প্রযুক্তি নিয়ে প্রতারনা বন্ধ হউক-লিটন বাশার

এপ্রিল ২৯ ২০১৭, ০৯:৫৫

লিটন বাশার ► অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোয়ায় রাতারাতি আমরা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হইয়া উঠিয়াছি। মুঠোফোনের মালিক অথচ ইন্টারনেট সংযোগ নাই এমন মানুষের সংখ্যা এখন খুবই কম। তবে তাহারা অনেকেই ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় , স্বেচ্ছায় নাকি মোবাইল অপারেটরদের স্বেচ্ছাচারীতার শিকার হইয়া ইন্টারনেট ব্যবহার করিতেছেন তাহা স্পষ্ট নহে।  বিভিন্ন মুঠো ফোন কোম্পানীর খপ্পরে পড়িয়া কিংবা স্মার্ট ফোন সেটের সর্বনাশা অপশন চাপিয়া তাহারা অনেকে নিজের অজান্তে ইন্টারনেট ইউজার বনে গিয়াছেন। কেউ বা আবার ফেসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হইয়া বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানীর মিথ্যা প্রলোভন যুক্ত ডাটা ক্রয়ের মিথ্যা ফাদে পা দিয়ে নিজের অজান্তেই টাকা খরচ করে যাচ্ছেন। অনেকটা ঈদুরের মতই ছোট ছোট গর্ত করিয়া মোবাইল অপারেটর কোম্পানী গুলো সামান্য টাকার মন ভোলানো প্রলোভনের প্যাকেজ ঘোষনা করিয়া গ্রাহকের পকেট কাটিতেছেন। যাহা শত ভাগ বেশী দামে ইন্টারনেট ক্রয়কারীরও মালুম হইতেছে না। ফোন অপারেটর কোম্পানী গুলো মোবাইল ফোনের গ্রাহকরা কি ধরনের ইউজার সেটা বিবেচনায় রেখেই এমবি-জিবি ক্রয়ের প্রলোভনের এসএমএস পাঠিয়ে থাকেন। মাসে যিনি ফোনে দুই হাজার টাকা ব্যবহার করেন তাহাকে যে পরিমান মূল্যের ইন্টারনেট কেনার অফার দেওয়া হয় তা কখনোই ৫’শ টাকা ব্যবহারকারীকে দেওয়া হয় না। কিন্ত গলা সকলেরই কাটা হয়। বাংলাদেশের মত গরীব দেশে মোবাইল ফোন অপারেটর গুলোর ইন্টারনেটের রমরমা ব্যবসা এবং গ্রাহক ঠকিয়ে বানিজ্যের বিষয়টি দীর্ঘ দিন যাবত সচেতন মহলে সমালোচনার ঝড় বইতেছে।
প্রথমত দেশে মোবাইল ফোন আসিবার পরই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের হাতে পৌছায়। মোবাইল ফোন অপারেটরদের অশুভ প্রতিযোগীতার নেতিবাচক কু-ফল হইতেও এরা রেহাই পায়নি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য বিশেষ নম্বর পর্যন্ত বাজারে ছাড়া হইয়াছে। দিনে-রাতে সমান তালে কথা বলিবার জন্য এই অফার ঐ অফার দিতে গিয়া গ্রামের মানুষের জীবন থেকেও চিঠি পত্র হারাইয়া গিয়াছে। গ্রামগঞ্জের মানুষ চিঠি ছাড়িয়ে হাতে মোবাইল ফোন লইয়া গান গাইতে শুরু করিয়া দিয়েছিল-
‘ দেশে মোবাইল এসেছে, চিঠি বন্ধ হইয়াছে।
ভালবাসার কথা এখন আসে বাতাসে।
আমার অভাবের সংসার;
বন্ধুর সনে প্রেম করিলে মোবাইলের দরকার।
আমার বন্ধু শুনাইছে; মোবাইলে একটা লইলাম হাতে- হাল বলদ বেচিয়েছে।
মাসে মাসে কার্ড ভইরা ভাই ঘর-বাড়ি গেছে।
চিঠি বন্ধ হইয়াছে; ভালবাসার কথা এখন আসে বাতাসে।
আমার বন্ধু কালাচান ; একমাত্র মোবাইল না হইলে বাচে না পরাণ।
বন্ধু বলছে পোষ্ট অফিস বন্ধ হইয়া গেছে; ভালবাসার কথা এখন আসে বাতাসে।’
হাতের লেখা ঐতিহ্যের চিঠি হারিয়ে মোবাইল ফোন, কার্ড এবং ফ্লাক্সি লোডের আধুনিকতার স্পর্শে আমরা এখন ইন্টারনেটের জগতে পা দিয়েছি। কিন্ত এর ব্যবহার খুব সহজলভ্য না হওয়ায় গ্রাহকের অগোচরেই অপারেটর পুকুর চুরি এমনকি সাগর চুরি পর্যন্ত করতে দ্বিধা বোধ করছেন না। আর ব্যবহারকারীদের হালের বলদ, ঘর-বাড়ির বিক্রির পর আর কি বিক্রি করিবেন তাহার আয়োজন হইতে চলিতেছে।
এমন একটি অবস্থায় আমাদের ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী  মুঠোফোন ভিত্তিক ইন্টারনেটের মূল্য আগামী ছয় মাসের মধ্যেই হ্রাস পাইবে বলিয়া জানাইয়াছেন। ইন্টারনেটের মূল্য লইয়া জনমনে যেই প্রশ্ন বা বিভ্রান্তি রহিয়াছে তাহা দূর করিতে মুঠোফোন অপারেটরসহ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্দেশ দিবার কথা জানাইয়াছেন তিনি। ইন্টারনেট-সেবার সঙ্গে যুক্ত সকল পক্ষকে লইয়া সচিবালয়ে গত বুধবার অনুষ্ঠিত সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী এই ঘোষনা দিয়াছেন বলিয়া পত্র-পত্রিকা মারফত জানিতে পারিলাম।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর হইতে জানা গিয়াছে বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি ৭২ লক্ষ। ইহার মধ্যে মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি ৩১ লক্ষ। অর্থাৎ শতকরা ৯৪ ভাগ ব্যবহারকারী মুঠোফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া থাকে। কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ ব্যাতিত মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এর ব্যবহার ও মূল্য সম্পর্কে কতটা সচেতন তাহা

বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশের গ্রাহকরা ফ্লাক্সি লোড করে মোবাইলে টাকা নেওয়ার পর কল করে তার হিসাব খুজিয়া পান না সেই দেশের অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত গ্রাহকদের কি ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের নামে ঠকানো হইতেছে তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।  তাই সর্বাধিক ব্যবহারকারীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই পদক্ষেপ বিলম্বে হইলেও অভিনন্দনযোগ্য। ইহার পূর্বে চলতি মাসেই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই সংক্রান্ত কস্ট মডেলিংয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহন করিয়াছিল। সেবা প্রদানের খরচ, যথাযোগ্য মুনাফা, গ্রাহকসংখ্যা, সেবার মান ইত্যাদি অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি হইল কস্ট মডেলিং। এতদিন মোবাইল ফোন অপারেটরদের নির্ধারিত মূল্যেই গ্রাহকরা মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া আসিতেছিলেন। তাহাতে গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষিত হইতেছিল না। বরং গ্রাহকদের সাথে প্রতারনার এক ফাদে পরিনত হইয়াছিল এই ইন্টারনেট ব্যবসা।  তাই সর্বাধিক ব্যবহারকারীর অধিকার রক্ষার স্বার্থে কস্ট মডেলিংয়ের বিষয়টি সমপন্ন করা অত্যন্ত জরুরী ছিল বলিয়া আমরা মনে করিতেছি।

বাংলাদেশে ইন্টারনেটের মূল্য বর্তমানে পৃথিবীর ততৃীয় সর্বনিন্ম। কিন্ত সেই নির্ধারিত মূল্যে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট গ্রাহকরা কি ব্যবহারের সুযোগ পাইতেছেন! মোবাইল অপারেটর কোম্পানী গুলো মূল্য সংযোজন কর, ভ্যাটসহ আনুসাঙ্গিত যে খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতাইয়া নিতেছেন তাহা কোন অফরেই উল্লেখ থাকে না। তাই এই বার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়  ইন্টারনেটের মূল্যের সহিত কর ও মূল্য সংযোজন কর হ্রাস করিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করিবেন বলিয়া খবর প্রকাশিত হইয়াছে। তবে মূল্য হ্রাস পাইলেও সেবার মান উন্নত হইবে কিনা সেই চ্যালেঞ্জ কিন্তু থাকিয়াই যাইবে। কারণ মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করিতে গেলে নানান সমস্যা উপস্থিত হয়। মুঠোফোনের মধ্যে ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহার করিতে গেলে যেই গতি পাওয়া যায়, তাহা মোটেই সন্তোষজনক নহে। বরং হতাশজনক বটে।  এ ক্ষেত্রে অবশ্য যাহারা অনেক দামি স্মার্টফোন ব্যবহার করিয়া থাকেন, তাহারা কিছুটা সুবিধা পাইয়া থাকেন। কিন্তু সাধারণ স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এর শ্লথ গতি যে কারো জন্য বিরক্তিকর। অথচ দখিনের জনপদের মত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া থাকেন তাহাদের দামী স্মার্ট ফোন কেনার সংগতি কোথায়! যে সব এলাকায় এসব মোবাইল অপারেটর কোম্পানীর সংযোগে কথা বলার জন্যই নেটওয়ার্ক পাওয়া দুরহ ব্যাপারে সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারের নামে গ্রাহকদের সাথে অনেকটা উপহাস করা হইতেছে। তবুও গ্রামের সহজ সরল তরুন-তরুনী কিংবা যুবকরা গভীর রাতে ইন্টারনেটের ছোয়ায় কোন সুন্দরী রমনীর হাসিমাখা মুখখানা ভাসিয়া উঠিতে দেখিয়া ব্রাউস করিতে থাকেন। কিন্ত তাহাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয় না। রাত পেরিয়ে ভোর নামে কিন্ত ইন্টারনেটের ধীরগতি তাহাদের বিন্দুমাত্র আগাইতে দেয় না। বরং কখনো কখনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন পর্যন্ত হইয়া থাকে। তবুও তাহারা নির্ঘুম রাত কাটাইয়া এই ইন্টারনেটের পিছনে টাকা খরচ করিতেছেন। ইহার কি সমাধান হইবে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।

গ্রাহকরা বর্তমান মূল্যে হউক কিংবা ভবিষ্যতের হ্রাসকৃত মূল্যে হউক, ইন্টারনেট ডাটা কিনিয়া তাহার যদি সদ্ব্যবহার নাই করিতে পারেন, তবে কি তাহারা আদৌ এই প্রতারনার হাত হইতে রক্ষা পাইবেন! ইন্টারনেটের সংযোগ পাওয়া তথ্যসমাজের নাগরিকের এক প্রাথমিক অধিকার, কিন্তু দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়াও আরেক অধিকার বটে। তাই আমরা মনে করিতেছি মোবাইল অপারেটর কোম্পানী গুলো যে ভাবে প্রতারনার ফাদ বিস্তার করিয়াছে তাহার হাত হইতে স্বল্প আয়ের মানুষকে রক্ষার জন্য শুধু মূল্য হ্রাস করিলেই হইবে না। সরকারকে মোবাইল ফোনে দ্রুত গতির ইন্টারনেটের উপর নজর দিতে হইবে। মোবাইল অপারেটররা এইক্ষেত্রে কেন দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা না দিয়ে চড়া মূল্যে ডাটা বিক্রি করিয়া টাকা হাতাইয়া যাইতেছে তাহাও অনুসন্ধান করিয়া দেখিবার প্রয়োজন। কারন বাংলাদেশের মত একটি স্বল্প আয়ের দেশের দরিদ্র মানুষের টাকা মাফিয়া স্টাইলে মোবাইল ফোন গুলো হাতাইয়া নিয়া যাইবে আর সরকার তাহাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করিবে না তাহা হইতে পারে না।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>