পুরষ্কারের বদলে পুলিশী হাতকড়া, এই লজ্জা কার?

জুলাই ২১ ২০১৭, ১৫:৫৮

জল-জোছনা ও আমার কবিতার শহর সুনামগঞ্জের তরুণ কবি ও প্রকাশক রাজীব চৌধুরী আমাদের অতি স্নেহভাজন। তার চৈতন্য প্রকাশনী, তার একক সংগ্রাম ও স্বপ্নের নাম। তার মেধা, শ্রম ও বিনয়ী আচরণ দিয়ে চৈতন্য প্রকাশনী ডালপালা অনেক বিস্তৃত করেছে। বৃক্ষটি দিনে দিনে হৃষ্ট, পুষ্ট ও শক্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে লিখেছে, গত বছরে একুশের বই মেলায় কবি তারিক সালমনের কবিতার বই ‘সহজ প্রেমের কবিতা’ প্রকাশ করি। কবির হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি বিবৃতির অভিযোগে হাতকড়া দেখে আমার চোখ ফেটে কান্না এসেছে।’ একজন সৃজনশীল মানুষ হিসাবে শিশুদের নিয়ে দারুণ উদ্যোগ নিয়েছেন কবি তারিক সালমন। শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় জনের নির্বাচিত ছবি তিনি নিয়েছেন আমন্ত্রণপত্র সাজানোর জন্য। যেখানে তার প্রশংসা প্রাপ্য, সেখানে তিনি হচ্ছেন লাঞ্ছিত। কবির হাতে হাতকড়া দিয়েছে যে প্রশাসন তাদের এহেন কাজের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাওয়া বলে আমি মনে করি।

বরগুণা সদরের ইউএনও গাজী তারিক সালমন একজন তরুণ সরকারি কর্মকর্তাই নন, একজন সৃষ্টিশীল মানুষই নন, একজন কবিও। পেশাদারিত্বের দক্ষতার সাথে কবি ও শিল্পী হৃদয় নিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসাবে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বরগুণার আগে তিনি বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সময় মহান স্বাধীনতা দিবসে শিশুদের যে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন সেখানে স্বাধীনতা ও আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আঁকা একটি শিশুর ছবি দিয়ে তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণপত্র তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতা দিবস চলে গেছে মার্চে। কিন্তু বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু ৭ জুন বরিশাল মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ৫ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেন।

শিশুদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার প্রতি চিন্তা, চেতনা, আগ্রহ ও ভালোবাসা জন্ম দিতে গিয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিলেও তার বিরুদ্ধে এই ধরণের মামলা সিনিয়র আইনজীবীরাও বলেছেন হয়রানিমূলক। তিনি সেই জামিনযোগ্য মামলায় আদালতে হারিজা দিতে গেলে তাকে বুধবার প্রথমে আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। কিন্তু উপর মহলের চাপের মুখে ২ ঘন্টা পর ফের তাকে জামিন দেয়া হয়।

এই ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোতে খবর হয়ে যায়। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। গোটা দেশবাসী একজন দৃঢ়চেতা, সৎ, উদ্যমী, কর্মঠ সরকারি কর্মকর্তাকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ছবি দেখে স্তম্ভিত, বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোশিয়েসন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘটনার নিন্দা ও কড়া সমালোচনা করে। আদালত কর্তৃক নজিরবিহীন আদেশ প্রদান করে কোর্ট হাজতে প্রেরণ, পুলিশ কর্তৃক অবমাননাকর ও আইন বর্হিভূত আচরণ, বাদী ও অন্যান্য আইনজীবীর আদালতে অরাজক পরিস্থিতি ও চাপ প্রয়োগ-এই সকল বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়। তারা সভায় নজিরবিহীন ও মানহানিকর আদেশ প্রদান, আইন বর্হিভূত পুলিশী কার্যক্রম ও তথাকথিত নামধারী স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন,

ঘটনাটি শোনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছিলেন, যে ব্যক্তি এই মামলা করেছে, সে কে? মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি সম্পর্কে সঙ্গে সঙ্গে তারা খোঁজ খবর নেন, একথা জানিয়ে এইচ টি ইমাম বলেন, এই লোক পাঁচ বছর আগেও আওয়ামী লীগে ছিল না। দলের ভেতরে ঢুকা পড়া এই ‘অতি উৎসাহীরাই’ এই কান্ড ঘটিয়েছে, এই চাটুকাররাই আমাদের ক্ষতি করছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এইচ টি ইমাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলেন, ছবিটি দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। “প্রধানমন্ত্রী বললেন, ক্লাশ ফাইভের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এই অফিসার সুন্দর একটি কাজ করেছেন।এবং সেখানে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে, সেটি আমার সামনেই আছে, আপনারা দেখতে পারেন। এবং এই ছবিটিতে বিকৃত করার মতো কিছু করা হয়নি। এটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এই অফিসারটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আর সেখানে উল্টো আমরা তার সঙ্গে এই করেছি, এই বলে প্রধানমন্ত্রী তিরস্কার করলেন। বললেন, এটি রীতিমত নিন্দনীয়।
প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে কিভাবে গ্রেফতার করা হলো কোনরকম অনুমোদন ছাড়া? এ প্রশ্নের উত্তরে এইচ টি ইমাম বলেন, এটি করা যায় না। কারণ ইউএনও হচ্ছেন উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সবচেয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাকে কোন শাস্তি দিতে হলে বা তার বিরুদ্ধে কোন মামলা বা কোন রকম কিছু করতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।

হাতকড়া পরানোর বিষয়ে পুলিশ প্রবিধানের ৩৩০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘ গ্রেফতারকৃত বন্দী এবং বিচারাধীন বন্দীকে তাহাদের পলায়ন বন্ধ করার জন্য যা প্রয়োজন তাহার চাইতে বেশি কড়াকড়ি করা উচিত নয়। হাতকড়া বা দঁড়ির ব্যবহার প্রায় ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও অমর্যাদাকর। বয়স বা দুর্বলতার কারণে যাহাদের নিরপত্তা রক্ষা করা সহজ ও নিরাপদ তাহাদের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করা উচিত হবে না।’ একটি উপজেলার প্রধান নির্বাহী যেখানে সেচ্ছায় আদালতে হাজির হয়েছেন, যেখানে পালিয়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না, সেখানে হাতকড়া পরিয়ে কী এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ লাভ করেছে পুলিশ!

যিনি মামলার বাদী হয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আমলে বঙ্গবন্ধু ও এই দলের ভক্ত হয়েছে। অতি ভক্তি চোরের লক্ষ্যণই নয়; মতলববাজির উদাহরণও। এই মামলা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি পক্ষই ইউএনও তারিক সালমনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অন্যায় আচরণ করেছেন। বাদীয় হাইব্রিড আওয়ামী লীগার, আদালত ও পুলিশ কেউ বিবেকবোধসম্পন্ন দায়িত্ব পালন করেননি। ক্ষমতার ছায়ায় থেকে যারা একজন প্রজাতন্ত্রের নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার শুভ উদ্যোগ গ্রহণের নজির স্থাপনের পরও এইভাবে পুলিশ হাজতে পাঠাতে পারেন, তারা সাধারণের ওপর কতটা নির্যাতন বা অন্যায় করেন সেটি এখানেই বুঝা যায়। এই বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রকিক্রিয়া না ঘটলে এই ইউএনও কি সহজে ছাড়া পেতেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সাহিত্য ও শিল্পানুরাগী মানুষ। তিনি বিরোধীদলে থাকাকালীনও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার অনেক অয়োজন করেছেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির আঙিনায় নিজ চোখে দেখেছি। শেখ হাসিনা ঈদ কার্ডে প্রতিবন্ধী শিশুদের আঁকা ছবিও ব্যবহার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে বলেছেন, এই ইউএনও প্রশংসিত কাজের জন্য পুরস্কৃত হওয়া উচিত, সেখানে  যারা এই অন্যায় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক ও ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>