বাবুগঞ্জে ৩৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগে কোটি টাকা বানিজ্যের অভিযোগ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বাবুগঞ্জ উপজেলার ৩৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী নিয়োগে কোটি টাকা বানিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানে আবেদনকারী পাঁচজন প্রার্থীর কাছ থেকেই সর্বনি¤œ তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি এবং ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে বিভিন্ন দলের জনপ্রতিনিধিদের মাঝেও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ঘটতে পারে অপ্রীতিকর ঘটনাও। এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ইসরাজ জাহান তাপসি।
এদিকে নিয়োগ বানিজ্যের বেশ কয়েকটি অভিযোগ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপক কুমার রায়। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে তারা স্থানীয় এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন সম্ভব হচ্ছে না বলে দুর্বলতার কথা প্রকাশ করেন তিনি।
বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার ৩৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে (৩৯ জন) দপ্তরী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট নিয়োগ কমিটিতে পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপক কুমার রায়কে সভাপতি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় বাবুগঞ্জ-মুলাদী আসনের ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি এ্যাড. শেখ মুহাম্মদ টিপু সুলতান’র প্রতিনিধি হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা গোলাম হোসেন, বাবুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন স্বপন এর প্রতিনিধি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক কামাল হোসেন ওরফে পোস কামাল ছাড়াও সংশ্লিষ্ট স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকগণ নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন। ইতিমধ্যে আবেদনকারী নিয়োগ প্রত্যাশীদের পরীক্ষা গ্রহন সম্পন্ন করেছে নিয়োগ কমিটি। প্রত্যেকটি স্কুলেই সর্বনি¤œ ৩ থেকে ৫ জন পর্যন্ত আবেদন করেছেন। এরা সবাই নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে উপজেলার প্রত্যেকটি স্কুলেই দপ্তরী নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে প্রত্যেক আবেদনকারীর কাছ থেকেই সর্বনি¤œ তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহন করছেন তারা। ঘুষ বানিজ্যের হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও বাদ যায়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য আদায়কৃত উৎকোচের অর্থ নিয়োগ কমিটি এবং স্থানীয় সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
দপ্তরী পদে নিয়োগ প্রত্যাশী ভুক্তভোগী একাধীক সূত্র জানায়, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্কুলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করা হয়েছে। তবে এর মূল হোতা রয়েছেন নিয়োগ কমিটির সদস্য এমপি’র প্রতিনিধি জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিন ভোট পেয়ে পরাজিত সদস্য প্রার্থী গোলাম হোসেন ও উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি কামাল হোসেন।
সূত্রগুলো জানায়, উপজেলার পশ্চিম ভূতেরদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৫ জন প্রার্থী দপ্তরী পদে আবেদন করেছে। প্রত্যেকের কাছ থেকেই সর্বনি¤œ চার লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে আরাফাত হোসেন নামে একজন রয়েছেন যার কাছ থেকে গত দু’বছর পূর্বে চাকুরী দেয়ার কথা বলে উপজেলা চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন স্বপন ৪ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারনে ওই স্কুলে তার নিয়োগ অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগ রয়েছে আরাফাত হোসেন নামের ওই প্রার্থী বাবুগঞ্জের বাসিন্দা নন। তিনি পার্শ্ববর্তী মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা। ভুয়া স্কুল সনদ দিয়ে চাকুরীর আবেদন করেছেন। যাতে বাবুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের সুপারিশও রয়েছে।
এদিকে পশ্চিম ভুতেরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অপর চার প্রার্থীর মধ্যে আল আমিন নামের একজনের কাছ থেকে ৫ লাখ, রিপন নামের একজনের কাছ থেকে ৫ লাখ এবং আরিফ নামের একজনের কাছ থেকে ৬ লাখ এবং অপর এক প্রার্থীর কাছ থেকে আরো ৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহনের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে আরিফ এর কাছ থেকে উৎকোচের অর্থ আদায় করে দিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্রকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং এমপি’র ঘনিষ্ঠজন মাসুদ মাষ্টার। আল আমিনের টাকা গ্রহন করেছে কামাল হোসেন।
কেদারপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী পদে আবেদন করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ

সচিব ইউনুসুর রহমান এর মামাতো ভাই লিটন। তিনিও বাদ পড়েননি তার কাছেও তিন লাখ টাকা উৎকোচ দাবী করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই স্কুলে দপ্তরীর আবেদন করা মোতাহার খলিফার ছেলে মামুন এর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৩ লাখ টাকা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহিত এর কাছ দাবী করা হয়েছে ৩ লাখ টাকা।
উপজেলার সানি কেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ইসরাত জাহান তাপসি নিজস্ব লোক জাকির নামে একজন প্রার্থী রয়েছে। তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন করেছেন উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের মামা ও সাবেক মেম্বার বাচ্চু। কিন্তু ওই স্কুলেই স্বপন নামে অপর এক প্রার্থীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহন করেছেন অধ্যাপক গোলাম হোসেন। স্বপনের চাচাতো ভাই মাহমুদ এর মাধ্যমে এই উৎকোচ গ্রহন করেন তিনি। মাধবপাশা বাড়ৈখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক মুক্তিযোদ্ধা ছেলের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়েছেন গোলাম হোসেন, ২৮নং মধ্য বাহেরচর ঘোষকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবেদন করেছেন গোলাম হোসেনের দুই ভাগিনা সুমন ও সোহাগ। এর মধ্যে সোহাগ এইচএসসি পাশ করলেও তার ভাই সুমন নিজের নামও ঠিকভাবে লিখতে পারে না। কিন্তু তার পরেও ৮ম শ্রেণীর জাল সনদ দিয়ে চাকুরীর আবেদন করেছে। এমনকি তাদের দুই ভাই এর মধ্যে একজনের চাকুরীও অনেকটা নিশ্চিত করে রেখেছেন গোলাম হোসেন। চাঁদপাশা বায়লাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭ জন প্রার্থী আবেদন করেছে। যার মধ্যে নাসির উদ্দিন নামে একজনকে চাকুরী দেয়ার জন্য গোলাম হোসেন এর সাথে ৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। ইতিমধ্যে ২ লাখ টাকা পরিশোধও করেন তিনি। বাকি টাকা চাকুরী নিশ্চিত হওয়ার পরে দেয়ার চুক্তি হয়েছে।
শুধু উল্লেখিত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই নয়, উপজেলার প্রায় প্রত্যেকটি স্কুল থেকেই আবেদনকারীদের কাছ থেকে গ্রহন করা হয়েছে বিভিন্ন হারে উৎকোচ। এমপি’র প্রতিনিধি গোলাম হোসেন ও উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি নিয়োগ কমিটির সদস্য কামাল হোসেন দু’জনেই সমন্বয় করে নিয়োগ বানিজ্যের অর্থ তুলছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন। অবশ্য যাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে তাদের চাকুরী না হলে অর্থ ফেরত দেয়ার অঙ্গিকারও করছেন তারা।
জানাগেছে, গোলাম হোসেন এর নিয়োজ বানিজ্যের অংশ এমপি শেখ মো. টিপু সুলতান এর কাছে সময় মতই পৌছে দিচ্ছেন তার পিএস সুজন আহমেদ। সকল অবৈধ কর্মকান্ড সুজনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ঘুষ বানিজ্যের অর্থ আদায় সহ অনৈতিক কর্মকান্ড দেখভালের জন্যই সুজনকে পিএস করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এমপি’র বিরুদ্ধে।
নিয়োগ বানিজ্য প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ইসলাম জাহান তাপসি বলেন, বাবুগঞ্জ উপজেলায় ঘুষ বানিজ্য প্রচলিত হয়ে গেছে। এখানে শুধু নিয়োগ দুর্নীতিই নয়, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইতেও দুর্নীতি হয়েছে। একটি উপজেলায় আ’লীগ, ওয়ার্কার্স এবং জামায়াতের জনপ্রতিনিধি এবং নেতৃত্ব থাকলে সেখানকার নিয়ন্ত্রন কখনই একক স্থানে থাকে না।
তিনি বলেন, আমার নিজ এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যেখানে আমার নিজের একজন ঘনিষ্ট আত্মিয় প্রার্থী হয়েছে। কিন্তু সেখানেও এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজন হস্তক্ষেপ করছে তাদের লোক নিয়োগ দেয়ার জন্য। এমনটি খুব সহজেই মেনে নিবো না। আমার ভাগে হাত দিলে রক্তপাতের ঘটনা ঘটবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপক কুমার রায় বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে এমন কিছু অভিযোগ আমিও পেয়েছি। কিন্তু কেউ লিখিত ভাবে অভিযোগ করেনি। তাছাড়া এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রতিনিধিরা নিয়োগ বানিজ্য করলে সেখানে আমার কিছুই করার থাকে না। তার পরেও কেউ লিখিতভাবে অভিযোগ করলে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এবিষয়ে বাবুগঞ্জ-মুলাদী আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. শেখ মো. টিপু সুলতান বলেন, গোলাম হোসেনসহ দুইজন শুধুমাত্র নিয়োগ কমিটির সদস্য মাত্র। তাদের নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা অনিয়ম করার কোন সুযোগই নেই। নিয়োগ কমিটির মূল দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। তারাই এবিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তাছাড়া এধরণের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের কাছ থেকে প্রথম শুনেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>