নো মোর ফেসবুকিং!

মে ০৮ ২০১৭, ২২:১৪

টানা দুদিন ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বৈশাখে এমন বৃষ্টি খুব একটা দেখা যায় না। বৃষ্টিময় দিনে আর কিছু ভালো লাগুক না লাগুক অফিস করতে মোটেই ভালো লাগে না। অবশ্য অলসদের কখনই অফিস করতে ভালো লাগে না। ভালো লাগে দুপুরে একটু ঝাল–ঝাল ভুনা মাংস দিয়ে খিচুড়ি খেতে। খাওয়া শেষে ঝাল কমাবার জন্য গলির মোড়ের অশোকের দোকান থেকে আনা দুই পিছ স্পঞ্জ রসগোল্লা খেতে। তারপর টিভি ছেড়ে সোফায় শুয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসার আগ পর্যন্ত ধোঁয়া উড়িয়ে তাতে দম দিতে থাকা। এ সময় বেশ আয়েশ করে একটা সিগারেট ধরাবার নিয়ম লেখা আছে শাস্ত্রে। এরপর জানালার গ্রিলে আটকে থাকা স্নিগ্ধ জলকণাগুলো বেয়ে পড়ার সুন্দর এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি এত সুখী কেন ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়া। আমার বউ আবার সিগারেট বান্ধব। এমনিতে সে কাঁচামরিচ, গোলমরিচের আর কাগজি লেবুর একটা কম্পাইলেশন। বাসায় সিগারেট খেলে কিছুই বলবে না কিন্তু দিনের বেলা ঘুমালে সারাক্ষণ খিটখিট করবে। তাই ঘুম যখন দিতে পারব না, ছুটি না নিয়ে অফিস আসাই ভালো।

সকাল সকাল কাদা পানি ভেঙে আজ তাই অফিস এলাম। অফিসে তেমন কোনো কাজের চাপ নেই। তা ছাড়া বসও কয়েক দিনের জন্য দেশের বাইরে গেছেন। ও বলা হয়নি, আমি উত্তর-দক্ষিণ ড্রিম বিল্ডিং নামক একটা আবাসন কোম্পানিতে কাস্টমার রিলেশন সেকশনে চাকরি করি। অফিস মহাখালীতে। অফিসে আমরা সব মিলিয়ে এক ডজন কর্মচারী। এখন তেমন কোনো কাজ নেই। তাই অনেক দিন বাদে একটু মার্ক জাকারবার্গের রাজত্বে ঢুঁ মারতে ইচ্ছে হলো। লগ ইন করলাম। প্রথম নিউজ ফিডে তাকাতেই দেখলাম হাবলু নামে একজন লিংক শেয়ার করেছেন। বাহুবলি মুভির কোন চরিত্রটি আপনার সাথে মানায়? ডিজিটাল গণকের তথ্য অনুযায়ী তার চরিত্র নাকি মহেন্দ্র বাহুবলির মতো। লাইক দিতে গিয়েও দিলাম না। কারণ এই প্রোফাইলের মালিক লিকলিকে পাতলা। কিছুটা হিরো আলমের সঙ্গে যায়। সে মোটা হওয়ার জন্য কলিকাতা হারবাল থেকে লন্ডনি দাওয়াখানা দৌড়াদৌড়ি আর দুর্বা গাছের রস থেকে বট গাছের রস খাওয়া কোনোটাই বাদ দেয়নি। মনে মনে চিন্তা করলাম, ধুর তাকে লাইক দেব না।
পরের পোস্ট হাসেম বিন কালু নামে একজন। একটি ছবি পোস্ট করেছেন আর লিখেছেন এটা বাঁশগাছের ফুল। যারা প্রথম দেখলেন তারা আমিন না লিখে যাবেন না। আমি কমেন্টে আমিন লিখলাম না। কিন্তু লাইক দিলাম কারণ সে অনেক কষ্ট করে ছবিটা এডিটিং করেছে আর ভালোও হয়েছে। বাহ ভালো সিস্টেম তো, ফেসবুকেও আমিন লিখে আজকাল ছোয়াব কামানো যায় দেখছি!
পরের পোস্ট, রূপকথার রাজকন্যা নামে একজন ঊর্ধ্ব গগনে হাত তুলে মুখখানি যত টুক সম্ভব বাঁকা

করে একটা ফটো আপলোড করেছেন। তাতে ক্যাপশন লেখা সাহস থাকলে সত্যি করে বল, আমাকে কেমন লাগছে? আমাকে তোমরা কি হিসেবে পেতে চাও? আমি কমেন্টে লিখলাম সেইরকম লাগছে। সঙ্গে একটা লাভ রিয়াক্ট দিয়ে সাহসের পরিচয় দিলাম। এসব ব্যাপারে আমি বরাবরই একটু সাহসী কিনা।
পরের পোস্ট, ভীত মানুষ নামে একজন প্রোফাইলের মালিক একটা লিংক শেয়ার করেছেন, কে আপনাকে কোপাইতে চায়? চাপাতির এই রমরমা বাজারে এই লিংকটা দেখেই কেমন বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। আমাকে আবার না জানি কে কোপাইতে চায়। আজকাল অফিসে আমার শত্রু সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। আমার ঠিক পেছনের ডেস্কেই বসেন হাইপারবলিক শেফের মতলব সাহেব। তার কখন কি যে মতলব তা ঠাহর করা মুশকিল। এই ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়াই এর ওর ডেস্কে উঁকি দেবেন আর যত সব আজগুবি গল্পের প্লট ভাঁজবেন। এইতো আমাদের নতুন কলিগ সানি সাহেবের একটা বিয়ে ঠিক হলো। মতলব সাহেবের কাছে কথায় কথায় বললেন সে কথা।
মতলব সাহেবে জিজ্ঞেস করলেন কন্যার হাইট কত? সানি বললেন পাঁচ ফুটের কাছাকাছি মনে হয়। এটা শুনে মতলব সাহেবে বললেন, তুমি আমার জুনিয়র, ছোট ভাইয়ের মতো, প্রথম বিবাহ বলে কথা। তাই বলছি, একখানা প্রবাদ আছে বাটি (বেঁটে), শয়তানের লাঠি! তো একটু বুঝেশুনে অগ্রসর হইয়ো আর কি! গেল সেই বিয়েটা ভেঙে। এর আরও কিছুদিন পর সানি সাহেব বহু প্রতীক্ষিত একটা কন্যার সন্ধান পেলেন। মেয়ের ছবি দেখে মতলব সাহেব বললেন মেয়ে তো চাপা শ্যামলা হে। তোমার মেয়েরা সব কালো হবে, তাদের বিয়ে দিতে গিয়ে তোমার দম বেরিয়ে যাবে। অনাগত অন্ধকার ভবিষ্যতের আশঙ্কায় সানি সাহেব পুনরায় বিয়েটা ভেঙে দিলেন। আশা করা যাচ্ছে, তিনি এই অফিসে চাকরি করা পর্যন্ত বিয়ে করতে পারবে না।
আমি আবার তার এই সব আফিম খুরি গপ্প শুনি না, তালে তাল দিই না। এ জন্য তার হিংসার তালিকায় আমি এক নম্বরে। তাই সে আমাকে কোপাইতে চায় কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লিংকটাতে ক্লিক করলাম। এরপর যা দেখলাম, তাতে বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল। একি, এত দেখি আমার বউ আমাকে কোপাইতে চায়! হায় হায় আমি এত দিন একটা বেকার মেয়ের ভরণপোষণ দিলাম আর সেই কিনা এখন আমাকে কোপাইতে চায়! ডিজিটাল গণকের এই কথা কোনোভাবেই মিথ্যা হতে পারে না। কয়েক দিন ধরেই তাকে বাহুবলি শাড়ি কিনে দিইনি বলে সে মেজাজ দেখাচ্ছে। তাহলে এই ছিল তোমার মনে। দেখলাম মতলব সাহেব আমার ডেস্কের দিকেই তাকিয়ে আছেন। ফেসবুক লগ আউট করে বহু কষ্টে রাগ সামলে মনে মনে বললাম, নো মোর ফেসবুকিং!

*খায়রুল বাশার: গবেষক, থার্মাল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব, সাগা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>