দুর্গাসাগরে আয় বাড়লেও পর্যটকদের সেবা বাড়েনি

বিধান সরকার: দুর্গাসাগরে আয় বেড়েছে তবে সেবার মান বাড়েনি বলে অভিযোগ পর্যটকদের। পাঁচ বছরের ব্যবধানে আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হলেও পরিচ্ছন্নতা ক্ষেত্রে দৈন্যদশা আগের মতোই বিরাজমান। এ জন্য ঐতিহাসিক দীঘির নাম শুনে দেশ ও বিদেশের পর্যটকরা এখানে আসার পর প্রয়োজনীয় সুবিধা না পেয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

জনবলের অভাবে এমন দশা। প্রাকৃতিক আবহ বজায় রেখেই পর্যটকদের জন্য সুবিধা ও বিনোদনের ব্যবস্থা বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক গাজী মো. সাইফুজ্জামান।

দুর্গাসাগরের তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মী মোসলেম সরদার জানান এর ইতিকথা। রানী দুর্গাবতি ছিলেন রাজা উদয় নারায়ণের স্ত্রী। তার দুই পুত্র লক্ষ্মী নারায়ণ ও জয় নারায়ণ। স্বামী উদয় নারায়ণের মৃত্যুর পরে পুত্র জয় নারায়ণ বালক রাজা হন। ওই সময়ে রানী দুর্গাবতি রাজ্য পরিচালনা করতেন। তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী। প্রজাদের জলপানের সুবিধার্থে তিনি প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮৭০ সালে দীঘি খনন করেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দুর্গাসাগর দীঘির আয়তন ৪৫ একর ৪২ শতাংশ। এর মধ্যে ২৭ একর ৩৮ শতাংশ জলাশয় এবং ১৮ একর ৪ শতাংশ পাড়। রাণী দুর্গাবতির নামে খনন করা এই দীঘিটি পাকিস্তান আমলে গর্ভনর মোনায়েম খান জমিদারদের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করে মৎস্য বিভাগের অধীনে নিয়ে আসেন। তবে সংস্কারের অভাবে কচুরিপানায় ভরপুর দীঘিটি শুকনো মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে যেত। ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এনে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী আ. রব সেরনিয়াবাত দীঘিটি খনন করেন। মাঝখানে পাখিদের সুবিধার্থে দ্বীপ নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিক এই দীঘি দেখতে সারা বছরই পর্যটকদের আগমন ঘটে। এ ছাড়াও পিকনিক ও শিক্ষা সফরে শিক্ষার্থীরা আসেন এখানে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের আগমন বেশি হয়। এ সময় প্রতি শুক্রবারে গড়ে তিন শতাধিক পর্যটক আসেন দুর্গাসাগরে।

কফিলউদ্দিন আহম্মেদ সরকারি কর্মকর্তা এসেছেন ফেনী থেকে। তার বন্ধু ওয়াদুদ আকনের সঙ্গে। দুর্গাসাগর দীঘির বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তবে বসার জন্য তৈরি বেঞ্চি অপরিচ্ছন্ন থাকায় বসার কোনো সুযোগ নেই বলে দাঁড়িয়েই আছেন। চারপাশের হাঁটার সড়ক সরু ও ভাঙা অবস্থায়। পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন। সিঁড়িতে ময়লা পড়ে আছে। তার অভিযোগ প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা করে নেওয়া হলো বটে, তবে সেবার বেলায় এমন বেহাল অবস্থা কেন? বরিশালে এমন স্থান অদ্বিতীয় বলে এই কর্মকর্তা মনে করেন পরিচ্ছন্নতা আর বিনোদনের জন্য ব্যবস্থা থাকলে এই দীঘি পর্যটনের জন্য আরও উপযোগী হয়ে উঠবে।

গৌরনদীর বাটাজোর থেকে দলবল নিয়ে পিকনিক করতে এসেছেন সজীব চৌধুরী, মমতাজ বেগম, কোহিনুর আলমরা। দীঘির পূর্বপাড়ে তারা অবস্থান নিয়েছেন রান্না করার তাগিদে। এদের অভিযোগ চারপাশে ঘাস আর জঙ্গল থাকায় জোঁকের ভয়ে অবস্থান করা মুশকিল। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আরো নজর দেওয়ার দাবি তোলেন তারা।

এদিন কথা হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরণ্য রাশেদের সঙ্গে। বান্ধবীসহ ঘুরতে এসেছেন তবে নিরাপত্তা আর শৌচাগারের অভাবের কথা জানালেন তিনি।

class="aligncenter" src="http://bangla.thereport24.com/article_photo/07.05.17-Barisal-3.jpg" alt="" width="680" height="402" />এ সময় দীঘির পূর্বপাড়ের মৃধা বাড়ির আ. আজিজ মৃধাকে দেখা গেছে নিচু দেয়াল টপকে গোসল করার জন্য আসতে। প্রতিদিনই তারা অসেন বলে স্বীকার করেন আজিজ মৃধা। এমন অবস্থা দক্ষিণ পাড়ের নিরাপত্তা প্রাচীরের বেলায়ও। এ জন্য বখাটেদের উপদ্রব হয়।

এই দীঘিতে বিশেষ করে সাইবেরিয়া থেকে আসা সরাইলের সঙ্গে দেশীয় কিছু বালি হাঁস ও গোনা পানকৌড়ি মিলিয়ে লাখের অধিক পাখি বিচরণ করত। সন্ধ্যায় একযোগে লাখো পাখির দীঘির সীমানা আকাশে ওড়ার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতেন পর্যটকরা। তবে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর পরবর্তীতে ত্রাণের মালবাহী হেলিকপ্টার দীঘির ওপর দিয়ে যাতায়াত করায় বিকট শব্দ পাখিদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। সেই থেকে আর পাখি আসে না।

দীঘি ঘুড়তে এসে পাখি দেখতে না পেয়ে আশাহত হয়ে রাখি সরকার নামে এক পর্যটক বলেন, কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিতে পারেন দীঘির পাড়ের গাছে মাটির হাঁড়ি টানিয় দেশীয় পাখির উপস্থিতি বাড়াতে। এতে করেও আনন্দ পাওয়া যাবে অনেকটা।

এ নিয়ে দীঘির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর খান বলেন, প্রধানত লোকবলের অভাবে এমন অবস্থা। তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। তার ওপরে ভিআইপি মেহমানদের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে ২ জন অফিস সহায়ক এবং চারজন অস্থায়ী কর্মী রয়েছেন দীঘি দেখভালের বিষয়ে। সম্প্রতি একজন পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, নতুন করে টয়লেট নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে পর্যটকদের সুবিধা হবে বলে মনে করেন তিনি।

ভুমি মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা প্রশানের তত্ত্বাবধানে দুর্গাসাগর দীঘির আয় ও ব্যয় দেখভাল করেন অতিরিক্ত নাজির মো. সাইদুল ইসলাম।

তিনি জানান, ১৯৯৬ সালের পর দীঘির উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ আসেনি। ১০ টাকা করে প্রবেশমূল্য, গাড়ি পার্কিং চার্জ, পিকনিক স্পট ভাড়া, মাছধরার টিকিট বিক্রি এই আয় দিয়েই দীঘির উন্নয়ন ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক দীঘির কিছুটা উন্নয়ন করায় আয় বেড়েছে। ২০১৩ সালেও যেখানে বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় হতো সেখানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৮৭ টাকা আয় হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বরিশালে এসে দুর্গাসাগর দীঘি ঘুরে দেখেছেন। তিনি দীঘিটির উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তা এ বছরেই মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মচারী।

পর্যটকদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, দুর্গাসাগর দীঘিটি পর্যটকবান্ধব করতে তার চেষ্টার কোনো কমতি নেই। নিরাপত্তার জন্য আটটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, দীঘির ঘাটলায় টাইলস্ স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের জন্য দুটি হরিণ আর দীঘির মাঝখানের দ্বীপে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হরিণের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটকদের চিত্তবিনোদনের জন্য দীঘিতে দুটি বোট নামানো হয়েছে। অতিথি পাখিদের ফিরায়ে আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহজ কথায় দীঘির প্রাকৃতিক পরিবেশ অটুট রেখে পর্যটনের উপযোগী করা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>