ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড়: মোরা, বরিশালের উপকূলে মহাবিপদ

আপডেট : May, 30, 2017, 4:07 am

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র কারণে মহাবিপদে আছে উপকূলের মানুষ। এর কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৭ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়টি আরও শক্তিশালী হয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চর এলাকাকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া, মংলা ও পায়রা বন্দরকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চর এলাকাকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।ঘূর্ণিঝড় উপকূল অতিক্রম করার সময় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।

উপকূলের ১০ জেলার অন্তত তিন লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সোমবার রাত ১২টায় এ রিপোর্ট লেখার সময়ও দুর্গততে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছিল। তখন ‘মোরা’ কক্সবাজার থেকে ২৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নিয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে দেশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন ভিয়েনায় অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্যোগ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

‘মোরা’র কারণে সারাদেশে নৌ চলাচল বন্ধ রয়েছে। নৌপথে বিচ্ছিন্ন রয়েছে বরিশাল বিভাগ। ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাজধানীরর সঙ্গে বিভিন্ন জেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বরিশালে বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ। উপকূলের নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজারের নিম্ন এলাকায় ফসলের জমি ও বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বৃষ্টি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় বইছে ঝড়ো হাওয়া।

গত শনিবার বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি গতকাল সকালে তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। থাইল্যান্ডের প্রস্তাবে ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘মোরা’, যার অর্থ ‘সাগরের তারা’। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, সোমবার রাত ১০টায় ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩০৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার বন্দর থেকে ২৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে, মংলা ও পায়রা বন্দর থেকে ৩৮০ ও ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করছিল।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাগরে চলাচলকারী সব ধরনের নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। মংলা ও পায়রা বন্দরকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চর এলাকাকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশের

প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার, যা দমকা হাওয়ায় ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝড়ের গতি ৮৯ থেকে ১১৭ কিলোমিটার হলে তাকে তীব্র ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। বাতাসের গতি ১১৮ থেকে ২১৯ কিলোমিটার হলে হারিকেন বলা হয়। ঝড়ের গতি ২১৯ কিলোমিটারের বেশি হলে সুপারসাইক্লোন বলা হয়। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটারের বেশি হলে এবং ঘূর্ণিঝড়টি বন্দরের ওপর বা পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানো হয়।

২০০৭ সালের ১১ নভেম্বর আঘাত হানা সিডরের গতি ছিল ২১৫ কিলোমিটার। ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা আইলার গতি ছিল ১২০ কিলোমিটার। সিডরে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারান। আইলায় প্রাণ যায় ৩২৫ জনের। নিখোঁজ হন আরও অনেকে। সিডর ও আইলার সময়ও ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়। আট বছর পর আবারও ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূলবাসী।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, আজ মঙ্গলবার সকালে উপকূল অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড় মোরা। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে স্থলভাগে আসবে। এ সময় ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ শামীম হাসান ভূঁইয়া বলেন, ভারি বর্ষণ হলে ঘূর্ণিঝড় শক্তি হারাবে। যত বেশি বৃষ্টি হবে, ততই দুর্বল হয়ে পড়বে মোরা। উপকূল অতিক্রম করার পর নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভারতের ত্রিপুরা, সিলেট হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে গিয়ে ঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়বে। এসব এলাকায় ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের একজন আবহাওয়াবিদ জানান, ‘মোরা’ শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় না হলেও আকারে অনেক বড়। ব্যাস অনেক বিস্তৃত। আইলাও খুব শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল না। কিন্তু বিস্তৃত ব্যাসের কারণে অনেক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘মোরা’র ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা রয়েছে। জোয়ারের সঙ্গে ‘সিনক্রোনাইজ’ করে সাত থেকে আট ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করতে পারে। তবে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা না থাকার কারণে এমনটা হওয়ার শঙ্কা কম।

উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ‘মোরা’র কারণে উপকূলে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিনভর আবহাওয়া গুমোট হয়ে থাকলেও সন্ধ্যার দিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শঙ্কা আরও বাড়ে।

এছাড়া পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, বরগুনার পাথরঘাটা এবং ভোলার চরফ্যাশনে উপকূলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলার জেলা প্রশাসন জরুরি সভা করে প্রতিটি উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার নির্দেশ দিয়েছে।

বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বরিশাল থেকে সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ থাকবে।

সূত্রঃসমকাল
Facebook Comments