নলছিটির মুড়ি পল্লীতে ব্যস্ততা

মে ২৩ ২০১৭, ০৮:৩৮

বরিশাল: আসন্ন মাহে রমজান উপলক্ষে মুড়ি ভাজায় ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছে বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি’র নলছিটি উপজেলার মুড়িপল্লীর নারীরা। এ ইউনিয়নে সারাবছর ধরেই মুড়ি ভাজার কাজ চললেও রমজান মাসে মুড়ির চাহিদা বেরে যাওয়ায় এ কাজে তাদেরও বেরে যায় ব্যস্ততা।

তাই রমজান মাস আসার আগেই সেখানে দিন-রাত এক করে সমানে চলছে মুড়ি ভাজার কাজ। নিজ হাতে বানানো মোটা চালের মুড়ির জন্য এ এলাকার সু-ক্ষ্যাতি রয়েছে গোটা দেশ জুরে।

নলছিটির তিমিকাঠি এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, শত বছর ধরে এসব এলাকার কয়েক’শ পরিবার কেবল মাত্র মুড়ি ভেজেই তাদের  জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এসব পরিবারের নারী সদস্যরাই রয়েছে মুড়ি ভাজার মুল ভুমিকায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ওই মুড়ি বাজারজাত করে থাকে।

ভরকাঠি গ্রামের খান বাড়ির ইউসুফ আলী খানের স্ত্রী রেহেনা বেগম বলেন, নতুন বৌ হিসেবে এই বাড়িতে এসে পরিবারের সকলকে মুড়ি ভাজার কাজে ব্যাস্ত দেখেছি। সেই থেকে তিনিও এই মুড়ি ভাজার কাজের সাথে সামিল রেখেছেন। সুস্বাদু এ মুড়ি ভাজায় তার রয়েছে দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিগ্যতা।

তিনি জানান, মুড়ি ভাজতে হলে হাতের কৌশল জানাটা অনেক বেশি প্রয়োজন। পাশাপাশি মুড়ি ভাজা উপজোগী মাটির চুলার ও সরঞ্জামের গুরুত্বও অনেক।

তিনি বলেন, প্রথমে মোটা চাল লবন পানির সাথে মিশিয়ে মাটির পাত্রে হালকা ভাজতে হয়। এক্ষেত্রে ৫০ কেজি বস্তার চালের জন্য ১ কেজি লবণের প্রয়োজন হয়। চাল ভাজার পাশাপাশি অপর মাটির পাত্রে ভিটি বালু ও চিকন বালি মিশিয়ে গরম করতে হয়।

এরপর মাটির অপর পাতিলের মধ্যে গরম বালি ঢেলে দিয়ে সাথে সাথে লবন পানি মেশানো ভাজা চাল ঢেলে দেন। এরপর ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের নারাচাপরায় তৈরি হয়ে যায় ভালো মানের সু-স্বাদু মুড়ি।

তিনি বলেন, চুলার তাপ ও সংসারের কাজের জন্য রাত ৩ টা থেকে সকাল ৯

টার মধ্যেই সবাই চেষ্টা করেন ওই দিনের ভাজার কাজ শেষ করতে। একদিনে ৫০ থেকে ১ শত কেজি মুড়িও ভেজে থাকেন তারা। তবে রমজান মাসে মুড়ি বারতি চাহিদা থাকায় আগে থেকে দিন রাতে সমানে কাজ করতে হয় মুড়ি ভাজায়।

ওই গ্রামের মুনসুর আলী খান (৬২) বলেন, আড়তদারদের দেয়া চালে ৫০ কেজির এক বস্তা চালে ৪২/৪৩ কেজি মুড়ি হয়। মুড়ি ভাজার লাকড়ি, হাড়ি-পাতিলের খরচ দিয়ে ৫০ কেজি মুড়ি ভেজে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ শত টাকা পাওয়া যায়। যার মধ্যে খরচ বাদে টেকে মাত্র আড়াই’শ টাকা।

কলেজ পড়ুয়া ছাত্র তাকিন জানান, ছোট বেলা থেকেই মুড়ি ভাজা কাজে মা’কে সাহায্য করে আসছেন। যে কষ্ট সে অনুযায়ী শ্রমমূল্য না পেলেও এটি একটি শিল্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলেও দাবি এ কলেজ ছাত্রের।

স্থানীয় আড়তদার মো. ইউসুফ আলী হাওলাদার  জানান, এ অঞ্চলের হাতে ভাজা মোটা মুড়ির জনপ্রিয়তা ও কদর থাকলেও মেশিনে ভাজা চিকন মুড়ির কারনে দামের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। মেশিনে বানানো মুড়ির দাম কম হওয়ার কারনে হাতে বানানো মোটা মুড়িও দাম কমিয়ে বিক্রি করতে হয়।

তিনি বলেন, এ অঞ্চলের ৪/৫টি আড়ত রয়েছে। যার একটি থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫০/৫৫ কেজির ৭-১০ টি বস্তা মুড়ি অন্যত্র যায়। তবে আসন্ন মাহে রমজান’র কারনে এখন যাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ বস্তা।

রোজার আগে এতো চাপ বেড়ে যায়, যে দক্ষ জনবল থাকার পরও চাহিদা অনুযায়ী মুড়ি ভাজা সম্ভব হয় না। বেশিদিন আগে মুড়ি ভেজে রাখলে তা নেতিয়ে যায়।

এদিকে, রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার ব্যতিত বরিশালের এ মুড়ি রাজধানী ঢাকা ও ফরিদপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বাজারে সু-খ্যাতির সাথে বিক্রি করা হচ্ছে। উৎপাদনের ব্যপকতার কারনে নলছিটির এই গ্রামগুলো এখন মুড়িপল্লী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

সেখানকার চার আড়ত ঘুরে জানা গেছে, এ অঞ্চল থেকে এখন প্রতিদিনে প্রতিদিন দেড় থেকে তিনশ মন মুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। যা কেজি প্রতি ৭০ টাকা দরে আড়তদাররা বিক্রি করছেন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>