বরিশাল ডকইয়ার্ডে বিলাসবহুল নৌযান নির্মিত হলেও নেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

মে ২৪ ২০১৭, ০০:১১

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি নুন্যতম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ক্রমে স্ফীত হচ্ছে বরিশালের জাহাজ নির্মান শিল্প। কোন ধরনের আধুনিক কারিগরি সুযোগ সুবিধাহীন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বরিশালের কির্তনখোলা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এ শিল্পে ইতোমধ্যেই অর্ধ শতাধিক ছোট-বড় যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান নির্মিত হয়েছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমানও ইতোমধ্যে ৩শ’ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। কয়েকটি ব্যাংক অনেক চড়া সুদে এ শিল্পে সীমিত কিছু বিনিয়োগ করলেও আজ পর্যন্ত নৌযান নির্মান শিল্পে বিনিয়োগে সরকারি কোন নীতিমালা নেই। তবে আছে বিদ্যুৎ ঘাটতি সহ ভ্যাট ও আগাম আয়করের খড়গ। নেই কোন গ্যাস সুবিধাও। ফলে প্রতিনিয়ত এসব বিরূপ পরিস্থিতির সাথে লড়াই করেই বরিশালের জাহাজ নির্মান শিল্প টিকে আছে। গত দেড় দশকে বরিশালে দেশের অত্যাধুনিক ও সর্ববৃহৎ মাপের যাত্রীবাহী নৌযান নির্মিত হয়েছে। এসব নৌযান অত্যন্ত সুনাম ও নির্ভরতার সাথে রাজধানীর সাথে দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এছাড়াও বেশ কিছু পণ্যবাহী নৌযানও নির্মিত হয়েছে বরিশালের বিভিন্ন নৌ নির্মান কারখানায়। এখানে নির্মিত বেশ কয়েকটি নৌযান চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে বহিনোঙরে থাকা সমুদ্রগামী নৌযান থেকে লাইটারেজের কাজও করছে। পাশাপাশি নৌযানগুলো দেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় নৌপথেও পণ্য পরিবহন করে চলেছে।
বর্তমানে নির্মিত হচ্ছে ক্যাটামেরন টাইপের দ্রুতগামী যাত্রীবাহী নৌযানও। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বরিশালে নির্মিত ক্যাটামেরন ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যাত্রী পরিবহন শুরু করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এর উদ্যোক্তাগণ। এছাড়াও বরিশালে প্রথমবারের মত নির্মিত হচ্ছ চারতলা বিশিষ্ট বিশালাকায় যাত্রীবাহী নৌযান। ‘কির্তনখোলা-১০’ নামের নৌযানটি আগামী আগষ্টের মধ্যে বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যাত্রী পরিবহন শুরু করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এর উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান সালমা শিপিং লাইন্স-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস। সমুদ্র পরিবহন অধিদফ্তরের অনুমোদিত নকশায় নৌ স্থপতিদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নির্মানাধীন এ নৌযানটিতে অন্তত দেড় হাজার যাত্রী বহনের সুবিধা থাকছে। ইতোমধ্যে নৌযানটির অবকাঠামো ও উপরীকাঠামোর মূল নির্মান কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি মাসের মধ্যেই নৌযানটির সাজসজ্জা সহ আনুষাঙ্গিক কাজ শুরু হচ্ছে।
তবে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ থাকলেও এখনো বরিশালের নৌযান নির্মান শিল্পে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তরফ থেকে বিনিয়োগের তেমন কোন আগ্রহ নেই। শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংক

বাংলাদেশ এবং জনতা ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক এ সেক্টরে সীমিত কিছু বিনিয়োগ করেছে এ পর্যন্ত। তবে উচ্চ সুদের হারের সাথে ব্যাংক ঋন পেতে দীর্ঘ কালক্ষেপন সহ অসামঞ্জস্যপূর্ণ শর্তের কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজ-এর সভাপতি সাঈদুর রহমান রিন্টু এ প্রসঙ্গে নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, নৌযান নির্মান শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি কোন নীতিমালা না থাকায় সরকারি-বেসরকারি বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘ কালক্ষেপনের পরে যে ঋন মঞ্জুর করে তাতে উচ্চ সুদের হার এবং ইক্যুইটির পরিমান বেশী হওয়ায় উদ্যোক্তাদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এর সাথে বিদ্যুৎ সংকট সহ দক্ষিনাঞ্চলে গ্যাস সরবারহ না থাকায় নৌযান শিল্প এখন অনেকটাই হুমকির মুখে বলে জানান চেম্বার সভাপতি। এমনকি ঋন মঞ্জুরীর পরে নৌযান সহ উদ্যোক্তার বিশাল স্থাবর সম্পদ বন্ধক রেখে এ ঋন সংগ্রহ করতে গিয়ে দীর্ঘ কালক্ষেপনেও উদ্যোক্তাগন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ছাড়াও নানা হয়রানীর শিকার হচ্ছেন বলে জানান চেম্বার সভাপতি। সরকার থেকে ঋনের ওপর সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও এখনো বরিশাল নির্মিত নৌযানগুলোর বিপরিতে ব্যাংক ঋনে সুদের হার সাড়ে ১২ থেকে ১৬% পর্যন্ত।
চেম্বার সভাপতি সাঈদুর রহমান বলেন, ইতোপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ড. আতিউর রহমান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত যূক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদুত ড্যান মজিনা বরিশালে নৌ নির্মান শিল্প পরিদর্শন করে অভিভুত হয়েছেন। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর এ শিল্পে বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করে দিক নির্দেশনা প্রদানের কথা বললেও পরবর্তিতে তেমন কিছু হয়নি বলেও জানান। পাশাপাশি সীমাহীন বিদ্যুৎ সংকটের ফলেও এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হবার পাশাপাশি নৌযানের নির্মান ব্যয় ও সময় বেড়ে যাবার কথা জানান তিনি। গ্যাস না থাকার কারনেও বরিশালে নৌযান নির্মান ব্যায় বেড়ে যাবার কথা বলেন চেম্বার সভাপতি। তিনি এসব সমস্যার সমাধান সহ এ শিল্পে সরকারি ব্যাংগুলোর বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে একটি সরকারি তহবিল গঠনেরও দাবী জানান।
এ ব্যাপারে সালমা শিপিং লাইন্স-এর ব্যবস্থাপনা পচিালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস দক্ষিনাঞ্চলের নৌ নির্মান শিল্পে সরকারি-বেসরকারি সব বানিজ্যিক ব্যাংকের এগিয়ে আসা সহ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ঋনের সুদের হার নির্ধারনেরও দাবী জানান।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>