পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো প্রথম দৃশ্যমান হবে জাজিরা প্রান্তে

মে ২৪ ২০১৭, ১০:৫১

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ শুরুতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা থেকে অগ্রগতি ৫-৬ শতাংশ কম। পিলারের ওপর ইস্পাতের মূল কাঠামো স্থাপন কিছুটা পিছিয়ে গেছে। প্রকল্পের কাজের এই পর্যায়ে নদীর তলদেশের মাটির কিছু সমস্যার কারণে এমনটা হয়েছে। প্রকল্পের নথি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে দুটি পিলারের মধ্যে একটি ইস্পাতের কাঠামো (স্প্যান) বসানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। নকশা অনুসারে ইস্পাতের এই কাঠামোর ভেতর দিয়েই হবে রেলপথ। আর ওপর দিয়ে থাকবে যানবাহন চলাচলের পথ।

এখন কাঠামো বসানোর কাজ জুলাইয়ে শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো প্রথমে বসানো হবে দক্ষিণ প্রান্তে। ফলে জাজিরার দিক থেকে সেতু প্রথম দৃশ্যমান হবে।

সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সেতু বিভাগ। সেই পরিকল্পনায় চার বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা একাধিকবার জানিয়েছেন।

গত এপ্রিল পর্যন্ত অগ্রগতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে, মূল সেতু ৩৭ শতাংশ ও নদীশাসনের কাজ ৩০ শতাংশ এগিয়েছে। এর বাইরে দুই পারের সংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা, সহায়ক অবকাঠামো, পুনর্বাসনের কাজ প্রায় শেষ। সব মিলিয়ে প্রকল্পের কাজ ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুটি চালু করতে হলে আগামী প্রায় দেড় বছরে আরও ৫৮.৫ শতাংশ কাজ করতে হবে।

সেতু বিভাগের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, সরকার নির্বাচনের আগেই সেতুটি চালু করতে চায়। সবাই সর্বাত্মক চেষ্টাও করছে। কিন্তু পদ্মা নদীর গঠন এবং এর আচরণ নানা অনিশ্চয়তায় ভরা। ফলে মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ বেশ জটিল। প্রতি পদে পদে চ্যালেঞ্জ আসছে। এরপরও সময়মতো কাজ শেষ করার ব্যাপারে আশাবাদী তাঁরা।

মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। দুই পাড়ের ডাঙার অংশ ধরলে দৈর্ঘ্য হবে ৯ কিলোমিটারের বেশি।

তিন দফা সংশোধনের পর পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। সাধারণত তিনবারের বেশি প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের সুযোগ নেই। তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রয়োজন হলে আরও সংশোধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এখন প্রায় তিন হাজার লোক কাজ করছে। তবে কর্মীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে-কমে। শুকনো মৌসুমে বেশি লোক কাজ করে। আবার বর্ষায় কিছুটা কমে যায়। কর্মরত মানুষের মধ্যে আট শতাধিক বিদেশি, যাঁদের বেশির ভাগই চীনের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপানসহ আরও অনেক দেশের নাগরিক আছেন। তাঁদের বেশির ভাগ পরামর্শক।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সেতু বিভাগের সচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বিষয়গুলো পুরোই কারিগরি। তাই এই বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক কথা বলবেন। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলামের কাছে গেলে তিনি বলেন, তাঁর কথা বলার অনুমতি নেই।

এখন কী কাজ হচ্ছে

সম্প্রতি পদ্মা সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী ও ডাঙা মিলিয়ে ১৭টি স্থানে বড় বড় ক্রেন ও অন্য যন্ত্র বসিয়ে কাজ চলছে। এই স্থানগুলোতে পিলার উঠবে। ১ থেকে ৪২ পর্যন্ত নম্বর দিয়ে প্রতিটি পিলারের স্থান চিহ্নিত করা আছে। ১৭টি পিলারের স্থানে কোথাও চলছে পাইল বসানোর কাজ। কোথাও পাইলের ওপরে ক্যাপ নির্মাণ হচ্ছে। এই ক্যাপের ওপরেই পিলার নির্মাণ করা হবে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, নদীতে থাকা ৪০টি পিলারের নিচের পাইল ইস্পাতের। আর ডাঙার দুটি পিলারের পাইল কংক্রিটের। নদী ও ডাঙা মিলে ছয়টি পিলার নির্মাণের স্থানে এখন পর্যন্ত পাইল

বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১১টি পিলারের স্থানে পাইল বসানোর কাজ চলমান আছে। আর তিনটি স্থানে পাইলের ওপর ক্যাপ বসানো হয়েছে, যার ওপর পিলার নির্মাণ করা হবে।

নদীতে যেসব পাইল বসানো হচ্ছে, সেগুলো তিন মিটার ব্যাসার্ধের ইস্পাতের বড় বড় পাইপ, যার ভেতরটা ফাঁপা। প্রতিটি পিলারের নিচে ইস্পাতের এমন ছয়টি করে পাইল বসানো হচ্ছে। আর ডাঙার দুটি পিলারের নিচের পাইল আছে ৩২টি, যা গর্তের মধ্যে রড-কংক্রিটের ঢালাইয়ের মাধ্যমে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাওয়া প্রান্তে পদ্মার পাড়ে চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির বিরাট নির্মাণ মাঠে ইস্পাতের কাঠামো জোড়া লাগানোর কাজ চলছে। সোনালি রঙের এই কাঠামোগুলোই স্প্যান হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার, যা এক পিলার থেকে অন্য পিলারের দূরত্বের সমান। এর ওজন প্রায় তিন হাজার টনের কাছাকাছি। সাতটি স্প্যান তৈরির মতো সরঞ্জাম চীন থেকে পদ্মা সেতু এলাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে তিনটি স্প্যানের কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এসব ভারী কাঠামো নির্মাণ মাঠ থেকে উঠিয়ে পিলারের ওপর বসানোর জন্য চার হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ক্রেন এসেছে গত বছরের অক্টোবরে। কাজ দেরি হওয়ার কারণে সাদা রঙের এই ক্রেন মাঝনদীতে অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাজ দেরি হয়েছে বলে এখন একটির বদলে একসঙ্গে পাঁচটি স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত পিলারের ওপর এসব স্প্যান বসানো হবে। এর সব কটিই জাজিরা প্রান্তে অবস্থিত।

দ্বিতল পদ্মা সেতুর নিচের অর্থাৎ ভেতরের অংশে রেললাইন বসাতে হবে। এর জন্য আলাদা প্রকল্প আছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের। আর ইস্পাতের কাঠামোর ওপরের অংশে যান চলাচলের উপযোগী পথ তৈরি করতে দুই মিটার পুরো তিন হাজার কংক্রিটের স্ল্যাব বসানো হবে। এর ওপর দেওয়া হবে বিটুমিনের স্তর।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, বিপুল ওজনের ইস্পাতের কাঠামো মাওয়া প্রান্তে রেখে দেওয়া হয়েছে। স্থাপন করার জন্য জাজিরা প্রান্তে ক্রেনে করে পরিবহনের সময় ঝড়ের কবলে পড়বে কি না, সেই শঙ্কা কাজ করছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। এ জন্য জাপান থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার আধুনিক যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ২৪ ঘণ্টা আগেই আবহাওয়ার অবস্থা জানাবে।

পাইল আরও গভীর করতে হচ্ছে

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, মূল নকশায় মাটির নিচে ৯০ থেকে ১২০ মিটার গভীর পর্যন্ত পাইল বসানোর কথা বলা হয়েছিল। সেই অনুসারে কাজ শুরুও হয়। কিন্তু পাইল বসাতে গিয়ে দেখা যায়, ১৩০ মিটার গভীর পর্যন্ত শক্ত মাটি বা পাথরের স্তর নেই, যা সেতুর প্রয়োজনীয় ভার বহনের সক্ষমতা বাড়ায়। সাধারণত মাটির নিচের শক্ত স্তর পর্যন্তই পাইলিং করা হয়। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের সময় ৭৮ মিটার মাটির নিচেই শক্ত পাথরের স্তর পাওয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে পদ্মা নদীর তলদেশের মাটি একাধিকবার পরীক্ষা করা হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা একাধিক বৈঠক করে গত মার্চে কিছু পাইল আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত দেন। মোট ২৪০টি পাইলের মধ্যে ১২৬টি পাইল নকশায় উল্লেখ করা গভীরতায় বসালেই চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

পদ্মা সেতুর প্রকল্পের মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ তদারক করছে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাদের ওপরে রয়েছে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল। ১১ সদস্যের এই প্যানেলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও কলম্বিয়ার সেতু বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর নকশায় উল্লেখ করা গভীরতার চেয়ে আট মিটার বাড়িয়ে ৬২টি পাইল ১২৮ মিটার পর্যন্ত বসানো হয়েছে। আর কোনো পাইলের গভীরতা বাড়ানো প্রয়োজন কি না, তা জানার জন্য আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

জানতে চাইলে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, পাইলের গভীরতা কী হবে, এই নিয়ে জটিলতা হয়েছে। আসলে মাটির নিচের নরম মাটির একটি স্তর পাওয়া গেছে, যা যতটা গভীরে আশা করা হয়েছিল, তার চেয়ে ওপরে পাওয়া গেছে। পরামর্শক ও ঠিকাদারকে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে আলোচনা চলছে। এক মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>