নজরদারিতে ৯শ গার্মেন্টস- বেতন-বোনাস নিয়ে সম্ভাব্য গোলযোগের আশঙ্কা

জুন ১৭ ২০১৭, ১৬:৩৭

আসছে ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা হতে পারে—এমন নয়শ গার্মেন্টস কারখানাকে বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সমন্বয়ে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, শিল্পাঞ্চল পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে সাড়ে চারশ কারখানার তালিকা তৈরি করা হয়। বাকি সাড়ে চারশ কারখানার তালিকা তৈরি করেছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুপারিশে এসব কারখানাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে ২শটি ঢাকা মহানগর এলাকায়। চট্টগ্রামে রয়েছে দেড়শ। আর বাদবাকি কারখানার অবস্থান গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য এলাকায়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য নয় এমন কারখানাও তালিকায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শিল্প-কারখানার পাওনা পরিশোধ পরিস্থিতি নিয়ে আগামীকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।

যোগাযোগ করা হলে বিজিএমইএর সহ-সভাপতি এস এম মান্নান কচি এই তালিকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, তালিকায় থাকা প্রায় সব কারখানাই অপেক্ষাকৃত ছোট ও স্বল্প পুঁজির। এসব কারখানা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিজিএমইএর বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। কারখানা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দুই একটি কারখানা বাদে সব সমস্যা সমাধান করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অসন্তোষ প্রবণ আশুলিয়া এলাকায় শিল্পাঞ্চল পুলিশ ছাড়াও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি করছে। নিয়মিত নজর রাখছে বিজিএমইএ। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদীর নেতৃত্বে একটি টিম সেখানকার বেতন-বোনাস পরিস্থিতি নিয়মিত তদারক করছে। গত মঙ্গলবার আশুলিয়া এলাকার মালিকদের একটি অংশকে নিয়ে রাজধানীর বিজিএমইএ ভবনে সভা হয়েছে। সভায় ২০ রোজার মধ্যে (শুক্রবার) শ্রমিকদের বোনাস দেওয়া ও ঈদের আগে চলতি মাসের অন্তত ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আব্দুস সালাম মুর্শেদী। তিনি বলেন, যথাসময়ে বেতন-বোনাস দিতে আমরা সব কারখানা মালিককে সতর্ক করে দিয়েছি।

গত জানুয়ারিতে আশুলিয়ায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করলে তা শেষ পর্যন্ত ৫০-এর অধিক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ করা, চাকরীচ্যুতি এবং মামলা পর্যন্ত করতে হয়। এর জেরে মালিক পক্ষ ও সরকারকে কড়া বার্তা দেয় (প্রধান রপ্তানি বাজার) ইউরোপের দেশগুলো। এমনকি সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জিএসপি বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চলমান আইএলওর ইন্টারন্যাশনাল লেবার কনফারেন্সেও (আইএলসি) ইস্যুটি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ কারণে এবারের ঈদে শ্রম অসন্তোষ প্রবণ এলাকার

দিকে বিশেষ নজর রেখেছে সরকার।

তবে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বেশকিছু কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে ইতোমধ্যে সমস্যা তৈরি হয়েছে। শ্রমিক নেত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার এ রকম অন্তত ২০টি কারখানার নাম বলেছেন।

তিনি জানান, শেড ফ্যাশন নামে একটি কারখানা শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধ না করে সম্প্রতি বন্ধ করে দিয়েছে। এ নিয়ে শ্রমিকরা বিজিএমইএ ও কাওরান বাজারে অবস্থিত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) সামনে সভা-সমাবেশ করেছে। গত ৯ জুন কিছু টাকা পরিশোধ করলেও বাদবাকি টাকার জন্য শ্রমিকরা এখন বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন। গাজীপুরের শিমুলতলার শ্রেয়সী ফ্যাশন নামে একটি কারখানা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করে বন্ধ করে করে দেয়। গত তিন মাস ধরে এটি বন্ধ। মামলা চলছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। জিরানিবাজারে অবস্থিত তুংহাই সোয়েটার কারখানা এক মাসের বেতন না দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। গাজীপুরের বোর্ডবাজারে অ্যামনু সোয়েটার নামে একটি কারখানায় ঝামেলা চলছে। ইন্টারফ্যাব ম্যানুফেকচারার্স লিমিটেড নামে একটি কারখানা খোঁড়া অজুহাত তৈরি করে শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। এ তালিকায় আরো রয়েছে উত্তরায় মোল্লারটেকে অবস্থিত সাহারা ফ্যাশন, মিরপুরের কনকর্ড গার্মেন্টস, হোপলুন, টঙ্গি বড়বাড়িতে অবস্থিত ডোডিওয়্যার এক্সপোর্ট লিমিটেড, টিআরজেড, আশুলিয়ার পলাশবাড়িতে অবস্থিত উইলিয়াম সোয়েটার, এস এম ডেনিম গার্মেন্টস, মালিবাগের ড্রাগন সোয়েটার, নারায়ণগঞ্জের কানন নীট ফ্যাশন, বিআরএ ডিজাইন, আলী অ্যাপারেল। এর মধ্যে অবশ্য কয়েকটি কারখানার সমস্যা সাময়িক সমাধান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যান্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বহুল আলোচিত সোহান গার্মেন্টসের মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝামেলা মেটার পর শ্রমিকরা তাদের পুরো পাওনা অর্থ পাননি। তাদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। জলি তালুকদার বলেন, রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে এ রকম আরো বেশকিছু কারখানা রয়েছে। ঈদের আগে অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করে। ফলে এ সময়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করে।

প্রসঙ্গ বোনাস

মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০ রোজার মধ্যে গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের উৎসব বোনাসের অর্থ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল নাগাদ ২০ শতাংশ কারখানা এ অর্থ পরিশোধ করেছে বলে জানিয়েছেন সাবেক বিজিএমইএ আব্দুস সালাম মুর্শেদী। অর্থাৎ ৮০ শতাংশ কারখানাই সময়মত বোনাস পরিশোধ করতে পারেনি। সালাম মুর্শেদী বলেন, শুক্রবার থাকায় অনেক কারখানাই বন্ধ। এ কারণে এ সমস্যা হয়েছে। তবে আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবারের মধ্যে সব কারখানাই বোনাসের অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। এছাড়া চলতি মাসের ১৫ দিনের বেতন ছুটির দিন দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>