দুদকের তদন্তের জালে সাত সাবেক এমডি

মে ১৫ ২০১৭, ০৯:২৪

সরকারি চার ব্যাংকের সাত সাবেক এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা হলেনÑ বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সোনালী ব্যাংকের এমডি এম তাহমিলুর রহমান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের একই ব্যাংকের এমডি হুমায়ুন কবির, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি আবদুল হামিদ মিঞা ও এমদাদুল হক, রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, বেসিক ব্যাংকের সাবেক দুই এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম ও ফজলুস সোবহান। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঋণ বিতরণে দুর্নীতি, আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এসব অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি হুমায়ুন কবির, অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আবদুল হামিদ মিঞা ও বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়।

দুদক সচিব আবু মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে বলেন, ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিবেচনায় কার্মকা- চালাতে গিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা এখন এতটাই খারাপ যে মূলধন ঘাটতির কারণে নিজেরা চলতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে জনগণের করের টাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংকে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এমডি হুমায়ুন কবিরের সময় সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়। তার সময়েই হলমার্ক গ্রুপের কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খোয়া যায়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের গ্যারান্টিতে এবং তাদের নামে দেওয়া ভুয়া গ্যারান্টির মাধ্যমে ২৬টি ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

পেশাদার বাণিজ্যিক ব্যাংকার না হয়েও শুধু প্রভাব খাটিয়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি হন হুমায়ুন কবির। তিনি ছিলেন সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এমডি। তার নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি বড় কোনো ব্যাংকের এমডি বা ডিএমডি ছিলেন না। ২০১০ সালের ২০ মে থেকে ২০১২ সালের মে পর্যন্ত তিনি এমডি পদে ছিলেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে বিদায় নিতে হয়। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনি ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এ ঘটনা ধরা পড়ার পর তাদের পরামর্শে অর্থ মন্ত্রণালয় তাকে অপসারণ করে। ওই সময়ে সরকারি ব্যাংকের এমডিদের বাংলাদেশ ব্যাংক অপসারণ করতে পারত না। পরে এ ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে দেওয়া হয়। পরে হলমার্ক জালিয়াতির ঘটনায় তিনি দুদকের শুনানিতে হাজিরাও দেন। বর্তমানে পলাতক।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পান এম তাহমিলুর রহমান। সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘ সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা ও ব্যাংকার হিসাবে সুখ্যাতি থাকার পরও শুধু রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতিতে। তার সময়ে ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ঘটে। এর প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। ওই সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই ঋণ দেওয়া হয়েছিল। বিধিবহির্ভূতভাবে সাবেক এক রাষ্ট্রপতির ছেলেকেও ঋণ দেওয়া হয়েছিল। মাস্ক গ্রুপকেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ১০০ কোটি টাকা ঋণ

দেওয়া হয় বেআইনিভাবে, যা এখন খেলাপি।

২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন এমডি এম তাহমিলুর রহমান। এ ছাড়া এম তাহমিলুর রহমানের সময়ে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের নামে বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ করে ব্যাংক। তাদের কাছ থেকে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ব্যাংক ডলার কিনেছে। ফলে সোনালী ব্যাংকের লোকসান হয়েছে প্রতি ডলারে ২০ থেকে ৩০ পয়সা। কখনো আরও বেশি। ওই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়েও চলমান রয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আবদুল হামিদ মিঞার বিরুদ্ধে সানমুন গ্রুপকে বেআইনিভাবে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পরিচালকের খেলাপি ঋণের তথ্যও গোপন করা হয়। এসব অভিযোগ তাকে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পরে অবসরে যাওয়ার শেষ দিন সানমুন গ্রুপকে বেআইনিভাবে ঋণ দেওয়ার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অপসারণ করে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধেও দুদক তদন্ত করছে।

বিএনপি সরকারের আমলে এমডি ছিলেন এমদাদুল হক। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। তার অবৈধ সম্পদ নিয়ে দুদক এখন তদন্ত করছে।

রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধেও ব্যাংক থেকে বেআইনিভাবে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বড় গ্রুপের নামে ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ এখন দুদক তদন্ত করছে।

বেসিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ জালিয়াতি যখন শুরু, তখন এর এমডি ছিলেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও খ্যাতিমান ব্যাংকার কাজী ফখরুল ইসলাম। কিন্তু বেসিক ব্যাংকে এসে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর চাপে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাকে অপসারণ করার পর ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি হন ফজলুস সোবহান। তদন্তে তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ফলে দুজনের দুর্নীতির বিষয়টিই এখন দুদক তদন্ত করছে।

দুদকের গ্রেপ্তারের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ৯ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ৫৬টি মামলা করা হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় গত বছরের ৭ জানুয়ারি মতিঝিল থেকে বেসিক ব্যাংকের ডিএমডি ফজলুস সোবহানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কিছু করার নেই। বেশিরভাগ অপরাধের ক্ষেত্রে প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এসব অপরাধের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা অন্য ব্যাংকে নতুন করে নিয়োগ পান। এর দায়ভার বেশিরভাগই পড়ে প্রস্তাবিত ব্যাংকের ওপর। এখন ব্যাংকের এমডি নিয়োগ এবং তাদের কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারক করা দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান এ বিষয়ে বলেন, এগুলো নিয়ে দুদক তদন্ত করছে। তাই এখনই কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

বারবার ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান এমডিদের নিয়ে এমন অভিযোগের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যাংকিং একটি বড় সেক্টর। তাই কাজের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে পারে। যদি কারো বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে শাস্তি পায়নি কিংবা তাকে পুনরায় অন্য কোনো ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে তা কখনই ঘটেনি।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>