ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায় ঝুঁকছেন নারীরা

আপডেট : May, 26, 2017, 12:45 pm

এই ব্যবসায় কোনো নির্দিষ্ট দোকান বা শোরুমের প্রয়োজন হয় না। কেনাবেচার পুরোটাই চলে ফেসবুকের মাধ্যমে। নারীদের অনেকেই বেশ সাফল্য দেখাচ্ছেন এ মাধ্যমটি ব্যবহার করে। তাঁরা উদ্যোক্তা হিসেবে বাণিজ্য অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

কানিজ ফাতিমা ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এর পাশাপাশি ‘কামিনী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শাড়ি বিক্রির ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে পরিবার থেকে কিছুটা আপত্তি থাকলেও পরে সবাই উৎসাহই দিয়েছেন।’
তবে প্রতিবন্ধকতাও আছে। অনেকেই নারী বলে উদ্যোক্তা হিসেবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। একদিকে যেমন পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে ফেসবুকে বিপণণের সময়ও মুখোমুখি হচ্ছেন ক্রেতাদের অযাচিত আচরণ ও মন্তব্যের।
‘শমিতা’স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ চালান উদ্যোক্তা সুস্মিতা তাশফিন। করপোরেট অফিসের চাকরি ছেড়ে এক বছর হলো ব্যবসায় নেমেছেন তিনি। সেখানে পণ্য হিসেবে আছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ ও পাঞ্জাবি। পণ্যের অর্ডার ও মূল্য পরিশোধের জন্য ব্যবহার করা মোবাইল নম্বরে বেশ কিছুদিন ধরেই একজন ক্রেতা রাত-বিরাতে ফোন করে বিরক্ত করছেন তাঁকে। সময় কাটানোর জন্য ওই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান! আর একবার ফোন করে নারীকণ্ঠ শোনার পর থেকে তাঁর ফোন আসা আর বন্ধ হচ্ছে না।
সুস্মিতা বলেন, এ ধরনের সমস্যায় প্রায়ই পড়তে হয়। কখনো কখনো পুরুষ ক্রেতারা ফেসবুকের ইনবক্সে জানতে চান তিনি পুরুষ নাকি নারী। দাম নিয়ে বাহাস করতে গিয়ে কটু কথা শোনান অনেকে। অথচ নির্ধারিত দামেই পণ্য বিক্রির ঘোষণা আছে পেজে।
.

 ফেসবুকের নির্দিষ্ট পেজে পণ্যের ছবি ও দাম দিয়ে পোস্ট দেওয়ার পর সেগুলো কিনতে আগ্রহীরা অর্ডার করেন। অনেকে বিকাশের মাধ্যমে দাম পরিশোধের ব্যবস্থা রাখেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই পণ্য পাওয়ার পর হাতে হাতেই টাকা দেন ক্রেতারা। সে ক্ষেত্রে কখনো কুরিয়ারের মাধ্যমে পণ্য পাঠান ব্যবসায়ীরা, আবার কখনো বিক্রয়কর্মীকে পাঠানো হয়। তবে ঢাকার বাইরে সাধারণত কুরিয়ার করা হয়।
ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবসার ক্ষেত্রে মূল আকর্ষণ হলো, কোনো নির্দিষ্ট শোরুম ছাড়াই এখানে অসংখ্য ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া যায়। একটি শোরুমের জন্য যে টাকার প্রয়োজন সেটি সহজেই পণ্য উৎপাদন বা সংগ্রহের কাজে লাগানো যায়। তবে দোকান হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা থাকে, কিন্তু ফেসবুকে তৎপর থাকতে হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। কারণ যেকোনো সময় আসতে পারে ক্রেতার চাহিদা।
আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্য উৎপাদন বা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বাধা আছে নারীদের। ব্যবসার শুরুতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্য উৎস

থেকে পণ্য সংগ্রহ বা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বানিয়ে নিতে হয়। অনেক সময় উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নারীদের পাত্তা দিতে চান না। তাঁরা খোঁজেন পুরুষ উদ্যোক্তা।
‘রেনে বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সানজানা জামান। মূলত চামড়া, পাট ও কাপড়ের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন তিনি। এখন শোরুম থাকলেও ব্যবসার মূল মাধ্যম ফেসবুক। সানজানা বলেন, পাট বা চামড়াজাত পণ্য বানাতে তাঁকে প্রায়ই হাজারীবাগ, বংশাল প্রভৃতি এলাকায় যেতে হয়। প্রথম দিকে উৎপাদকেরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না। তিনি প্রশ্ন করলেও উত্তর যেত সঙ্গে থাকা পুরুষ ব্যবসায়িক অংশীদারের কাছে!
তবে শুধু উৎপাদক নয়, স্বচ্ছন্দ হন না বিভিন্ন করপোরেট সংস্থার বড় কর্তারাও। সানজানার কথায়, সবাই জানতে চান তিনি একাই ব্যবসা করছেন কি না। তাঁর চেয়ে পুরুষ ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে কথা বলতেই আগ্রহ দেখান এই বড় কর্তারা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসার ক্ষেত্রে এখনো পরিণত হননি ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউই। অনেক ভুঁইফোঁড় বিক্রেতা যেমন আছেন, তেমনি অনেক ক্রেতা আছেন যাঁরা ভুয়া অর্ডার দেন। এতে করে উদ্যোক্তার সময় ও অর্থ—দুই-ই নষ্ট হয়। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে তৈরি হয় আস্থার সংকট।
প্রায় সময়ই ফেসবুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পেজ থেকে পণ্য কেনেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ জাহান। তিনি বলেন, এতে করে শপিং সেন্টারে ঘুরে ঘুরে আর পণ্য বাছতে হয় না। আর ফেসবুকে কেনা পণ্য পছন্দ না হলে সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দেওয়ার সুযোগও আছে। তবে মাঝেমধ্যে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানান তিনি।
আরেক ক্রেতা রাকিবুল হাসান অবশ্য বাজে অভিজ্ঞতার কথাই শোনালেন। গত বছর একটি প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ থেকে স্ত্রীর জন্য একটি নীল রঙের সিল্কের শাড়ির ফরমাশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হাতে পান একটি ভিন্ন নকশার তাঁতের শাড়ি। পরে শাড়ি ফেরত দিয়েছিলেন তিনি।
এ ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ের সাবেক প্রশিক্ষক পীযুষ কুমার সাহা বলেন, ‘ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসাকে বলা হয় এফ কমার্স। আমাদের দেশে নারীরা তুলনামূলকভাবে এতে বেশি আগ্রহী। এর মূল কারণ হলো বিনিয়োগ ও জনশক্তি কম লাগে এবং ঘরে বসে সহজেই ব্যবসার কাজ চালানো যায়।’
কিন্তু ফেসবুকভিত্তিক বাণিজ্যে বিনিয়োগ কম হচ্ছে মন্তব্য করে পীযুষ বলেন, এখনো ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ই-কমার্স খাতকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু ফেসবুককেন্দ্রিক হলে চলবে না। এর সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব ওয়েবসাইটও তৈরি করতে হবে।

 

Facebook Comments