৌপথে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিয়ে শঙ্কা

জুন ২২ ২০১৭, ১১:৩৩

দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথনির্ভর কয়েক লাখ যাত্রীর ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হওয়া নিয়ে এবারও সংশয় দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন নৌপথে ঈদ উপলক্ষে নৌযানগুলোর বিশেষ সার্ভিস শুরু হওয়ার আগেই একটি লঞ্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় এই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক বছরের মতো ঈদ মৌসুমে নৌ দুর্ঘটনা রোধে এবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে এ অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি নৌযানের বিশেষ সার্ভিস শুরুর কথা রয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বরিশালে কীর্তনখোলা নদীর চরবাড়িয়া এলাকায় ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি তাসরিফ-১-এর সঙ্গে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের সংঘর্ষ হয়। এতে ১২ জন আহত হন।

এর আগে ২৩ এপ্রিল বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া দ্রুতগতির জলযান (ওয়াটার ওয়েজ) গ্রিনলাইন-২-এর সঙ্গে কীর্তনখোলার চরবাড়িয়া এলাকায় একটি পাথরবোঝাই কার্গোর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে কার্গোটি ডুবে যায় এবং গ্রিনলাইনের তলা ফেটে গিয়ে এটি অর্ধনিমজ্জিত হয়। নৌযানটি দ্রুত তীরে নোঙর করায় যাত্রীরা অক্ষত ছিলেন।

লঞ্চ মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকা-বরিশাল পথে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২টি লঞ্চে যাত্রী পরিবহন করা হবে। এ ছাড়া বরগুনা, পটুয়াখালী, আমতলী, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুরসহ অন্য পথগুলোয় নিয়মিত লঞ্চ ছাড়াও বিশেষ সার্ভিস হিসেবে অতিরিক্ত অন্তত ৩০টি লঞ্চ চলাচল করবে। একই সঙ্গে ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-বরিশাল হয়ে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ পথে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) নিয়মিত চারটি জাহাজ ছাড়া আরও দুটি জাহাজ বিশেষ সার্ভিসে যাত্রী পরিবহন করবে।

ঢাকা-বরিশাল পথে চলাচলকারী সুন্দরবন-১০ লঞ্চের চালক রুহুল আমীন বলেন, কীর্তনখোলা নদীর চরবাড়িয়া এলাকা খুবই বিপজ্জনক। এখানে বড় একটি বাঁক রয়েছে। দুদিক থেকেই স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় এখানে ঘূর্ণাবর্তের মতো অবস্থা থাকে। এ জন্য এ এলাকা পার হওয়ার সময় খুব সাবধানতা অবলম্বন না করলে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে। গ্রিনলাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে নিমজ্জিত কার্গোটি উদ্ধার না করে সেখানে একটি বয়া স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে এলাকাটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক আজমল হুদা সরকার বলেন, ‘চরবাড়িয়া এলাকায় ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের একটি বাঁক থাকায় ওই স্থানটি বিপজ্জনক। ওই এলাকায় চর খনন করলে ঝুঁকি কিছুটা কমবে। এ জন্য আমি লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি।

যাতে তাঁরা বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে খননের বিষয়ে বলেন। আমিও সরাসরি কথা বলব। ঈদের পর যাতে এলাকাটি খনন করা যায় সে চেষ্টা করব। আর ঈদে নৌযানগুলো যাতে বেপরোয়া গতিতে চলতে না পারে, সে জন্য আমাদের কঠোর নজরদারি থাকবে।’

গত বছর ৩ জুলাই ঈদ মৌসুমে ভোররাতে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে চরবাড়িয়া এলাকায় সুরভি-৭ লঞ্চের সঙ্গে সরকারি বিআইডব্লিউটিসির পিএস মাসুদ নামে একটি স্টিমারের সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলে পাঁচজন নিহত হন। আহত হন ১৫ জন যাত্রী। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বরিশাল হয়ে ঢাকাগামী বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার পিএস মাসুদের সঙ্গে একই এলাকায়একটি কার্গোর সংঘর্ষ হয়। এ সময় পিএস মাসুদের প্যাডেল ভেঙে বিকল হয়ে যায়।

যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, বিগত দিনের অভিজ্ঞতা হলো—ঈদ মৌসুমে যেসব লঞ্চ বিশেষ সার্ভিসের নামে নৌপথে নামানো হয়, তার অধিকাংশেরই চলাচলের বৈধতা থাকে না। এসব লঞ্চ ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ যাত্রী বহন করায় প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপনের আবেগকে পুঁজি করে অসাধু লঞ্চ মালিকেরা এ অপকর্মে লিপ্ত হন। প্রতিবছর মালিকদের একটি অংশ বেশি লাভের আশায় পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ পরিচালনা করেন। ডকইয়ার্ডগুলোয় ঈদের দু-তিন মাস আগ থেকেই লঞ্চের রং ও মেরামতের কাজ শুরু হয়। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা এসব লঞ্চ হয়ে উঠেছে চকচকে। দেখে বোঝার উপায় থাকে না এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রীরাও না বুঝে রংমাখা লঞ্চগুলোয় অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে চলাচল করে। দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে ঈদ মৌসুমে পাল্লা দিয়ে অনভিজ্ঞ চালক দিয়ে বিশেষ সার্ভিসের নামে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় পর্যাপ্ত বয়া-বিকনবাতি না থাকা এবং অধিকাংশ বাতি অকেজো হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই ঈদ মৌসুমে নৌ দুর্ঘটনা ঘটে।

যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ জাতীয় কমিটির সভাপতি তুষার রেহমান বলেন, ঈদে নৌপথকে নির্বিঘ্ন রাখতে নৌপরিবহনমন্ত্রী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মন্ত্রীর এ বক্তব্যে মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছে না। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের উদাসীনতা—এ সংশয়ের কারণ।

বিআইডব্লিউটিসির যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন  বলেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর লক্কড়ঝক্কড় মার্কা লঞ্চ নদীতে নামতে দেওয়া হবে না। যেসব লঞ্চ যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে রং করা হচ্ছে, সেগুলোর দিকে আরও বেশি নজর রয়েছে।

সূত্রঃপ্রথম আলো

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>