বাংলাদেশের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ

মে ১০ ২০১৭, ১৬:৪৫

পৃথিবীতে নৃশংস খুনের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। কালে কালে নানা ধরনের খুনির আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের আমরা নানা নামে অভিহিত করেছি। তেমনি একটি খুনির ধরন ‘সিরিয়াল কিলার’। যারা বিচিত্র উপায়ে ভয়াবহ ও নৃশংসভাবে একের পর এক মানুষ খুন করেছে। সেসব খুনের বর্ণনা দেওয়াও লোমহর্ষক ব্যাপার।

সিরিয়াল কিলার বা ধারাবাহিক খুনিদের নিয়ে যুগে যুগে বহু সিনেমা, গল্প, কাহিনীর জন্ম হয়েছে। তাদের নিয়ে সাধারণ মানুষেরও আগ্রহের শেষ নেই। এসব খুনির মনস্তত্ত্ব নিয়ে মনোবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে অপরাধ বিজ্ঞানীদেরও গবেষণার শেষ নেই। পরিবর্তন ডটকম পাঠকদের কাছে সিরিজ প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরবে বিশ্বের এবং বাংলাদেশের ভয়ঙ্কর সব সিরিয়াল কিলারদের গল্প। আজ পড়ুন এর পঞ্চম পর্ব।

রসু খাঁ

রশিদ খাঁ ওরফে রসু খাঁর জন্ম চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনা গ্রামে। তার বাবা ক্ষেতমজুর আবুল হোসেন (মনু খাঁ)। বাবার মৃত্যুর পর  পুরো পরিবার অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। এ সময় রসু ছোটখাটো চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তার মাসহ পুরো পরিবার আলাদা হয়ে গেলে ভবঘুরের বেশে টঙ্গী আসেন রসু। বিয়ের সময় ঘটক তাকে পাত্রী দেখতে না দেওয়ায় বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন তার স্ত্রীর একটি চোখ নষ্ট।

বছর দুয়েক পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি রেখে শ্যালিকা রিনা বেগমকে বিয়ে করে টঙ্গী নিয়ে আসেন তিনি। দ্বিতীয় স্ত্রী রিনা গার্মেন্টসে কাজ নেন। এদিকে তিনি জড়িয়ে পড়েন চুরির মতো অপরাধ কর্মকাণ্ডে। স্ত্রী তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ নেওয়ায় রসুর সঙ্গে সেখানে কর্মরত অনেক নারীর পরিচয় হয়। যাদের একজনের সঙ্গে তার প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

মেয়েটি তাকে রেখে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে এর প্রতিবাদ করেন রসু। পরে ওই নারীর ইন্ধনে তার প্রেমিকসহ কয়েকজন তাকে বেদম মারধর করেন। সেদিনই রসু খাঁ প্রতিজ্ঞা করেন, ১০১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করবেন তিনি।

এরপরই পরিকল্পনামাফিক এগোতে শুরু করেন রসু খাঁ। সাভার ও টঙ্গী থেকে প্রেমের অভিনয় করে তিনি নানাভাবে নিম্নবিত্ত নারীদের চাঁদপুরে নিয়ে আসেন। এরপর প্রায় সবাইকেই ধর্ষণের পর হত্যা করেন। তার নৃশংসতার শিকার প্রায় সবাই ছিলেন গার্মেন্টসকর্মী। হত্যার শিকার অধিকাংশ নারীরই লাশ অজ্ঞাতপরিচয় রয়ে গেছে। হত্যার পর অধিকাংশ সময় তিনি লাশ পানিতে ফেলে দিতেন। কখনো নারীদের হাত-পা বেঁধে পানিতে চেপে ধরে রাখতেন যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়। টাকার বিনিময়ে কোনো গৃহবধূ ও নারীকে হত্যার সুপারিশ পেলে তিনি তা-ও সানন্দে গ্রহণ করতেন।

২০০৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ফরিদগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামে সঙ্গী ইউনুস ও

শাহীনের প্ররোচনায় একইভাবে এক নারীকে হত্যা করেন রসু। পরবর্তীতে বন্ধু মানিকের স্ত্রীর প্ররোচনায় আরেক নারীকে একই গ্রামে নির্যাতন শেষে হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেন। এমনকি তার শিকার হিসেবে তার শ্যালকের স্ত্রীর কথাও শোনা যায়। তিনি এবং তার শ্যালক আব্দুল মান্নান মিলে মেয়েটিকে ২০০৭ সালের ১৯ জুন ফরিদগঞ্জের ৯ নং ইউনিয়নের ভাটিয়া গ্রামে নদীর পাড়ে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেন।

তার ১১ জন শিকারের মধ্যে একজন খুলনার দৌলতপুরের সজলা গ্রামের সাহিদা বেগম। ১৯ বছরের পোশাককর্মী সাহিদা বেগমের সঙ্গেও ছলনার আশ্রয় নেন তিনি। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে নিয়ে এসে ধর্ষণের পর খুন করে লাশ ফেলে পালিয়ে যান রসু খাঁ। এ ঘটনাটি ২০০৮ সালের।

রসুর সর্বশেষ শিকার পারভীন আক্তার। গাজীপুরের একটি বাজারে তিন সন্তানের জননী পারভীনের সঙ্গে রসুর পরিচয় হয়। পরিচয় ধীরে ধীরে প্রণয়ে গড়ালে রসু তাকে ফরিদগঞ্জের হাঁসা গ্রামে নিয়ে যেতে চান। এরপর ২০০৯ সালের ৭ জুলাই ভাগ্নে জহির, তিনি ও তার সঙ্গী ইউনুস মিলে পারভীনকে নির্যাতনের পর মুখে কাপড় গুঁজে হাত-পা বেঁধে গলা টিপে হত্যা করে। এরপর লাশ পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়। এরপর পারিবারিক বিরোধ আছে এমন দুই ব্যক্তিকে (রিকশাচালক) হত্যাকাণ্ডের জন্য ফাঁসান তিনি। নিজের মোবাইলের সিম কার্ড খুলে ফেলেন রসু খাঁ। ২-৩ মাস জেল খেটে ওই দুই ব্যক্তি জামিন পান।

তবে ধরা পড়ার দিন ঘনিয়েই আসছিল এই খুনির। গাজীপুরের স্থানীয় এক মসজিদের সিলিং ফ্যান (মতান্তরে মাইক) চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি। তখন স্থানীয় একজন তার মোবাইল ফোন ও সিম রেখে দেন। এরপর এক যুবক কোনোভাবে সেই সিম পেয়ে ব্যবহার করতে শুরু করলে পারভীনের মামলার তদন্তকারী এসআই মীর কাশেম ওই নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলেন। ধীরে ধীরে জানতে পারেন সিমের আসল মালিক সম্পর্কে।

পুলিশ সোর্সের খবরে ওই বছরেরই ৭ অক্টোবর টঙ্গীর বাসা থেকে রসুকে গ্রেফতার করা হয়। ফরিদগঞ্জ থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি ফরিদগঞ্জের ৬টি, হাইমচরের ৪টি ও চাঁদপুরের ১টি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন, যা ৩টি থানার ১০টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

তার খুনের পদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিল- শ্বাসরোধ করে পানিতে লাশ ফেলে দেওয়া। প্রায় প্রতিটি শিকারের শরীরে কামড়ের দাগ এবং ছুরি দিয়ে বক্ষদেশ ও গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার শিকার ছিল ১৬-৩৫ বছর বয়স্ক নারী। একটি মামলায় তাকে ফাঁসি ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। বাকি মামলাগুলো বিচারাধীন।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>