বরিশাল সিটি করপোরেশন চলছে পৌরসভার আদলে

আপডেট : March, 31, 2017, 8:43 pm

স্টাফ রিপোর্টার
একের পর এক অনিয়ম দূনীতি আর কর্মচারী  শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখে সিটি কর্পোরেশেন আজ অচল। টানা আন্দোলনের ফলে মুখ থুবরে পরেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। আর এতে করে দূভোগ পোহাচ্ছে বরিশালের সাধারন মানুষ। তবে শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে টনক নড়ছেনা মেয়রসহ অনান্য কর্মকর্তাদের বলে দাবী করেছে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা শ্রমিকরা। হয় দাবী মানতে হবে, না হয় আন্দোলন চলবে। এমন ঘোষনা দিয়ে চতুর্থ দিনেও আসেনি কোন সমাধান। শ্রমিকদের দাবী সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন দূর্নীতি নিয়ে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের এর সুষ্ঠ সমাধান দিতে হবে। পরবর্তীতে যাতে আর শ্রমিকদের আন্দোলনে যেতে না হয়। গতকাল আন্দোলের অংশ হিসেবে বরিশাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষনা দেয় শ্রমিক কর্মচারীরা। সংবাদ সম্মেলনের এক লিখিত বক্তব্যে কর্মকর্তা কর্মচারী ও শ্রমিকরা জানান, বকেয়া বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ট, গ্রাচুয়েটি পরিষোধ ও বেতন বৈষম্য দুর করতে হবে। এসময় তারা স্থায়ী কর্মকর্তা কর্মচারীদের ৫টি দাবী এর মধ্যে ৫ মাসের বকেয়া বেতন পরিষোধ, প্রভিডেন্ট ফান্ট এর ৩২ মাসের বকেয়া পরিশোধ, বেতন প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্রে পরিশোধ,অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের  গ্রাচুইয়েটি অবসর গ্রহনের সাথে সাথে পরিশোধ,সিটি কর্পোরেশনের বিধি বহিঃভূত পদন্নোতি ও সকল অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। একই সাথে দৈনিক মজুরী ভিত্তিক কর্মচারীদের ৬টি দাবী তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিথিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা। এদিকে সিটি কর্পোরেশের আন্দোলনে বরিশাল নগরী পরিনত হয়েছে ময়লার ভাগারে। নানা সমস্যায় জজরিত সিটি কর্পোরেশন এখন অচল অবস্থায় পরে আছে।
দেড় যুগের বিশ্লেষনে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন
ঘোষণার দেড় যুগ পরেও নিজস্ব নগর ভবন পায়নি বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। পুরনো পৌর ভবনে নগর ভবনের সাইনবোর্ড ঝুঁলিয়েই চলছে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম। তার ওপরে গত চার বছরে বেড়েছে দেনার বোঝা। প্রয়োজনের চেয়ে তিনগুণ বেশি জনবল নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে নগর ভবনের কার্যক্রম। ফলে পৌরসভার আদলেই চলছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। সূত্রমতে, আয়ের সাথে ব্যয়ের বিশাল ব্যবধান নগর ভবনকে দিনে দিনে দৈন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সিটি করপোরেশনে বছর শেষে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ফলে নগরীর কাঙ্খিত উন্নয়নের পরিবর্তে দিনে দিনে নতুন নতুন সমস্যা যুক্ত হচ্ছে। ২০০১ সালে বরিশাল পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর করা হয়। তখন পৌর ভবনেই নগর ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন নগর ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি কোনো মেয়রের সময়েই পূরণ হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে পৌরসভার ২৫৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়েই সিটি কর্পোরেশনের পথচলা শুরু হয়। ২০০৩ সালে জনবল বৃদ্ধি করা হয় ৪৫৭ জনে। সর্বশেষ সরকারী হিসেবে এ সিটি কর্পোরেশনে জনবল   নির্ধারণ করা হয় ৭৫০ জন কিন্তু বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা দুই হাজার তিন শ’ জন। নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুশি রাখতেই এসব জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নগর ভবনে ৫ শ’

কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বসারও স্থান দেওয়া সম্ভব নয়। একই কক্ষে বসে একাধিক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন শাখার কাজ করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে এদের বেতন পরিশোধ করা। বছরে নগর ভবনের আয় মাত্র ২০ কোটি টাকা। আর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় হয় ৩৬ কোটি টাকারও বেশি। এর সাথে পানি সরবরাহ, জ্বালানী, পরিবহন ও স্টেশনারিসহ যাবতীয় খরচ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তাতে বছরে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছয় মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া পরেছে। এনিয়ে নগর ভবনে চলছে আন্দোলন। ২৩ কোটি টাকা বিদ্যুত বিল বকেয়া থাকায় ইতোমধ্যেই বিদ্যুত বিভাগ সিটি কর্পোরেশনের ছয়টি বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে ওইসব এলাকার পানি সরবারহ বন্ধ হয়ে গেছে। মোটা অংকের টাকা বিদ্যুত বিল বকেয়া থাকায় নবনির্মিত ওয়াটার ম্প¬ান্টে সংযোগ দেয়নি বিদ্যুত বিভাগ। ফলে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাত মাস পরেও চালু করা সম্ভব হয়নি প্রকল্পটি। সিটি করপোরেশনের ৫৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার সড়ক ভেঙে চুরে একাকার হয়ে আছে। বিবির পুকুরসহ সৌন্দর্য্য বর্ধন করা এলাকাগুলো সংস্কারের অভাবে ধক্ষংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। সূত্রে আরও জানা গেছে, পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের সময় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা যুক্ত করা হয়। এ এলাকাগুলো আগে জাগুয়া, চরবাড়িয়া, রায়পাশা-কড়াপুর, কাশিপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর করা এ গ্রামগুলোর বাসিন্দারা এখনো কাঁচা রাস্থা পেরিয়ে নগরীতে যাতায়াত করে থাকেন। অধিকাংশ এলাকা ডোবা ও নালায় ভরপুর। রসুলপুর, মোহম্মদপুরসহ অধিকাংশ এলাকার মানুষ নৌকায় করে নগরীতে যাতায়াত করেন। নগরীর অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। একে একে সকল খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন আর নগরীর ময়লা আবর্জনা বের হতে পারছে না। আসন্ন বর্ষায় নগরবাসীর দুর্ভোগের শঙ্কা বাড়ছে। আটবছর পূর্বে নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করতে একটি বেসরকারি সংস্থা এশিয়া মহাদেশের প্রথম এডিওপলিশ (সৃজনশীল নগরী) নগরী গড়তে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে। ওই পরিকল্পনায় আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। কিন্তু তার বাস্থবায়ন অনিশ্চিত। পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য আজ পর্যন্ত গঠন করা হয়নি আলাদা কোনো নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আট লাখ জনগোষ্ঠীর এই নগরীতে নেই পর্যাপ্ত বাসা বাড়ি। ফলে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। এ ব্যাপারে সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, অপ্রয়োজনীয় জনবল এবং পে-স্কেল ঘোষণা করায় খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু বাড়েনি নগর ভবনের আয়। নতুন করে ট্যাক্স নির্ধারণসহ অন্যখাতের আয় বাড়তে সময় লাগবে। হঠাৎ করে কেউ আয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে পারবে না। মেয়র আরও বলেন, বর্তমানে নগর ভবনের দেনার পরিমাণ দুই শ’ কোটি টাকারও বেশি। এ টাকা সরকারীভাবে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে প্রদান করা না হলে সিটি করপোরেশন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আর পাহাড় সমান সংকট মোকাবেলা করাও সম্ভব হবেনা। তবুও আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে থেকেই চেষ্টা করছি মানুষের সমস্যাগুলো সমাধান করার।

Facebook Comments