পুরুষের যৌন অক্ষমতা ও প্রতিকার

আপডেট : April, 21, 2017, 10:43 am

ডা. শাহজাদা সেলিমঃগত সংখ্যায় ‘পুরুষের যৌন অক্ষমতা ও প্রতিকার’ নামে লেখাটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেই লেখাটির পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করছেন। এ পর্বের লেখাটিতে প্রধানত পুরুষের যৌন সমস্যার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রতিটি প্রাণীরই প্রজাতি টিকিয়ে রাখার একটি মৌলিক তাগিদ থাকে। আর সকল প্রাণীর প্রজাতি টিকিয়ে রাখা বা বংশ বৃদ্ধি করার এখন পর্যন্ত একমাত্র পদ্ধতি প্রজনন প্রক্রিয়া । তাহলে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টি প্রাণী থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক, আমাদের এবারের মূল আলোচ্য বিষয় মানুষের যৌনজীবন। অন্যান্য প্রাণীর মতো মানুষের যৌনতাও কেবল তার জৈবিক চাহিদা, শারীরিক ঐশ্বর্য এবং বংশধারাকেই শুধু সমুন্নত রাখে না, বরং এটি পরস্পরের মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক তৈরি করে থাকে।

জীববিদ্যা, মনোবিদ্যা, সামাজিক-সংস্কৃতিসহ সকল গবেষণা তথ্য থেকেই জানা যায়, যৌনতা মানবজীবন ও মনের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, মানুষের মনোজগতের ওপরেও রয়েছে যৌনাচরণের ব্যাপক ভূমিকা। আধুনিক বিশ্বে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে প্রজনন স্বাস্থ্য ব্যাপক গুরুত্বসহকারে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানুষের সুস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সামাজিক সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখতে হলে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও বোধ থাকা জরুরি।

কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটা অন্যরকম। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন, যারা যৌনস্বাস্থ্য সসম্পর্কে অজ্ঞ বা পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। তাই অনেক ক্ষেত্রে কেবল যৌনকর্মকেই তাদের নিকট যৌনস্বাস্থ্য বলে মনে হয়। আসলে যৌনস্বাস্থ্য সম্পূর্ণ একটি স্বাতন্ত্র্য বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যৌনস্বাস্থ্যের বিশেষণ হলো— দৈহিক আবেগ এবং নারী-পুরুষ উভয়ের যৌন অংশগ্রহণে পরিচালিত হয় এমন একটি কাজ, এবং যার ফলে ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ এবং ভালোবাসা সুদৃঢ় হয়।

যৌনধারা

ছোটবেলা থেকে আমাদের অনেকের মনেই X এবং Y ক্রোমোজম সংক্রান্ত অল্পবিস্তর ধারণা থাকে এবং অনেকেই এই সময়ে যৌনতা কী এ ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অথচ দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই তারা সঠিকভাবে যৌনতা সম্পর্কে জানতে পারে না। বিভিন্ন প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে তারা সেক্স এডুকেশন বা যৌনতা সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান লাভ করে। আমাদের দেশে কিংবা উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে যৌনতা সম্পর্কিত বিভিন্ন ভ্রান্তধারণা অনেকেরই আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বহু অঞ্চলে এই প্রভাব একটু বেশি। এখানে উল্লেখ্য যে, যৌনতার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে লিঙ্গ অর্থাৎ নারী এবং পুরুষ।

জীববিদ্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমেও আমরা যৌনতা সম্পর্কিত স্বল্পবিস্তর ধারণা লাভ করতে পারি। আমি এই আলোচনায় যৌনতা এবং যৌনজীবন সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

মানব মনের যৌন সাড়া

মাস্টার ও জনসন নামের দুইজন বিখ্যাত গবেষক এবং বিজ্ঞানী মনোদৈহিক এবং যৌনাচরণের ওপর প্রথমে গবেষণা করেন। তাদের মতে, মানুষের যৌনানুভূতি জাগাতে বা যৌনতার অনুভূতি এবং তৎসম্পর্কিত যৌন উদ্দীপনা এবং চরমপুলকের বিষয়টি মূলত যৌন ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপিত করার ফলেই ঘটে থাকে এবং মানুষের মস্তিষ্ক এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে।

নারী এবং পুরুষের যৌন উদ্দীপনা একই সাথে শুরু হয় না। নারীর উদ্দীপনা পুরুষের চেয়ে লঘু এবং ধীরগতিতে সৃষ্টি হয়ে পরবর্তী সময়ে সেটা অতিরিক্ত সময় স্থায়ী হতে পারে। আমি এখানে বোঝাতে চাচ্ছি, নারীর যৌন সাড়া সৃষ্টি হলে সেটার স্থায়িত্ব পুরুষের উদ্দীপনা স্থায়িত্বের চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। পুরুষ এবং নারীর যৌন উদ্দীপনার জন্য কয়েকটি ইন্দ্রিয় বা যৌনাঙ্গ ব্যাপকভাবে কাজ করে।

পুরুষের প্রধান যৌনাঙ্গ হলো তার লিঙ্গ এবং এটি পুরুষের বাহ্যিক এবং প্রধান যৌনাঙ্গ। নারীর মতো পুরুষের অন্তর্গত কোনো যৌনাঙ্গ নেই। পুরুষের অণ্ডথলিতে বীর্য এবং শুক্র উৎপন্ন হয়। দৈহিক মিলনের সময় এই শুক্র বীর্যের মাধ্যমে পুরুষের লিঙ্গ থেকে বের হয়ে আসে এবং পুরুষ চরমপুলক লাভ করে।

সাধারণত লিঙ্গের আকার নিয়ে সবসময়ই বহু পুরুষকে উদ্বিগ্ন থাকতে দেখা যায়। অথচ এটি একটি তুলনামূলক অহেতুক এবং অনর্থক যৌনচিন্তা। পুরুষের লিঙ্গের সাইজ বিশেষ করে সার্কভুক্ত এশিয়া অঞ্চলে পুরুষের লিঙ্গের গড় দৈর্ঘ্য ৫ থেকে সাড়ে ৫ ইঞ্চি। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে যেমন—কারো কারো লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি আবার অনেকের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ৪ থেকে সাড়ে ৪ ইঞ্চি হতে পারে। মনে রাখবেন উভয় প্রকার লিঙ্গ দ্বারাই সফল যৌনমিলন ঘটানো সম্ভব। পুরুষের উত্তেজনার মূল কেন্দ্রস্থল হলো তার লিঙ্গ। লিঙ্গের উত্থানই পুরুষের মূল যৌনশক্তি।

নারীর বাহ্যিক যৌনাঙ্গ এবং অন্তর্গত যৌনাঙ্গ রয়েছে। বাহ্যিক যৌনাঙ্গের মধ্যে নারীর ক্লাইটোরিস বা ভগাঙ্কুর সবচেয়ে বেশি যৌন স্পর্শকাতর অঙ্গ। পুরুষ যৌনমিলন পূর্বে নারীর এই যৌনাঙ্গ স্পর্শের মাধ্যমে নারীকে যৌনকাতর করে তুলতে পারে। পুরুষ এবং নারী উভয়েরই যৌন উত্তেজনার সময়ে তাদের রক্তচাপের পরিমাণ বেড়ে যায়। পুরুষের ক্ষেত্রে হার্টবিট, হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১৭৫ এবং নারীর ক্ষেত্রে সেটা প্রতি মিনিটে ৮০ থেকে ১৫০ পর্যন্ত উঠতে পারে।

পুরুষ এবং নারীর যৌথ উত্তেজনার শেষ পর্যায় হলো চরমপুলক। এ সময়ে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে এবং নারী চরমতৃপ্তি বা চরমপুলক লাভ করে। এটি শারীরিকভাবে যৌন টেনশনকে কমাতেও সাহায্য করে। চরমপুলকের সময় পুরুষ এবং নারীর দৈহিক এবং মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায় এবং এটা চরমপুলক লাভের পর একেবারে কমে যায়। তবে সাধারণত যে কয়টি বিষয় পুরুষ এবং নারীর যৌনতার জন্য প্রয়োজন তা হলো- উভয়ের যৌন হরমোনের স্বাভাবিকতা, নারীর যোনির আদ্রতা, পুরুষের লিঙ্গের দৃঢ়তা এবং সঠিক উত্থান এবং বিশেষ করে উভয়ে উভয়ের প্রতি যৌনচাহিদা এবং আকর্ষণবোধ করা।

পুরুষের যৌন হরমোন হলো টেস্টোস্টেরন এবং নারীর যৌন হরমোন হলো ইস্ট্রোজেন। সাধারণত শেষ রাতের দিকে পুরুষের যৌন হরমোন সবচেয়ে বেশি মাত্রায় শরীরে অবস্থান করে এবং এ জন্য সকালের দিকে যৌন আকর্ষণ এবং যৌনক্ষমতা একটু বেশি থাকে।

যৌনতা ও বয়স

মধ্য বয়সে এসে পুরুষ এবং নারী যৌনতার প্রতি বেশি আকর্ষণ এবং চাহিদাবোধ করে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনপ্রাপ্তির পর থেকে নারী এবং পুরুষ উভয়ে মোটামুটি ৪০-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তারা যৌনমিলনে সক্রিয় থাকে। তবে মধ্য বয়সে যৌনতার প্রতি আকর্ষণ থাকে তুলনামূলকভাবে বেশি। নারীর মেনোপজের সময় তার রজঃনিবৃত্তির সূচনা হয়। এটি অনেক নারীকেই যৌনতার প্রতি উদাসীন করে তোলে। আমাদের দেশে প্রায় ক্ষেত্রে ৪৫ বছরের পর নারীদের যৌনভাবে নিষ্ক্রিয় দেখা যায়। পুরুষের ক্ষেত্রে এই সময়ের কাছাকাছি বা ৫০ বছর বয়সের পরেও যৌনভাবে সক্ষম থাকতে দেখা যায়। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে যৌন ইচ্ছার কমতির কারণ হলো যৌন হরমোন কমে যাওয়া।

তবে নানাবিধ শারীরিক এবং মানসিক কারণেও পুরুষ এবং নারীর যৌন ইচ্ছা এবং যৌনশক্তি কমে যেতে পারে। আর্থ্রাইটিস, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সার জাতীয় শারীরিক অসুস্থতা যৌনতার ওপর প্রভাব ফেলে। তেমনি নানাবিধ মানসিক অসুস্থতাও যৌন ইচ্ছা ও ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিতে পারে এবং যে সমস্যায় পুরুষ ও নারী উভয়ই আক্রান্ত হতে পারে।

রকমারি যৌনতা

শুধু আমাদের দেশ এবং সমাজেই কেবল নয় বরং সমগ্র পৃথিবীজুড়েই রকমারি যৌনতা পরিলক্ষিত হয়। যৌনতা উপভোগের নানারকম কলাকৌশলেরই আরেকটি নাম হলো রকমারি যৌনতা। বিভিন্ন দেশে বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যৌনতা উপভোগের বিভিন্ন পন্থা প্রচলিত রয়েছে। মানুষের যৌনাচরণের বিভিন্ন রকম পার্থক্য তাদের শারীরিক এবং মানসিক বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। তবে পাশ্চাত্যে নানাবিধ সাইকোলজিক্যাল বিহেভিয়ার পদ্ধতি রয়েছে, যেটা তাদের যৌনতা উপভোগের ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকে।

যৌন সংস্কৃতি একেকজনের কাছে একেকরকম হতে পারে। অনেকেই নানাকারণে যৌনতায় ভিন্নতা অবলম্বন করে থাকেন, যে কারণে আমরা বিভিন্ন প্রকার যৌনাচরণ দেখতে পাই। বিভিন্ন দেশে কিংবা আমাদের দেশেও সমকামী পুরুষ এবং নারী, বিপরীতকামী পুরুষ এবং নারী, উভকামী পুরুষ এবং নারীর দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক কারণে নানা প্রকার যৌন আচরণের সাথে সম্পৃক্ত।

সমকামী পুরুষ কিংবা সমকামী নারী মূলত যৌনতার বৈচিত্র্যের জন্য এবং বিশেষ মানসিকতার জন্য এই জাতীয় যৌনতার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষ কিংবা নারী একাধারে পুরুষ এবং নারী উভয়ের সাথেই যৌনমিলনে রত হচ্ছে। এই জাতীয় যৌনাচরণকে উভকামিতা বলে।

পাশ্চাত্যে সমকামী পুরুষদের ‘গেই’ এবং নারীদের ‘লেসবিয়ান’ নামে অভিহিত করা হয়।

এগুলো ছাড়া আরও নানা ধরনের অদ্ভুত যৌনাচরণও রয়েছে। যেমন— জুফিলেস (Zoophiles) অর্থাৎ পশু-পাখির সাথে যৌনমিলন, ফেটিসিজম (Fetishism), নেকরোফিলিয়া (Necrophilia) এবং ভয়েরিজম (Voyeurism) ইত্যাদি। এ ছাড়াও পরিবার-পরিজন এবং নিকট আত্মীয়ের সাথে যৌনমিলনকে ইনসেস্ট (Incest) বলে। যেমন— বাবা মেয়ের সঙ্গে যৌনতা, চাচা ভাইঝির সাথে যৌনতা ইত্যাদি।

আরেক

প্রকার বিকৃত যৌনাচরণ রয়েছে, যাকে স্যাডিজম বলা হয় (Sadism)। এই যৌনতায় যারা আক্রান্ত তাদের মাঝে যৌনতার সময় অপরকে ব্যথা দেওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। আবার ঠিক এর উল্টোটিও আছে একে বলে ম্যাসোকিজম (Masochism)। এখানে আবার যৌনতায় নিজে ব্যথা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। এই জাতীয় যৌনাচরণকে অসুস্থ যৌন মানসিকতা বলাই শ্রেয়।

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ের সাথে অসুস্থতার বিষয়টি যেমন জড়িত থাকা স্বাভাবিক, তেমনি যৌনতার সাথেও অসুস্থতার একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। নানাবিধ পারিপার্শ্বিক কারণে যৌন অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। যেমন— জীববিদ্যা সম্পর্কিত সমস্যা, ব্যবহারিক সমস্যা এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যার প্রভাব ইত্যাদি। যৌন নান সমস্যা কিংবা অসুস্থতার জন্য শারীরিক এবং মানসিক কিছু কারণও দায়ী হতে পারে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেরিফেরাল স্নায়ু ব্যবস্থা, কার্ডিওভাসকুলার ব্যবস্থা এবং যৌনাঙ্গের সমস্যার কারণে যৌন ক্রিয়াকর্মে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে যৌনতার প্রতি ভীতি সমস্যার কারণে যৌনতায় অসুস্থতা সৃষ্টি হতে পারে।

অসুস্থতাজনিত যৌন সমস্যা

কেন্দ্রীয় এবং পেরিফেরাল স্নায়ু ব্যবস্থার ত্রুটি, স্পাইনাল কর্ডের আঘাত এবং টিউমারের কারণে যে সব সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে যেমন—

  • লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা
  • লিভার সিরোসিস, এমাইওট্রোফিক ল্যাটাবলি ইসক্লোরোসিস, যৌন ইচ্ছা এবং ক্ষমতাকে বিঘ্নিত করে ফ্রন্টাল অথবা টেম্পোরাল লবের টিউমার।
  • প্রোস্টেটেকটোমির ফলে স্নায়ুবৈকল্য দেখা দেয়। যার ফলে যৌন ইচ্ছা কমে যায়
  • লাম্বার সিমপ্যাথেস্টমি
  • ইপিসিওটোমি অবসটেট্রিক্যাল ট্রাউমা, যোনির অভ্যন্তরে লিঙ্গ প্রবেশের সমস্যা এবং কামরস নিঃসরণে সমস্যা তৈরি করে।
  • ডরজোটোমির ফলে পুরুষত্বহীন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
  • ডলভার সিরোসিস ও ইস্ট্রোজেন সমস্যা এবং এ জন্য যৌন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
  • ডায়াবেটিস সমস্যার ফলে পুরুষ এবং নারীর যৌনজীবনে নানা যৌন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

পুরুষের যৌন সমস্যা একটি ব্যাপক ও গভীর মনোদৈহিক জটিল অবস্থা। তাই কোনো সহজ-সরল পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা করা সম্ভব নাও হতে পারে। সমস্যাগুলোর মূলে মানসিক, দৈহিক ও হরমোনজনিত তারতম্য ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে সবকটি একই সাথে জড়িত থাকে। অতএব, পুরুষের যৌন সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে প্রথমেই মূল কারণটাকে শনাক্ত করতে হবে। তার পর সাধ্যের মধ্যে হলে তার সমাধান করতে হবে। যৌনতা মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনোমতেই তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যৌনতার প্রতি আকর্ষণ এবং যৌনক্ষমতা অনেক সময় নানা পারিপার্শ্বিক কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। পুরুষ এবং নারীর নানাবিধ এবং ব্যতিক্রমী যৌন সমস্যা এবং যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অসুবিধা দেখা দিলেও এগুলোর চিকিৎসা এবং সমাধানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারী যৌন অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে সংকোচবোধ করেন। এতে করে তাদের শারীরিক সমস্যা বাড়তে পারে এবং যৌনজীবনে এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়তে পারে।

পুরুষের যৌন সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো, দ্রুত বীর্য স্খলন (Premature Ejaculation)। তার পরই আছে লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যা (Erectile Dysfunction), যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া ইত্যাদি। পৃথিবীর বহুদেশে এ সমস্যাসমূহ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। আমাদের দেশেও অল্প বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যেসমস্ত কারণ বা ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া, রক্তে লিপিড সমস্যা, হরমোনজনিত সমস্যা (হাইপোগোনাডিজম, হাইপারপ্রোলেকটিনোমা), ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, যৌনাঙ্গে আঘাত বা অপারেশন, ওষুধ সেবন (উচ্চরক্তচাপ বা মানসিক অবসাদের), যৌনাঙ্গের সংক্রমণ, স্নায়ুবিক সমস্যা ইত্যাদি। তবে এখন পর্যন্ত পুরুষের যৌন সমস্যার সবমিলিয়ে প্রধানতম সমস্যা হিসেবে পুরুষটি বা উভয়ের মানসিক সমস্যাকেই প্রধানতম বলে ধরা হচ্ছে। একইভাবে পুরুষ ও তার যৌন সঙ্গীর অসৌহার্দপূর্ণ অবস্থাও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

অতএব, পুরুষের যৌন সমস্যা সমাধান কল্পে সমাধান প্রার্থীর শারীরিক, মানসিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিস্তারিত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিকিৎসককে জানতে হবে। একই সাথে সমস্যাটির মোট স্থায়িত্বকাল, ব্যাপকতা ও ধরন সুনির্দিষ্টকরণ করতে হবে। আক্রান্ত পুরুষ মানুষটির স্ত্রী বা যৌন সঙ্গীর শারীরিক উপস্থিতি সমস্যাটির সঠিক অবস্থা বুঝতে সহায়ক হবে। তার পর অন্যান্য রোগের উপস্থিতি, ওষুধ গ্রহণ ইত্যাদি বিস্তারিত জানতে হবে। সমস্যাটির ধরন নিশ্চিত হবার পরে চিকিৎসার ধরন ঠিক করতে হবে। তবে আগে থেকেই বলে রাখা ভাল যে, সবার ক্ষেত্রে ফলাফল আশানুরূপ নাও হতে পারে। তবে যাদের একই সাথে অন্য কোনো রোগ আছে, তাদের সেই সমস্যা সমাধান করা গেলে যৌন সমস্যারও যথেষ্ট উন্নতি হবার সম্ভাবনা থাকে। যেমন—ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের গ্লুকোজ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখা অবশ্যই জরুরি। আবার কোনো ওষুধকে যদি এ সমস্যার কারণ মনে করা হয়, তবে তা বন্ধ করতে হবে দ্রুত।

চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে কিছু সংখ্যক পরীক্ষা করতে পারেন। এর মধ্যে হরমোনের মাত্রা নির্ধারণ (থায়রয়েড হরমোন, টেস্টোস্টেরন, প্রোলেকটিন ইত্যাদি), রক্তে চর্বির মাত্রা, পুরুষ লিঙ্গে রক্ত সরবরাহের পরিমাণ বা ধরন নির্ধারণ ইত্যাদি। আবার অনেকের ক্ষেত্রে তলপেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম বা যৌনাঙ্গের সংক্রমণের পরীক্ষাও করা হয়। তবে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা সবার আগে থাকবে।

পুরুষের যৌন সমস্যার ধরন বা কারণ নির্ধারিত হবার পরে চিকিৎসক তার চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করবেন। এক্ষেত্রেও আক্রান্ত পুরুষটির মানসিক অবস্থার উন্নতিই অগ্রগণ্য। তার পর তার যৌন সঙ্গীর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরির তাগিদ দিতে হবে। এমনও দেখা গেছে, যৌন সঙ্গী পাল্টানোর পর আক্রান্ত পুরুষটি এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের অবশ্যই দ্রুত ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো বয়স ও অবস্থাভিত্তিক কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারতে হবে এবং তা বজায় রাখতে হবে।

যাদের কোনো হরমোনজনিত সমস্যা আছে, তাদের সে সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণত কোনো হরমোন সেবন করতে দেওয়া হতে পারে। এ ব্যাপারে অবশ্যই একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। কেননা, এ সব কারণ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় হরমোন নির্ধারণ করা, হরমোনের মাত্রা বা ডোজ ঠিক করা অথবা একাধিক হরমোন দিতে হলে তার সমন্বয় করা ইত্যাদি কাজের জন্য অবশ্যই একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের লাজুক রোগীরা আশপাশের বিভিন্ন রকম অপ্রশিক্ষিত ওষুধ ব্যবসায়ী বা কবিরাজ অথবা ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের এ রোগ গভীর ও জটিল সমস্যার সহজ সমাধান নিতে গিয়ে অবস্থাটির উন্নতির পথ অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ করে ফেলেন।

কারণভিত্তিক যে সব ওষুধ-পত্র পুরুষের যৌন সমস্যার ক্ষেত্রে সাধারণত ফলদায়ী হয় তার মধ্যে আছে, সিলদেনাফিল সাইট্রেট, কাদানাফিল, ভারদানাফিল, ডেপক্সেটিন ইত্যাদি। তা ছাড়া কিছু কিছু ডিভাইস কার্যকর। তবে সকল ক্ষেত্রেই রোগীর মানসিক অবস্থার উন্নতি জরুরি। কিছু কিছু সেক্সচুয়াল থেরাপি অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। তবে সকল ক্ষেত্রেই জীবনযাপন প্রণালীর বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নতি সাধন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। নিয়মিত এবং পরিমিত শারীরিক শ্রম বজায় রাখতে হবে। উচ্চতা অনুসারে কাঙ্ক্ষিত দৈহিক ওজন অবশ্যই ঠিক থাকতে হবে। পুরুষকে তার নিজের ও তার সঙ্গীর সাথে মধুরতর সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখতে হবে।

সেক্সচুয়াল থেরাপি এবং বিভিন্ন প্রকার মেডিকেশন বা ওষুধ ব্যবহার করে পুরুষ এবং নারীর যৌনজীবনের নানাবিধ সমস্যা মোকাবিলা করা যেতে পারে। আমাদের দেশে ইদানীং যৌনতা বিষয়ে অনেক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এটি একটি ভালো খবর। যৌন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সতর্কতা প্রতিটি সুস্থ-স্বাভাবিক পুরুষ এবং নারীর জন্য জরুরি। আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যও যৌনতার প্রয়োজন রয়েছে। এটি জীবনের একটি অন্যতম নিয়ামক।

পুরুষ এবং নারীর ক্ষেত্রে যেকোনো যৌন সমস্যায় অনেকে অযাচিতভাবে এবং ব্যবস্থাপত্রের বাইরে ওষুধ সেবন করে থাকেন। এটি কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর। যৌন স্বাস্থ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা বরং এতে আরও নষ্ট হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে উচিত সুস্থতার ব্যাপারে আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারে। এজন্য যৌন স্বাস্থ্যের কোনো প্রকার সমস্যা দেখা দিলে বরং ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। পাশ্চাত্যে যৌনজীবনে বৈচিত্র্য আনয়নে এবং সুস্থ যৌনতার জন্য নানাবিধ মেডিকেশন এবং থেরাপির প্রচলন রয়েছে। তবুও চেষ্টা করুন সুস্থ-শারীরিক দেহ-মন নিয়ে যৌনতায় লিপ্ত হতে।

পুরুষ এবং নারীর জন্য যৌন স্বাস্থ্যের সুস্থতা অবশ্যই জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। ডাক্তারের কাছে বা বিশেষজ্ঞের কাছে আপনার যেকোনো প্রকার শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা, বিশেষ করে যেগুলো আপনার যৌনজীবনের সাথে সম্পৃক্ত সে ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে পরামর্শ নিন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের লেখা বিভিন্ন রকম যৌনবিষয়ক বই পড়েও যৌন সমস্যা সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ করতে পারেন। এতে আপনার যৌনতা সম্পর্কিত অজ্ঞতা কেটে যাবে। যৌনজীবনে সুখী হতে চাইলে যৌন স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখার বিকল্প নেই।

লেখক
এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম), এমএসিই (ইউএসএ)
সহকারী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা

Facebook Comments