দুর্নীতি বন্ধ না হলে থামবে না পাহাড় ধস, মৃত্যুর মিছিল

আপডেট : June, 14, 2017, 11:33 pm

নিয়ম ভেঙে পাহাড় কাটা, অনিয়ন্ত্রিত লিজ দিয়ে পাহাড়ের বাস্তু নষ্ট, প্রাকৃতিক বাগান উজাড় করে কেবল রাবার বাগান করার মতো বিষয়গুলো বন্ধ না হলে পাহড় ধস থামানো সম্ভব নয়। দিনে দিনে মৃত্যুর যে মিছিল বাড়ছে, তা থামাতে হলে বন্ধ করতে হবে উন্নয়নের নামে জোর করে প্রতিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড। এই পাহাড় প্রতিবেশকে কিভাবে রক্ষা করে সেই বিষয়গুলো আরও বেশি করে মানুষের কাছে তুলে ধরা জরুরি বলেও মনে করছেন পাহাড় বিষয়ক গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
পার্বত্য জেলাগুলোর অধিবাসীরা বলছেন, তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বস্তিবাসীরা বসবাস করছেন পাহাড়ে। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় কয়েক লাখ পাহাড়ি ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে এক লাখেরও বেশি মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন। এক শ্রেণির ভূমিদস্যু অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে বসতবাড়ি তৈরি করে কম টাকায় ভাড়া দিচ্ছে। ইচ্ছামতো পাহাড় কেটে বসবাসের উপযোগী করতে গিয়ে ঘাস ও মাটি ধরে রাখার উপযোগী গাছ না রাখায় এসব এলাকায় ভারি বর্ষণ হলেই মাটি ধরে রাখতে পারে না পাহাড়। যদিও পরিবেশ সংরক্ষণবিধি ১৯৯৫-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী, অবৈধভাবে পাহাড় কেটে পরিবেশ বিনষ্ট করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ১৪২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটিতে সেনা কর্মকর্তাসহ ১০১ জন, বান্দরবানে ৯ জন ও চট্টগ্রামে ৩০ জন মারা গেছেন। এখন অনেকেই মাটির নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন বলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে পাহাড় ধসের ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে ২০০০ সালের পরে। ২০০৮ সালে বান্দরবান শহরের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে, ২০০৭ সালের ১১ জুন টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের আরেক মর্মান্তিক ঘটনায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাহাড়তলি, বায়েজিদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। ২০০৯ সালের ৬ মে বান্দরবানের গ্যালেঙ্গা এলাকায় প্রায় সাতশ ফুট উঁচু পাহাড় ধসে সাঙ্গু নদীতে পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় কোনও প্রাণহানি না ঘটলেও ২৫ ফুট প্রশস্ত সাঙ্গু নদীর অন্তত ১০ ফুটজুড়ে উঁচু বাঁধের সৃষ্টি হয় এবং নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ১৮ মে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের কালিঘাটি উপজেলার চা-বাগানসংলগ্ন পাহাড় বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার তোড়ে ধসে পড়ে। এ ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচ জনসহ মোট ছয় জন ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।

rel="jw_big_image<p data-wpview-marker=">বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহতদের সন্ধানে অভিযান চলে বুধবারেও (ছবি- ফোকাস বাংলা)প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করেন ঢাকা বিভাগের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজিমুদ্দিন খান। তিনি মনে করেন, পাহাড়ের এই ধস কেবল প্রকৃতির সৃষ্টি না। দুর্নীতি বন্ধ না হলে পাহাড়ের এই ধস থামবে না। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো প্রভাবশালীরা হয় কেটে ফেলে না হয় জমিসহ পাহাড়গুলো লিজ দিয়ে দেওয়া হয় বড় বড় শহুরে লোকজনের কাছে। প্রত্যেকে ২৫ একর করে লিজ নিতে পারেন। খাগড়াছড়িতে দেখেছি, একই পরিবারের চার-পাঁচজন সদস্য মাথাপিছু ২৫ একর করে জমি লিজ নিয়েছেন। শহুরে পেশাজীবীরা কেউ কেউ সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে পাহাড়ে লেবু বা আনারসের বাগান করেন। তাদের অনেকে এসব পাহাড় ও জমি অন্য কোনও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে যেনতেনভাবে বা অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে। এতে এখন পাহাড়গুলোর প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্য কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফলে বিপর্যয় নেমে আসে একটু বৃষ্টি হলেই। পাহাড়ে প্রাণহানি তাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।’
২০০৭ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাহাড়তলী, বায়োজিদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর সরকার এর কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি করেছিল। ১১ সদস্যের ওই কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম  বলেন, ‘বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড় ধস হবে— এমন পরিস্থিতি কখনই আসতো না যদি সেখানে মানবসৃষ্ট বৈরিতাগুলো না থাকত। পাহাড়ের ঘাস ও গাছ কেটে পাহাড়কে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এতে করে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ে তৈরি হয় বড় বড় ফাটল। প্রথম বৃষ্টিপাতেই এসব ফাটলের মধ্যে পানি ঢুকে পড়ে এবং মাটির স্তর নড়ে যায়। এ কারণেই পাহাড় ধসে পড়ে। পাহাড় কাটার মতো দুর্নীতিগুলো না থামলে এবং এর বিরুদ্ধে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল বাড়বেই।’
পাহাড়ের অ্যাক্টিভিস্ট ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী ইলিরা দেওয়ান মনে করেন, পাহাড়কে না বুঝে এর বাস্তু নির্ধারণ করা হলে ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতেই থাকবে। তিনি বলেন, ‘সব পাহাড় কিভাবে, কারা একে একে লিজ নিয়ে নিলো, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেও তেমন কিছু করা সম্ভব হয়নি। তবে নিজেদের স্বার্থেই এসব প্রাকৃতিক বন কেটে কৃত্রিম বাগান বানানো এবং সমতলের মতো করেই সার ব্যবহার করে দুর্বল গাছে পাহাড় ভরে ফেলার দায় নানা সময়ে পাহাড়বাসীদেরই চুকাতে হবে।’

Facebook Comments