তরুণীদের ধর্ষণের আলামত হতাশাজনক ফেসবুক পোস্ট

‘একজন বিদেশি মেয়ে ঝরণার পানিতে ভিজছেন। পানির সঙ্গে টল টল করে ঝরছে দু’চোখের জল। কাজল গলে গাল বেয়ে গলার দিকে যাচ্ছে। মুখটা বিপর্যস্ত। ঠোঁটে বাম হাতটি রেখে দিয়ে নির্বাক ভঙ্গিতে উপরে ক্যামেরার দিকে চেয়ে আছেন।’-এটি একটি ছবির বর্ণনা। গত ৩০ মার্চ নিজের ফেসবুক ওয়ালে এ ছবিটি পোস্ট করেছেন বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের স্বীকার এক তরুণী।

গত ২৮ মার্চ রাতে ওই তরুণী ও তার বান্ধবীকে ধর্ষণ করে সাদমান, সাকিফ এবং নাঈমরা। সেদিন বাড়ি ফিরে বিপর্যস্ত ছিলেন তারা। কাউকেই কিছু বলেনি। মানসিক ও শারীরিক চাপে কোনো মতে রাতযাপন করেছেন। পরদিন ৩০ মার্চ নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে বিধ্বস্ত এক বিদেশি নারীর ওই ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে নিজের বিপর্যস্ততার কথা তুলে ধরেছিলেন। ফেসবুকের ওই ছবিটিতে আরেক বান্ধবীর সঙ্গে কমেন্ট কনভারসেশনে বোঝা যাচ্ছিল কতটা নির্মম তার ব্যথা।

ওই তরুণীর বান্ধবী ছবিটিতে কমেন্ট করে, ‘কি হয়েছে দোস্ত।’

তরুণী : ‘কিছু না দোস্ত, একটু ডিপ্রেসড আর কী।’

বান্ধবী : ‘চিয়ার আপ করে -এমন গান শোন, ভালো লাগবে।’

তরুণী : ‘গান শুনে যদি সব করতে পারতাম তাহলে তাই করতাম।’

ছবিটির নিচে তার কষ্ট না জেনেই বেশ কয়েকজন বন্ধু সমবেদনা জানিয়েছেন। পরদিন ১ এপ্রিল আরেকটি হতাশাজনক ছবি পোস্ট করেন তিনি।

ধর্ষণের ঘটনার পর থেকেই দ্বিতীয় তরুণীও ফেসবুকে হতাশাজনক ছবি পোস্ট করেছেন। তার ফেসবুকে ছবিতেও একটি বিদেশি নারী আয়নার দিকে তাকিয়ে দুই হাত মুঠ করে নিজের কাছেই যেন ক্ষমা চাচ্ছেন। ছবির নারীর চোখেও জল রয়েছে।

দ্বিতীয় তরুণীর ছবিটি (১ এপ্রিল) ছিল আরও করুণ। এক বিদেশি কিশোরী মেয়ে কাঁদছে। তার মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। টেপে লেখা, ‘ইফ ইউ টেল এনিওয়ান (যদি তুমি কাউকে কিছু বল)।’ ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে হয়তো তারা কোনো হুমকিতে রয়েছেন।

পুরো এপ্রিল মাস জুড়েই তাদের ফেসবুকের পোস্টগুলো ছিল বেদনাদায়ক ছবি ও কমেন্টসে ভর্তি।

দুই তরুণীর ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ধর্ষণে অভিযুক্ত প্রধান আসামি সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সরাসরি দুই তরুণীর চরিত্রের দিকে আঙুল তুলেছেন। ধর্ষণের অভিযোগকে ‘আপোষ’ বলে চালানোর চেষ্টা করেন। ৪০ দিন পর মামলার সিদ্ধান্তকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ এর নতুন পন্থা হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের দুই তরুণী ব্যাখ্যা করে বলেছেন, নিজেদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রথমে ধর্ষণের বিষয়টি তারা গোপন করেন। তবে প্রাণনাশের হুমকি এবং ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি শুনে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। কোনো পথ না পেয়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

ধর্ষণের ৪০ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় ওই দুই তরুণীর। ফরেনসিক বিভাগের প্রধানের সোহেল মাহমুদের মতে, ধর্ষণের ২৪ ঘণ্টা পর আলামত মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৪০ দিন পর আলামত পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে ফেসবুকে এই দুই তরুণীর পোস্ট ধর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে কাজ করবে বলে জানা গেছে। মূলত তারা ধর্ষণের পরদিন থেকেই এ ধরণের পোস্ট দেয়া শুরু করেন। ফেসবুক পোস্ট ছাড়াও তাদের বন্ধু শাহরিয়ার, স্নেহা, আলিশা ও নাজিয়া হতে পারে ধর্ষণ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

মঙ্গলবার রাতে এই মামলার তদন্তভার দেয়া হয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের নারী কর্মকর্তাদের। তদন্তের মূল দায়িত্ব পেয়েছেন ইন্সপেক্টর এমি। তার কাছেই মামলার যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।

গত ২৮ মার্চের ‘দ্য রেইন ট্রি’র ধর্ষণ মামলার আসামিরা হলেন- সাফাতের বন্ধু সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল এবং তার দেহরক্ষী আজাদ। গতকাল (৯ মে, মঙ্গলবার) আসামি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাসায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে এ সময় কাউকে বাসায় পাওয়া যায়নি।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>